সর্বব্যাপী পচন প্রতিরোধ কোন পথে?

 

।। এম. আবদুল্লাহ ।।

দেশে সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় মনে হচ্ছে সর্বগ্রাসী রূপ নিচ্ছে। নিচ্ছে, না বলে নিয়েছে বলাই বোধহয় যথার্থ হবে। পত্রপত্রিকা, সম্প্রচার মাধ্যম ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে চোখ রাখলে রীতিমত শিউরে উঠতে হচ্ছে। এমন সব ঘটনা-অঘটনা বাস্তবে ঘটছে, যা কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। অবনতিশীল পরিস্থিতি অনুধাবনেও মনে হচ্ছে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। গত কয়েক দিনে গণমাধ্যমে উঠে আসা কয়েকটি চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারি ঘটনায় দৃষ্টিপাত করলে লজ্জায়, ঘৃণায় মাথা নুয়ে পড়ছে।

গত ১১ জুলাই রমনা থানায় একটি ধর্ষণের মামলা রুজু হলো। ধর্ষণজনিত অপরাধে মামলা হওয়া এখন আর কোন আলোচ্য বিষয় নয়। হরহামেশাই দেশজুড়ে ঘটছে এই অনাচার। কিন্তু আলোচ্য মামলার বাদী আর আসামীর মধ্যকার সম্পর্কের কথা জেনে স্তম্ভিত হতে হয়েছে। ধর্ষনের শিকার বিশ বছর বয়েসী মেয়েটি আসামী করেছে তার সৎ বাবা আরমানকে। অভিযোগ- বিগত ৮ বছর ধরে ওই নরপশু তার স্ত্রীর আগের সংসারের মেয়ের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। অসহায় ওই মেয়ে বাধা দিয়ে এমনকি বাসা ত্যাগ করেও রেহাই পায়নি। শুধু তাই নয়, যৌন নিপীড়নের ভিডিও এবং স্থির চিত্র ধারণ করে অনলাইনে ছেড়ে মেয়েটিকে তার বন্ধুদের কাছে হেয় করার চূড়ান্ত নোংরা পথও বেচে নিয়েছে বিকারগ্রস্ত আরমান।

মামলা রুজুর দু’দিনের মাথায় পুলিশ ধর্ষক আরমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয় এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে অকপটে স্বীকার করে। দাবী করে, সৎ কন্যাকে সে বিয়ে করেছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী মেয়েটি আরমানের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সৎ মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সূরা নেসায় নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে পুলিশ জানতে চাইলে আরমান ওই নিষেধাজ্ঞা মানে না বলে জানায়। পুলিশ বলছে, এমন জঘন্য অনাচারের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। ধর্ষক আরমানের স্ত্রীও ঘটনা সম্পর্কে অবহিত বলে জানায় সে।

এর মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনার খবর গণমাধ্যমে স্থান পায়। খবরে বলা হয়, টাঙ্গাইলের সখীপুরে চাচীকে ধর্ষণ মামলায় খায়রুল ইসলাম (২৫) নামে এক ভাতিজাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সখীপুর থানায় ভাতিজা খায়রুলের নামে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ওই চাচী। তিনি জানান, স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি যান। স্বামী প্রবাসে থাকেন। ঘটনার দিন ভাসুরের ছেলে খায়রুল ইসলাম চাচীর বাপের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চাচির ঘরে ঢুকে, মুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে।

আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর আসে একই সময়ে। শিরোনাম- ‘গৃহশিক্ষকের লালসার শিকার অভিজাত পরিবারের এক গৃহবধূ’। মূল ঘটনাটি বেশ কয় মাস আগের। জানাজানি হয় গত সপ্তাহে। ঘটনার বিবরণ এরকম- রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক অভিজাত পরিবারে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিল শাহ মোঃ মুজাহিদ। রাজধানীর একটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সে। এক পর্যায়ে গৃহকর্তা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে মুজাহিদ বাসায় গিয়ে কৌশলে কোল্ডড্রিংকস এর সঙ্গে নেশাদ্রব্য খাইয়ে ধর্ষণ করে গৃহবধূকে।

সেই ধর্ষণের ভিডিও ও স্থির চিত্র ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। জোরপূর্বক কিছু ব্ল্যাঙ্ক চেকেও সই নিয়ে যায়। পরে আরও কোটি টাকা দাবি করে। প্রথমে লোকলজ্জার ভয়ে ঘটনা চেপে গেলেও এক পর্যায়ে নিরুপায় হয়ে ভিকটিম পরিবার মামলা দায়ের করে ভাটারা থানায়। জড়িত মুজাহিদসহ দুই আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ধর্ষণের ভিডিওসহ চাঁদা দাবির নানা আলামত জব্দ করেছে। বর্তমানে মুজাহিদ জেলহাজতে এবং মুশাহিদ নামে সহযোগী জামিনে রয়েছে। আদালতের নির্দেশে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদে মুজাহিদ ঘটনার স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

“নৈতিক অধঃপতনের আরেকটি কারণ দিক হলো, আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস এখন আর আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুনে বা খবরের কাগজে পড়ে শিউরে উঠতে হচ্ছে। সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, মা-বাবার হাতে সন্তান খুন, তিন-চার সন্তান রেখে মায়ের পরকীয়া প্রেমিকের হাত ধরে পলায়ন, ধনাঢ্য ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সন্তান কর্তৃক ব্যস্ততার কথা বলে পিতার লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে হস্তান্তর, বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ছুঁড়ে ফেলে আসার মত ঘটনা আত্মকেন্দ্রিক জীবন ও স্বার্থপরতার বিষয়টিকেই তো উলঙ্গভাবে প্রকাশ করছে। মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার সকল সীমা অতিক্রম করেছে। ভারসাম্যহীনতার কারণে অস্থির হয়ে উঠছে সমাজ জীবন।”

একই সপ্তাহে অপর চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামের পটিয়া পৌর সদরে। সেখানে বাক প্রতিবন্ধী এক যুবতী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষিতাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ফরেনন্সিক বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। লম্পট আবুল কাশেম (৫৬) পলাতক রয়েছে। তিনি একই এলাকার আবদুর রশিদের পুত্র। বাক প্রতিবন্ধী যুবতী ধর্ষণের ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে।

আরেকটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলে। সেটি ঘটেছে বরিশালের বানারীপাড়ায়। চাঁদার টাকা না পেয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে নববধূকে ধর্ষণের অভিযোগে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন হোসেন মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।এ ছাড়া বনানীর রেইনট্রি হোটেল ও একটি বাসায় জন্মদিনের নামে যে ধর্ষণোৎসব হয়েছে, তা এখনো তরতাজা। হাররোজই গণমাধ্যমে বিচিত্র ধরণের সামাজিক অপরাধের ঘটনা চোখে পড়ছে। সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছে না এমন ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

একটির পিঠে আরেকটি ঘটনা যেভাবে ঘটে চলেছে, তা কি বার্তা দিচ্ছে আমাদের?সমাজ কতখানি পঁচেছে তা আন্দাজ করার জন্য কি আর কোন সূচকের প্রয়োজন পড়ে? উপর্যুপরি ঘটনাগুলো সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিতকে কতটা ধ্বসিয়ে দিচ্ছে তাও কি আমরা আঁচ করতে পারছি ? আর কাহাঁতক অধপতিত হলে আমরা বুঝবো যে, সমাজের পচন নিরাময়-অযোগ্য স্তরে পৌঁছে গেছে?

অবক্ষয় বলতে আমরা কী বুঝি? এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অধঃপতিত, বিচ্যুতি, নীচে নেমে যাওয়া বা অবনতি হওয়া। সমাজ বিজ্ঞানী রবার্টসন বিচ্যুতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইংরেজিতে যা বলেছেন তার সরল অর্থ দাঁড়ায়, বিচ্যুতি হচ্ছে- এমন এক ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্য, যা গুরুত্বপূর্ণ কাঙ্খিত সামাজিক মূল্যবোধকে ভঙ্গুর করে এবং যা সমাজের অধিকাংশ মানুষ নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে। নৈতিকতা ও মনুষত্বের মানদন্ড থেকে নীচে নেমে যাওয়াকেও অবক্ষয় বলা হয়।

এ অবক্ষয় ও অধঃপতন কেন ঘটছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর যে আমরা জানি না, তা কিন্তু নয়। সমাজে যারা ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করেন কিংবা শ্রেণী-পেশার সচেতন জনগোষ্ঠী রয়েছেন, তারা বিলক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন- কেন ক্রমাগতভাবে সমজটা দূষিত হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন মনুষত্বের সংকট প্রকট থেকে প্রকট হচ্ছে। ভয়াবহ সব ঘটনাও আগের মত এখন আর আমাদের মনে দাগ কাটছে না, আলোড়িত করছে না। পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বীনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি খুব সুন্দর আকৃতিতে। আর সেই মানুষ কর্মের কারণে অবক্ষয়ের অতল তলে তলিয়ে যায়।

স্বীকার করতেই হবে সহশিক্ষা, নিরাপত্তাহীন কর্মক্ষেত্রে নারীর অবাধ বিচরণ, এনজিও কার্যক্রমের আড়ালে নারীকে দাম্পত্য বন্ধনচ্যুত করা, অশালীন-উত্তেজক গান-নৃত্যের ঝংকার, সর্বনাশা মাদকের সহজলভ্যতা অধঃপতনের পথ সুগম করছে। নববর্ষ, চৈত্র-সংক্রান্তি, বসন্তবরণ, থার্টি-ফার্স্ট নাইট, বন্ধু দিবস, জন্মদিবস, ম্যারিজ ডে ও ভ্যালেন্টাইন ডে’র মত হরেকরকম আয়োজনে নারী-পুরুষের খোলামেলা ঢলাঢলি ধর্ষণ ও ব্যভিচারের উর্বর ক্ষেত্র তৈরী করছে। পবিত্র কুরআন-হাদীসের হুঁশিয়ারী ও ইসলাম নির্দেশিত বিধি-নিষেধ আমলে নিলে এমনটা হতো না।

পবিত্র কুরআনে সূরা নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন- “যারা চায় ঈমানদারদের সমাজে নির্লজ্জতার বিস্তার ঘটুক, তারা পার্থিব এবং পরকালীন দু’জীবনেই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করবে। আল্লহই জানেন, তোমরা জান না”। সমাজে এসবের বিস্তার যে এক সময় মামুলি বিষয়ে পরিণত হবে তা মহানবী (সা.) বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি ইরশাদ করেছিলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক হবে এমন, যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে”। (বুখারী)।

অবক্ষয়ের অন্যতম একটা দিক হচ্ছে- আমাদের তরুণদের একটা বড় অংশ বুঝে গেছে এই দেশে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অবস্থা বিরাজমান। ক্ষমতাদর্পিরা যা খুশি তাই করছেন। সমাজটা প্রতিকারহীন এক অরাজক পরিস্থিতির দিকে ক্রমশঃ ঝুঁকে পড়ছে। তাই তরুণরা সেভাবেই নিজেদেরকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে এই ধরনের মনমানসিকতা ধারণ করতে দেখা যাচ্ছে। পেশী শক্তিকেই মোক্ষম হাতিয়ার জ্ঞান করছে। দেশের সরকার যখন নিরীহ জনগণকে নিপীড়ন করে, তখন একটি রাষ্ট্র তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসার ঘটে ।

নৈতিক অধঃপতনের আরেকটি কারণ দিক হলো, আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস এখন আর আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুনে বা খবরের কাগজে পড়ে শিউরে উঠতে হচ্ছে। সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, মা-বাবার হাতে সন্তান খুন, তিন-চার সন্তান রেখে মায়ের পরকীয়া প্রেমিকের হাত ধরে পলায়ন, ধনাঢ্য ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সন্তান কর্তৃক ব্যস্ততার কথা বলে পিতার লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে হস্তান্তর, বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ছুঁড়ে ফেলে আসার মত ঘটনা আত্মকেন্দ্রিক জীবন ও স্বার্থপরতার বিষয়টিকেই তো উলঙ্গভাবে প্রকাশ করছে। মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার সকল সীমা অতিক্রম করেছে। ভারসাম্যহীনতার কারণে অস্থির হয়ে উঠছে সমাজ জীবন।

অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি-নির্ভর মাধ্যমের ব্যবহার যেমন মানুষের কাছে পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনি মানুষের মাঝে অবাধ যৌনাচারকেও উস্কে দিচ্ছে। আজকে পর্ণোগ্রাফি যেভাবে বানের পনির মত গ্রাস করছে, তাতে শিশু-কিশোররা ব্যাপকহারে যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। স্কুলগামী টিনেজারদের মোবাইলে পর্ণোগ্রাফি ছবি-ভিডিও অভিভাবকদের অসহায় ও শঙ্কিত করে তুলছে। পর্ণো ছবি ধারণ করে নেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এটা ঘটেছে কালেভদ্রে। আর এখন ঘটছে প্রতিনিয়ত। এতে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধাবিত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতির সুবাদে অনাচারনির্ভর ভারতীয় সিরিয়ালগুলো আমাদের মূল্যবোধকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ধারা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হানা দিচ্ছে অপসংস্কৃতি। যাচাই-বাছাই না করেই ডিশ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে চরিত্রবিধ্বংসী সংস্কৃতির অসুস্থ ধারা গ্রহণ করছি আমরা। এর ফল হিসেবেই সমাজে লোমহর্ষক নৃশংসতা বাড়ছে। বিস্তার ঘটছে ব্যভিচার, বেলেল্লাপনার। পরিনামে সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

সরকারি হিসাবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। গত মার্চ মাসে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানিয়েছিলন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৬৭ লাখ। অর্থাৎ- দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে এখন ইন্টারনেট। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসার কতটা দ্রুত গতিতে হচ্ছে তা জানা যাবে অন্য পরিসংখ্যান থেকে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে- প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি করে ফেসবুক একাউন্ট খোলা হচ্ছে বাংলাদেশে, যা দেশের জন্মহারের চেয়েও বেশী।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তিকে অবলম্বন করে অনৈতিক ও অবৈধ প্রেমে অন্ধ হয়ে মানুষ কখনো কখনো নিষ্ঠুর, নির্মম হয়ে উঠছে। কখনো আবার পেটের ক্ষুধাও মানুষকে আত্মধ্বংসী করে তুলছে। নিজে খেতে না পেরে, সন্তানকে ঠিকমতো খাওয়াতে বা সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চালাতে না পেরে নিজের ও সমাজের প্রতি আস্থা হারিয়ে নৃশংস হয়ে উঠছে মানুষ। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চলেছে।

তাছাড়া আমাদের পারিবারিক গঠন কাঠামোতেও মারাত্মক গলদ দেখা যাচ্ছে। সন্তান লালন-পালনে মা-বাবার ভূমিকায় সমস্যা রয়েছে। সন্তানের প্রতি মা-বাবা এবং মা বাবার প্রতি সন্তানদের কর্তব্য পালনে ঘাটতি থাকার কারণেই মা সন্তানকে হত্যা করছে, আর মা-বাবাকে খুন করছে ঐশির মত নেশাসক্ত সন্তানরা। আমরা ছোটবেলায় লক্ষ্য করেছি যে, ছেলে মেয়েরা বাবা মার কাছ থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেত। সেই নীতি নৈতিকতার শিক্ষাটা এখন কি পাচ্ছে? এক সময় মক্তবকেন্দ্রিক যে ধর্মীয় শিক্ষাটা চালু ছিল, সেটি শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক ভীতটি বেশ ভালভাবে রচনা করে দিত। এখন কি গ্রামে, কি শহরে শৈশবের সেই ধর্মীয় শিক্ষা নেই বললেই চলে।

দিনে দিনে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে সংকুচিত করার ফল হাতেনাতে পাচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। যত অনৈতিক ও অবক্ষয়জনিত ঘটনা ঘটছে, তাতে সত্যিকারের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কোন ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা মিলেছে এমনটা কেউ দাবী করতে পারবে না। কেবল বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর যেখানেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব যত বেশী সেখানে অনৈতিক কর্মকান্ডের ব্যাপকতা তত কম। কোরআন নির্ধারিত বিচার ও শাস্তি চালু থাকায় সৌদি আরবে ধর্ষনের ঘটনা বিশ্বে সর্বনিম্ন সংখ্যক।

আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি রেইনট্রির সাফায়াত, সাদমান, টাঙ্গাইলের খায়রুল, ভার্সিটির মুজাহিদ বা পটিয়ার কাশেমদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়াবো? বিকারগ্রস্ত আরমানদের ঘৃণ্য ব্যভিচার-পাপাচার করতে দিয়ে কোটি কোটি পিতাকে লজ্জায় ডুবাবো, নাকি এখনই শক্ত হাতে এর লাগাম টানবো? নীতি-নৈতিকতার স্খলনের উপায়- উপাদানগুলোর রাশ টানার সময় কি এখনো হয়নি?

সর্বব্যাপী অবক্ষয়রোধে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে সবাইকে। এখানে রাষ্ট্রের, সমাজের ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রথমে পরিবার থেকে শৈশব-কৈশোরে ধর্ম চর্চা, ধর্মীয় বিধি বিধান ও নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। এরপর স্কুল-কলেজ তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সত্যিকারের ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষা এবং বাস্তব জীবনে অনুশীলনের চর্চার মাধ্যমে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগরুক রাখতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের কোমলমতি শিশু-কিশোরদের পাঠ্যসূচীতে শারিরীক শিক্ষার নামে যৌন সুড়সুুড়িমূলক পাঠক্রম রাখা উচিত হবে কিনা- তা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।

এছাড়া সমাজে সৎকাজের উৎসাহ আর মন্দ কাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা দল, মত, পথ নির্বিশেষে নিশ্চিত করতে হবে। যদি অন্যায়-অপকর্ম করে কেউ পার পেয়ে যায়, ক্ষমতাশালীরা যদি অবিচার-অনাচার চালিয়ে যান, তাহলে নতুন প্রজন্ম একই পথে উৎসাহিত হয়। সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়াটা হয়ে পড়ে সদূরপরাহত। [ঢাকা, ২৪ জুলাই, ২০১৭।]

লেখকঃ এম আবদুল্লাহ, সাংবাদিক, নগর সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ ও মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)।

ই-মেইল- mabdullahbd@gmail.com


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি