নওমুসলিমা শাহনাজ বেগমের ঈমানদীপ্ত উপাখ্যান

 

।। অনুবাদ- আশরাফ করীম সিদ্দীক ।।

সৎমায়ের অত্যাচার, নির্যাতন সইতে না পেরে শাহনাজ বেগম বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। তাকে আশ্রয় দেয় দিল্লী শহরের একটি মুসলিম পরিবার। মুসলিম পরিবারের সদস্যদের আচার ব্যবহার এবং ইসলামের সুন্দর্য্যময় বিভিন্ন বিষয় দেখে তিনি ইসলামের প্রতি উদ্ভুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। আসুন, আমরা তার মুখ থেকেই তার ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত বিবরণ শুনি।

জম্মু শহরের শিক্ষিত এক পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতা কুলদিপ নারায়ণ স্থানীয় কলেজের শিক্ষক। আমার মা অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত একজন মহিলা। কিন্তু ছোট বয়স থেকেই তিনি মারাত্মক ব্যধিতে ভূগছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! বিয়ের পরে তার সেই রোগ আরো বৃদ্ধি পায়। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, একদিন মা আমাকে নদীর ব্রীজের উপর নিয়ে গেলেন। নদীতে ফেলার জন্য আমাকে ঝাপটে ধরলেন, আমার চিৎকারে এক ব্যক্তি দৌড়ে এলো। তার সাথে একটি বাচ্চা ছেলেও ছিলো। লোকটি মায়ের মনোভাব বুঝতে পারলেন। লোকটি কৌশলে মাকে বললেন, আমার সাথে যেই বাচ্চাটি দেখছেন, ও আমার সন্তান। আমি ওকে নদীতে ফেলে দেবো, ওর কপাল অত্যন্ত মন্দ। জীবিত থাকলে তাকে অনেক দুঃখ কষ্ট সইতে হবে। এরপর তিনি আমার দিকে ইশারা করে বললেন, বাচ্চাটি কি আপনার? ওর ভবিষ্যত ভাগ্যতো অনেক ভালো! সুখ শান্তিতেই ওর জীবন কাটবে। বাচ্চার ব্যপারে আপনি কোন চিন্তা করবেন না। বাচ্চাকে আপনি পানিতে ফেলবেন না। জানি না লোকটির কথায় কি এমন জাদু ছিল, যদ্দরুন মা আমাকে পানিতে ফেলা থেকে বিরত থেকেছেন।

এই ঘটনার বছর খানেক পর আমার চিরদুঃখী মা পরকালে পাড়ি জমান। মায়ের মৃত্যুর ছয় মাস পর, আমার পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎমা আসার পর আমি ও আমার ছোট ভাই সন্দ্বিপ নারায়ণ একেবারে অসহায় হয়ে পড়লাম। সৎমা আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করতেন। অত্যাচার নির্যাতনে আমাকে অতিষ্ট করে রাখতেন। কঠিন এই অবস্থার মধ্যেই আমি মেট্রিক পরিক্ষা দিয়েছি এবং কৃতিত্বের সাথেই পাশ করেছি। নির্যাতনের মাত্রা এতো বেশি ছিলো যে, ঘর আমার কাছে জাহান্নাম মনে হতো। অতিষ্ঠ হয়ে কয়েক বার ব্যর্থ আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু আমার উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ছিলো। তাই আত্মহত্যার চেষ্টা করেও সফল হইনি।

সৎমা প্রায় সময় পিতার কাছে আমার ব্যাপারে মিথ্যা নালিশ দিতেন। পিতা অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে আমাকে বকাঝকা করতেন। আমার করার কিছুই ছিল না। নিরবে শুধু অশ্রু ঝরাতাম। মাঝে মাঝে মন্দিরে গিয়ে মাটির দেব-দেবীর পূজো করতাম। প্রার্থনার সুরে মাটির এই স্তুপগুলোকে বলতাম, কবে হবে আমার আঁধার রাতের সকাল! কবে যাবে আমার বেদনার পাহাড়! নির্জীব এসব দেব-দেবী প্রার্থনার জবাব দেবে তো দূরের কথা, তাদের শরীরে বসা মশা মাছি তাড়াতেও বড় অক্ষম। মহান আল্লাহ পাক তাঁর কালামে হাকীমে ইরশাদ করেন- তোমরা তাদের আহ্বান করলে তারা তোমাদের আহ্বান শুনবে না এবং শুনলেও তারা তোমাদের আহ্বানে সাড়া দেবে না। তোমরা তাদের যে শরীক করেছো, তা ওরা ক্বিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের সম্পর্কে সর্বজ্ঞ আল্লাহ্র ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করতে পারে না। (সূরা ফাত্বির, আয়াত-১৪)।

আমি কুরআনের এই আয়াতটি যখন তিলাওয়াত করি, পূর্বের কৃতকর্মের জন্য বড় আফসুস হয়। হায়! কুরআনের এই আয়াত যদি আরো আগে জানতাম! সৎমায়ের সাথে আমি একদিন কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে একটি মুর্দাকে দাফন করা হচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে মাকে আমি বললাম, মৃত্যুর পর আমাকেও যেনো এভাবে দাফন করা হয়, চিতায় যেনো আমাকে জ্বালানো না হয়।

আমার এই কথায় সৎমা আমাকে অনেক তাচ্ছিল্য করলেন। সৎমায়ের গালি গালাজ শোনাটা আমার প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছিলো। নিত্য দিন ভিন্ন ভিন্ন রূপে পিতার কাছে অভিযোগ পেশ করতেন। এই ধারাবাহিকতায় একদিন সৎমা আমার উপর পাঁচশত রুপি চুরির অপবাদ দিলেন। আমাকে অনেক হেনস্তা করলেন। সেদিন হৃদয়ে আমার অনেক রক্ত ঝরেছিলো! নয়ন বেয়ে অঝোরে অশ্রু বর্ষেছিলো। বিমর্ষ মনে আমি ভাবছিলাম, আজ তারা আমাকে চুরির অপবাদ দিয়েছে। পরবর্তিতে এর চেয়ে বড় অপবাদ দিতেও তারা কুণ্ঠিত হবে না। তাই বাধ্য হয়েই আমি ঘর ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার কাছে একশত রুপি ছিলো। কিছু কাপড় চোপড় ব্যাগে পুরে অজানার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমাদের বাড়ীটি ছিলো সংকীর্ণ গলিতে। কয়েক কদম হাঁটার পরে দেখি পিতা মেইন রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকছেন। পিতাকে দেখে আমার হৃদকম্পন বেড়ে গেলো। ভয় হচ্ছিল, না জানি কি হয়। গলির কিনারা দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহে পিতা আমার পাশ দিয়েই হেঁটে গেলেন, কিন্তু আমার দিকে তার দৃষ্টি পড়েনি। আসলে রাব্বুল আলামিন আমাকে হিদায়াতের অমীয় সূধা পান করাবেন, তাই পিতার চোখে পর্দা ঢেলে দিয়েছিলেন।

কিছুটা দূরেই রেল স্টেশন। স্টেশনে পৌঁছে ভাবতে লাগলাম কোথায় যাবো? কে হবে আমার আশ্রয়দাতা! অবশেষে দিল্লিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিকিট কাটলাম। কিন্তু কোন বগিতে উঠতে হবে, তা আমার জানা ছিলো না। সেনাবাহিনির সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট একটা বগি রয়েছে, আমি সেই বগিতেই গিয়ে উঠলাম। মেয়ে মানুষ হওয়ার কারণে, সেই বেচারাগণ আমাকে একটা সীট দিলেন। ট্রেন চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর একজন টিটি এলেন। আর্মিদের বগিতে আমাকে দেখে তিনি টিকিট চাইলেন। আমার বরাবর একজন সেন্য বসা ছিলো, সেই সৈন্য টিটিকে বললেন, ওতো আমার বোন! এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ছিলো।

সেনাবাহিনীর সেই লোকটি সারা রাস্তায় বোনের মত আমার দিকে খেয়াল রেখেছিলেন। আরামের সাথে আমি দিল্লি পৌঁছলাম। স্টেশনের বাইরে এসে সিটি বাসে চড়লাম। আমার সীটের সামনে দু’জন যুবক বসা ছিলো। তারা পরস্পর বিভিন্ন আলোচনা করছিলো। তাদের আলোচনার দ্বারা বুঝতে পারলাম তারা ভদ্র ঘরের সন্তান।

আমি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললাম, ভাইয়া! আমাকে দিল্লির কোন হোস্টেলের ঠিকানা বলতে পারবেন? তারা আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি সংক্ষিপ্তভাবে আমার ব্যাপারটি তাদেরকে খুলে বললাম। আমার সমস্যায় তারা চিন্তিত হলেন। তারা বললো, হোস্টেল তো অনেক দূরে। আপনি এক কাজ করুন, আমাদের এক বোন আছে, সে পড়ালেখা করে। তার ঘরে কোন পুরুষ নেই। কিছু সময় তার ঘরে কাটান। সময় করে সে নিজেই আপনাকে হোস্টেলে পৌঁছে দেবেন। তাদের অমায়িক ব্যবহারে আমি আশ্বস্ত হলাম। তারা আমাকে তাদের বোনের কাছে নিয়ে গেলেন। তাদের বোন আমার সমস্যার ব্যাপারটি বুঝতে পেরে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। নাস্তা পানি করালেন। এবং বললেন, আমার এক নিকটাত্মীয় আছেন, যার নাম জনাব আরীফ সাহেব। আপনি বরং প্রথমে তার সাথে আপনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন। তারপর না হয় আমি নিজেই আপনাকে হোস্টেলে দিয়ে আসবো।

সেদিনই তিনি আমাকে আরীফ সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি বিস্তারিতভাবে আরীফ সাহেবকে আমার ঘটনা বললাম। আমার কাহিনী শোনার পর আরীফ সাহেব অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ভাবে মূর্তি পূজার অসারতা ও ইসলামের মহত্বের বিষয়টি আমাকে বুঝালেন। তার কথা শোনার পর আমার হৃদয়ে অস্থিরতা অনুভব করলাম। মূর্তি পূজার অপকারিতা বুঝতে পারলাম। ধারাবাহিকভাবে কয়েক দিন মুসলমানের মাধুর্য্যপূর্ণ ব্যবহার, মুসলিম যুবতী বোনের আন্তরিকতা এবং ইসলামী আক্বিদা বিশ্বাস সম্পর্কে কিঞ্চিত অবগতি লাভ ইত্যাদি বিষয়গুলি আমাকে ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহী করে তুললো। এমনকি আমি নিজেই একদিন আরীফ সাহেবের কাছে আমার ইসলাম  গ্রহণের আগ্রহ ব্যাক্ত করলাম।

তিনি আমাকে বুঝালেন, ঈমান প্রত্যেকটা মানুষের জন্য অপরিহার্য্য একটা বিষয়। কিন্তু তুমি তো আমাদের এখানে এসেছো বিপদে পড়ে। কোন জবরদস্তি বা সামান্য ইহসানের বদলা দেওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করাটা তোমার উচিৎ হবে না। তবে যদি বুঝে শুনে নিজের সবচেয়ে অপরিহার্য্য বিষয় মনে করে, ইসলাম গ্রহণ করতে চাও, এটাতো খুশির খবর! আমাদের এক বোন জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে নিষ্কৃতি পাবে; এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সন্তুষ্টির সাথে আরীফ সাহেবকে ইসলাম গ্রহণের কথা বললাম। তিনি আমাকে পবিত্র কালিমা পড়িয়ে দিলেন। আমি ইসলামী শিক্ষা অর্জনের ব্যাপারে আরীফ সাহেবের কাছে পরামর্শ চাইলাম। তিনি আমাকে মেওয়া নামক শহরে একটি ইসলামি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। প্রথমে সেখানে আমার কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। পরবর্তীতে অবশ্য সব ঠিক হয়ে যায়।

ইসলামি শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান আমার কাছে অত্যন্ত উপকারী মনে হতে লাগলো। আলহামদুলিল্লাহ! কয়েক মাসের মধ্যে কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত শিখার তৌফিক হয়েছে। এছাড়াও দুআ কালাম ও বিভিন্ন ধরণের মাসআলা মাসায়েলও শিখা হয়েছে। আমি যখন মেওয়া থেকে দিল্লিতে ফিরে এলাম। আরীফ সাহেব একটি ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করলেন। ছেলেটি দ্বীনদার ছিলো না, অথচ আমার জন্য তখন দ্বীনদারীটাই মুখ্য বিষয় ছিলো। আমি ভয়ে ভয়ে আরীফ সাহেবকে বললাম, আমার জন্য একজন দ্বীনদার ছেলে তালাশ করলে উত্তম হতো। চাই সে ছেলে দরিদ্র হোক না কেনো। দ্বীনদার ছেলের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে, সেখানে আর বিয়ে দিলেন না।

তিনি নিজের মেয়ের জন্য দৈনিক পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনটি মাওলানা জায়েদ আশরাফ নদভী সাহেবের দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি ইতিপূর্বে একটি বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় তাদের সেই সম্পর্ক বেশি দিন টেকেনি। হয়তো এটা আমার খোশ কিসমতের কারণ হয়ে থাকবে। জায়েদ আশরাফ সাহেবের পিতা-মাতা ইন্তেকাল করেছেন। তিনি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে, নিজের ভাইদের সাথে কোন পরামর্শ না করেই, আরীফ সাহেবের কাছে বিয়ের খোঁজ খবর নিতে আসলেন। আরীফ সাহেব আমার মুহাব্বতের কারণে অথবা জায়েদ সাহেবের পূর্ব বিবাহের কারণে, নিজের মেয়ের কথা তাকে না বলে আমার ব্যাপারে জায়েদ সাহেবকে প্রস্তাব দিলেন।

ইতিপূর্বে আমার ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত বিবরণ একটি খাতায় আমি নোট করে রেখেছিলাম। আরীফ সাহেব মাওলানা জায়েদ সাহেবকে আমার লেখাটি দেখালেন। জায়েদ সাহেব লেখাটি পড়ে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন এবং আমাকে দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। জায়েদ সাহেব আমাকে দেখে পছন্দ করলেন এবং একদিন যোহরের নামায শেষে আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। জায়েদ সাহেব আমাকে তার বাড়িতে নিতে চাচ্ছিলেন না। কেননা এ ব্যাপারে তিনি নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে বিরোধীতার আশংকা করছিলেন। এ কারণে আমাকে তিনি লক্ষ্ণৌ নিয়ে গেলেন। এখানে কিছুদিন থাকার পর বোম্বের অধীবাসী তার এক বন্ধু মুফতী আব্দুল হামীদ সাহেবের বাসায় নিয়ে গেলেন। তার এখানে এক বছর রাখলেন।

মুফতী সাহেবের মা বাবা আমার সাথে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করতেন। আল্লাহ্ তায়ালা আমার উপর একের পর এক অনুগ্রহ করছিলেন। ইতোমধ্যে জায়েদ সাহেব মদিনা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়ে গেলেন। যে কোন ভাবে তিনি আমার জন্যও মদিনা শরীফের ভিসা জোগাড় করলেন। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মদিনা শরীফে অবস্থান করছি। মদিনার আলো বাতাশ আমার কাছে অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক মনে হয়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে তিনটি সন্তান দান করেছেন। তারাও মদিনার আলো বাতাশে বেড়ে উঠছে। আমার স্বামী একটু লাজুক ধরনের। আল্লাহ তায়ালা আমাকে মাওলানা সাহেবের সুরতে কমল, উদার ও সহনশীল একজন স্বামী দান করেছেন। এছাড়াও মদিনায় বসবাসের ব্যবস্থা করে আল্লাহ তায়ালা আমার জীবনের সব পেরেশানি দূর করে দিয়েছেন।

এখানে জায়েদ সাহেবের একজন আলেম বন্ধু রয়েছেন। তার নাম মুফতী আশেকে ইলাহী। আমি তার বাসায় গিয়েছি। মুফতী সাহেবের স্ত্রী উম্মে জান সাহেবার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। পরিচয় পেয়ে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি আমাকে অনেক সমাদর করলেন। মুফতী সাহেবের কাছে তিনি আমার জীবন বৃত্তান্ত বললেন। অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ব থেকেই মুফতী সাহেবের আগ্রহ ছিলো। যে কারণে তিনি দিল্লির মাওলানা কলিম সিদ্দিকী সাহেবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

মুফতী সাহেব অন্য একদিন আমার স্বামীকে ডেকে, আমাকেসহ তার বাসায় দাওয়াত করলেন। আমরা তাদের বাসায় গেলাম। সেদিন থেকে তারা উভয়য়ে আমাকে মেয়ে বানিয়ে নিলেন। এবং এখন পর্যন্ত তারা আমাকে নিজ মেয়ের মত দেখে থাকেন। উম্মে জান সাহেবা বার্ধক্যের দুর্বলতা সত্ত্বেও, নিজ হাতে আমার বাচ্চাদের কাপড় পরিয়ে দেন। আলহামদুলিল্লাহ! মুফতী সাহেবের ছেলে মেয়েরাও আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে থাকেন। তারা আমাকে নিজ বোনের মতই দেখেন, বরং অন্য ভাই বোনদের চেয়ে আমার খোঁজ খবর একটু বেশিই রাখেন। মাওলানা কলিম সিদ্দিকী সাহেবের সাথে আমার স্বামীর ভালো সম্পর্ক ছিলো। কলিম সিদ্দিকী সাহেব একবার ওমরা করার জন্য তার মেয়েসহ মক্কায় এলেন।

আমরা তাদের সাথে দেখা করতে গেলাম। মদিনার অধিবাসী হওয়ার সুবাদে কিছু মেহমানদারীও করলাম। আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, খেদমতের মধ্যে আল্লাহ পাক বড় প্রভাব রেখেছেন। মানুষ যদি খেদমতের অভ্যাস করতে পারে, তাহলে পাথরের মত কঠিন হৃদয়েও জায়গা করে নিতে পারে। আলহামদুল্লিাহ কারো খেদমত করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগে। মাজুর বা বৃদ্ধা মহিলাদের কাপড় ধোয়া, মাথায় তেল দেয়া এবং হাত পা টিপে দিতে পারলে, নিজেকে আমার সৌভাগ্যবান মনে হয়। নিজের সামান্য আরামকে কোরবান করে যদি বড়দের খেদমত করা যায়, তাহলে তাদের আন্তরিক দোয়ার বরকতে দুনিয়া ও আখেরাতে চিরস্থায়ী কল্যাণ সাধিত হবে, ইনশাল্লাহ।

আমি তো নিজ বাচ্চাদের লালন পালন করাটাকেও আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ মনে করি। স্বামীর উপর খরচের বোঝা কমানোর জন্য আমি বাসায় টিউশনি করি। আলহামদুলিল্লাহ! আমার নিয়্যাতের কারণে প্রত্যেক কাজের মধ্যে আমি আনন্দ অনুভব করি। আমাদের ধর্মে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে অত্যন্ত জোর দেওয়া হয়েছে। নিয়্যাত ঠিক থাকলে প্রত্যেক কাজের মধ্যেই স্বাদ অনুভব হয়। জীবনে একবার যিনি মদিনা শরীফ দেখেছেন, জান্নাত ছাড়া অন্যকোনো যায়গা তার পছন্দ হতে পারে না। আমার শেষ ইচ্ছা হল জান্নাতুল বাকীর পবিত্র মাটির বুকে যেন আমার ঠাঁই হয়। দুআর মধ্যে আমি প্রতিনিয়ত বলি, হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাতুল বাকীতে ঠাঁই দিও।

আমি বাড়ি ছেড়ে এসেছি বহু বছর হয়ে গেছে। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আর খোঁজ করেনি। তারা ভেবেছে আমি বোধহয় আত্মহত্যা করেছি। মদিনা ভার্সিটিতে জম্মুর এক ছাত্র পড়তো। কিভাবে যেন সে আমার ঠিকানা পেয়ে গেলো। আমার পিতাকে সে আমার ঠিকানা বলে দিলো। আমি বেঁচে আছি এই খবর জানতে পেরে পিতা ও ভাই আমাকে দেখার জন্য ব্যকুল হয়ে গেলেন। অনেক ভেবে চিন্তে কিছু দিনের জন্য দিল্লিতে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার দিল্লিতে আসার সংবাদ জানতে পেরে, পিতা ও ভাই তাৎক্ষণিকভাবে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। আমাকে কাছে পেয়ে তারা অঝোরে কাঁদলেন। আমার বিস্তারিত ঘটনা তাদেরকে খুলে বললাম। তারা খুব লজ্জিত হলো।

দিল্লিতে কিছুদিন থাকার পর আমি মদিনায় ফিরে এলাম। এখানে আসার পর পিতা ও ভাই দুই তিন দিন পর পরই আমাকে ফোন করতো। আমার স্বামী ও আমি তাদের ফোন ধরতাম। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতাম। ইসলামের বিভিন্ন ভালো দিক তাদের সামনে তুলে ধরতাম। আল্লাহর রহমতে এক সময় তারা মূর্তি পূজা ছেড়ে দিলেন। আমার স্বামী দিল্লিতে মাওলানা কলিম সিদ্দিকী সাহেবকে বিষয়টি জানালেন। কলিম সিদ্দিকী সাহেব আমার পিতা ও ভাইয়ের ঠিকানা জোগাড় করে তাদের পিছনে দাওয়াতি লোক লাগালেন। তিনি আমাদেরকে আশ্বাস দিলেন যে, ইনশাআল্লাহ অচিরেই তারা ইসলাম গ্রহণ করবেন।

একদিন ফোনে সৎমায়ের সাথেও কথা হয়। তিনি আমার কাছে অনেক কাকুতি মিনতির সাথে মাফ চাইলেন। কিন্তু আমার ভাগ্যের উন্নতি ও পেরেশানি থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে সৎমায়ের অবদানই তো সবচেয়ে বেশি ছিলো। তার অত্যাচার নির্যাতনের বোদৌলতেই তো আমি হিদায়েতের অমীয় সূধা পান করে ধন্য হয়েছি। আমার প্রতি বড় ইহসান ও অনুগ্রহকারী হিসাবে, সৎমায়ের হিদায়েতের জন্য আমি সব সময় কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে দুয়া করি। বিগত হজ্বে আরাফার ময়দানে তার জন্য সবচেয়ে বিশি হিদায়েতের দুয়া করেছি।

সৌদি আরবের বিদ্যালয় গুলোতে পাঠদান পদ্ধতি অত্যন্ত সুন্দর। বিশেষ করে উত্তম চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে সেখানে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের আশা, ইনশাআল্লাহ আমাদের প্রত্যেকটি বাচ্চা দ্বীনের খেদমত আনজাম দেবে। আলহামদুলিল্লাহ! আমিও আল্লাহর অনুগ্রহে মুফতী আশেকে ইলাহী সাহেবের কুরআনের তাফসীর “নওয়ারুল বায়ানের” হিন্দি অনুবাদ সম্পন্ন করেছি। এই অনুবাদ আমি তার জীবদ্দশাতেই শুরু করেছিলাম। আমার আশা, আল্লাহ পাক আমার দ্বারা কুরআনে হাকীমের এই খেদমত আনজাম দেবেন।

মুসলমান ভাই বোনদের কাছে আমার আবেদন থাকবে, তারা যেন সঠিক ভাবে নিজেদের যিম্মাদারী পালন করেন এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সাথে নিজেদের আমল আখলাকও পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধাঁচে হওয়া চাই। আমাদের আমল দ্বারাই যেনো রাসূলুল্লাহ (সা.)এর আদর্শ ফুটে ওঠে। লোকদের সামনে যদি নবী কারীম (সা.)এর আমল বাস্তবায়ন করা যায়, তখন লোকেরা নায়ক-নায়িকাদেরকে আদর্শ না বানিয়ে নবিজী (সা.)কে আদর্শরূপে গ্রহণ করবে। এছাড়াও রেডিও টিভি এবং মিডিয়ার মাধ্যমেও লোকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। এ কাজের জন্য মুসলমান ভাই বোনদেরকে পর্যাপ্ত শ্রম দিতে হবে এবং সম্পদ ব্যয় করতে হবে।

আমার আরেকটি আবদার হচ্ছে আপনারা সবাই আমার এবং আমার পরিবারে জন্য দুআ করবেন। আমরা যেনো মহান আল্লাহর কাছে দ্বীনের খাদেম, বিশেষ করে দ্বীনের দায়ী হিসাবে কবুল হতে পারি। আমাদের কতিপয় হিতাকাংখী বলে থাকেন, তোমরা এতদিন যাবত মদিনাতে বসবাস করছো, অথচ বাড়ি বানাওনি। আমি তাদেরকে বলে দেই, আমরা তো কেবল জান্নাতুল বাকীর পাক মাটিতে সমাহিত হওয়ার আশায় এখানে পড়ে রয়েছি। দুনিয়া কামাতে হলে তো প্যারিসে যেতাম, নিউওয়র্কে যেতাম। এটাতো শুধু তাদের কথার জবাব দেওয়ার জন্য বলতাম। নতুবা আমার খেয়াল হচ্ছে দুনিয়ার যিন্দেগীর সুখ শান্তি তো মূলতঃ মদিনায় বসবাসের মধ্যেই রয়েছে। হে আল্লাহ! প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে মক্কা মদিনা যিয়ারতের স্বপ্ন দিও, তারপর স্বপ্নের তাগাদা এবং সব শেষে স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে মুমিনের অন্তর পরিতৃপ্ত করো। আমীন॥

মূল লেখা– মাসিক বেদারে ডাইজেস্ট।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি