জিজ্ঞাসা-সমাধান

 

ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ

আল-জামিয়াতুল আহ্লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

বিয়ের মহর ও তালাক সংক্রান্ত

(৮০৪৮) মুহাম্মদ রেজাউল করিম, সদর, নওগাঁ।

জিজ্ঞাসাঃ আমি পড়া-লেখা করা অবস্থায় এক মেয়েকে বিবাহ করি। বিবাহের সময় মহর নির্ধারিত করতে চাইছিল এক লক্ষ টাকা। তাতে আমি রাজি হইনি। আমি বলেছি ২,৫০০ টাকা মহর দিব, তাতে তারা রাজি হয়েছে। কিন্তু তারা বলে যে, সরকারী খাতায় এক লক্ষ টাকা থাকবে, তুমি ২,৫০০ টাকা মহর আদায় করবে, আমি তাতে রাজি হই। তার পরে আমাদের বিয়ে হয়। আমরা দু’জন এক বছর যাবৎ সংসার করি। এক বছর পর আমাদের দু’জনের (স্বামী-স্ত্রী) এর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়। বিবাদ হওয়ার কারণে তাকে আমি তার বাবার বাড়ীতে রেখে আসি। এবং রেখে আসার সময় আমার শাশুড়িকে বললাম যে, আমি আপনার মেয়েকে তিন বছর পর আমার বাড়ীতে নিয়ে যাব, আমার কথায় তারা রাজি হয়। কিন্তু আমি মাঝে মধ্যে আমার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। হঠাৎ করে শুনতে পেলাম যে, আমার স্ত্রী অন্য এক ছেলেকে বিবাহ করেছে।

এখন আমার প্রশ্ন হল- (ক) আমার স্ত্রীর এই বিবাহ সহীহ হবে কিনা? (খ) মহর বাবদ ৮০০ টাকা দিয়েছি এখন আমার মহর আদায় করতে  হবে কিনা? যদি মহর আদায় করতে হয়, তাহলে কোনটা আদায় করব, সরকারী খাতায় যেটা লেখা আছে সেটা, না মৌখিক ভাবে যেটা নির্ধারিত হয়েছে সেটা?

সমাধানঃ যদি পারস্পরিক গোপনে আড়াই হাজার টাকা মহর আদায় করার চুক্তি হয়ে থাকে এবং তার উপর সাক্ষীও থাকে, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে আড়াই হাজার টাকাই আদায় করা আপনার উপর ওয়াজিব। তবে যদি আক্বদের সময় এক লক্ষ টাকা মহর উল্লেখ করে আক্বদ সম্পন্ন হয়, আর কাবিন নামায়ও তা লেখা হয়, আর মেয়ে পক্ষও মহর বাবদ এক লক্ষ টাকা দাবি করে, কিন্তু আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণের উপর কোন সাক্ষী না থাকে, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার উপর এক লক্ষ টাকা মহর আদায় করা ওয়াজিব। হ্যাঁ, যদি আড়াই হাজার টাকা মহর ধার্য্যরে উপর কোন সাক্ষী থাকে, কিন্ত সরকারি কাবিন নামায় এক লক্ষ টাকা লেখা থাকার কারণে, মেয়ে পক্ষ যদি মহর বাবদ এক লক্ষ টাকা দাবি করে, তাহলে সরকারি কানুন অনুযায়ী যদিও আপনাকে এক লক্ষ টাকা মহর আদায় করতে হবে। কিন্ত তাদের জন্য মহর বাবদ এক লক্ষ টাকা দাবি করা এবং এক লক্ষ টাকা গ্রহণ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয ও হারাম হবে। কারণ আড়াই হাজার টাকা মহর আদায় করার চুক্তিতে এবং তার উপর সাক্ষী রেখে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আড়াই হাজার টাকা ওয়াজিব হওয়ার সূরতে লক্ষণীয় বিষয় হল, মহরের নিম্ন পরিমাণ হচ্ছে দশ দিরহাম তথা ২.৬২৫  ভরি রৌপ্য (প্রায় পৌনে তিন ভরি রৌপ্য) বা তার সম মূল্য। অতএব আক্বদের সময় নির্ধারিত আড়াই হাজার টাকা যদি দশ দিরহামের সমমূল্য হয়ে থাকে বা তার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে আড়াই হাজার টাকাই মহর বাবদ আদায় করা আপনার উপর ওয়াজিব। কিন্তু আক্বদের সময় নির্ধারিত আড়াই হাজার টাকা যদি দশ দিরহাম তথা ২.৬২৫ ভরি রৌপ্যর সমমূল্য না হয়, তাহলে দশ দিরহাম তথা ২.৬২৫ ভরি রৌপ্যের সমমূল্য পরিমাণ মহর আদায় করা আপনার উপর ওয়াজিব।

বিঃ দ্রঃ প্রশ্ন (ক) তে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি যে, আপনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন কি না? অথবা বিবাহের পর স্ত্রীকে কোন শর্তের সাথে বা শর্ত ছাড়া তালাক প্রদানের অধিকার দিয়েছিলেন কি না? চাই কাবিন নামায় হোক বা মৌখিক ভাবে হোক। সুতরাং তারই ফলশ্রুতিতে আপনার স্ত্রী নিজেই নিজেকে তালাক প্রদান করেছেন কিনা? অথবা কোর্ট থেকে তালাক প্রদান করিয়ে নিয়েছেন কি না? অতএব, এ ধরণের কোন বর্ণনা প্রশ্নে উল্লেখ না করায় এবং কাবিননামা না পাঠানোর কারণে প্রশ্ন (ক) এর সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। (ফতওয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ-১/৩১৫, শরহুল বিদায়া-২/৩২৪, শরহুত তানবির মাআল ফাত্ওয়ায়ে শামী-৪/২৩০, ফাত্ওয়ায়ে আলমগীরী-১/৩০২)।

 

দাম্পত্য আচরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত

(৮০৪৯) মুহাম্মদ আশিকুর রহমান, বোয়ালিয়া, রাজশাহী।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) মিলনের সময় স্বামী বা স্ত্রী কি একে অপরের যৌনাঙ্গে চুম্বন বা মুখ লাগাতে পারবে? যদি তা নাজায়েয হয়, তথাপি কেউ ভুল বশত বা উত্তেজনা বশতঃ এই কার্য করে, তাহলে তার করণীয় কি?

(খ) নব দম্পত্তি যদি পেশাগত সমস্যার (যেমন ছাত্র-ছাত্রী হওয়ায় বা চাকুরীর কারণে বিচ্ছিন্ন অবস্থান) কারণে অথবা নব-দাম্পত্য জীবন উপভোগকল্পে প্রথম সন্তান গ্রহণের পূর্ববর্তী সময়টাকে দীর্ঘায়িত করতে চায় (৩-৫ বছর), তাহলে এ পরিস্থিতিতে তারা কি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে বড়ি ব্যবহার করতে পারবে?

সমাধানঃ (ক) মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার কথাবার্তা, চালচলনে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভদ্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব একান্ত প্রয়োজন। আপনার প্রশ্নোক্ত বিবরণটি পশ্চিমাদের নোংরা অভ্যাস যা পশুদের মধ্যে পাওয়া যায়। মানুষ হয়ে পশুর ন্যায় এমন কু-অভ্যাস সুস্থ মেধা সম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা অসম্ভব। চিন্তা করা উচিত, যে মুখ পবিত্র কালিমা, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকির ও দরূদ শরীফ পাঠ করে, সে মুখ কিভাবে এ নিম্নমানের কাজে ব্যবহার হতে পারে? সুতরাং এ ধরণের নোংরামি, রুচি বিবর্জিত কাজ শরীয়তে নাজায়েয, তথা মাকরুহে তাহরীমি ও গুনাহের কাজ। অতএব, তা পরিহার করা একান্ত প্রয়োজন। তবে স্ত্রী যদি উত্তেজনা বশতঃ পুরুষাঙ্গকে তার মুখে নেয়, তাহলে তাকে ক্ষমাগণ্য করা হবে। কিন্তু এ ধরণের অভ্যাস করে নেয়াও মাকরূহে তাহরীমি। (ফাত্ওয়ায়ে আলমগীরী-৫/৩৭২, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-৮/৪৫, ফাত্ওয়ায়ে মাহমুদিয়্যাহ-২৯/১৪২, ফাতওয়ায়ে রহিমিয়্যা-১০/১৭৮, জামিউল ফাত্ওয়া-৩/২৩৪)।

(খ) ইসলামী শরীয়তের বিধি অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনা, অর্থাৎ- জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা কোন ক্রমেই জায়েয নেই। আর এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে হ্যাঁ, বিশেষ কোন অসুস্থতা, গর্ভধারণের কারণে প্রাণনাশের প্রবল আশংকা অথবা মায়ের বুকের দুধের অভাবে সন্তানের জীবন নাশের প্রবল আশংকা ইত্যাদি কারণে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতির যে কোন একটি সাময়িক সময়ের জন্য কোন অভিজ্ঞ মুসলিম দ্বীনদার ডাক্তারের পরামর্শক্রমে গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ধরণের বিশেষ ওযর ব্যতীত শুধু অভাব অনটন, দৈহিক সৌন্দর্য অটুট রাখা, কিংবা নব দাম্পত্য জীবন উপভোগ কল্পে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা কোন ক্রমেই জায়েয নেই; সম্পূর্ণ রূপে হারাম। সুতরাং প্রশ্নোল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী পেশাগত সমস্যা কিংবা দাম্পত্য জীবন উপভোগ কল্পে প্রথম সন্তান গ্রহণের পূর্ববর্তী সময়কে দীর্ঘায়িত করে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা বৈধ হবে না। (সূরায়ে বনী ইসরাঈল-৩১, সূরায়ে আনআম-১৫১, বুখারী শরীফ-২/৭৫৯, মুসলিম শরীফ-১/৪৬৬, আবুদাউদ-১/২৯৫, ২/৫৪২,  ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ-৫/৩৫৭, রদ্দুল মুহতার-৪/৩৩৬, ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়্যা-২৭/৩৫৮, জাওয়াহিরুল ফিক্বহ্-৮/২৯৭)।

 

মিরাসী সম্পত্তির বণ্টন প্রসঙ্গে

(৮০৫০) মুহাম্মদ শাহ আলম, সদর, মুন্সীগঞ্জ।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) কোন ব্যক্তি তার দত্তক পুত্র, পৌত্র (ঔরসজাত পুত্রের পুত্র) এবং কন্যা রেখে মারা গেলে মীরাস কিভাবে বণ্টিত হবে?

(খ) একজন হানাফী মুসলমান তার মাতা, দুই বৈপিত্রেয় বোন এবং পিতার চাচাত ভাই রেখে মারা গেলে মীরাস কিভাবে বণ্টিত হবে?

(গ) শরীয়ত কাকে বলে? বিস্তারিত জানতে চাই।

সমাধানঃ (ক) ফরায়েয সংক্রান্ত শরীয়তের তরকা বণ্টন নীতিমালা অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয় যে- (ক) যদি কোন ব্যক্তি তার দত্তক পুত্র, পৌত্র (ঔরসজাত পুত্রের পুত্র) এবং এক কন্যা রেখে মারা যায়, তাহলে তার সমূদয় সম্পত্তি হতে তার কাফন দাফন ঋণ পরিশোধ ও স্ত্রীর মহর আদায় করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির ১/৩ অংশ দ্বারা তার অসিয়ত পুরা করতে হবে। (যদি মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করে থাকে)। অতঃপর অবশিষ্ট সম্পত্তি হতে কন্যা (একজন থাকার কারণে) ১/২ অংশ পাবে এবং পৌত্র (ঔরসজাত পুত্রের পুত্র)  (আছাবা হওয়ার কারণে) অবশিষ্ট ১/২ অংশ পাবে। দত্তক পুত্র (আছহাবুল ফারায়েজ ও আছাবার অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে) বঞ্চিত হবে।

(খ) যদি কেউ তার মাতা, দুই বৈপিত্রেয় বোন এবং পিতার চাচাত ভাই রেখে মারা যায়, তাহলে তার পরিত্যক্ত সমূদয় সম্পত্তি হতে পূর্বের ন্যায় কাফন-দাফন ইত্যাদি কাজগুলো সম্পাদন করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি হতে (মৃতের একাধিক বোন থাকার কারণে) মাতা পাবে ১/৬ অংশ, বৈপিত্রেয় বোন (একাধিক হওয়ার কারণে) দু’জন মিলে ২/৬ অংশ পাবে। এবং পিতার চাচাত ভাই ( আছাবা হওয়ার কারণে) অবশিষ্ট ৩/৬ অংশ পাবে।

(গ) আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) এর আনীত সকল বিধি-বিধান ও আইন-কানুনকে শরীয়ত বলে। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী-৬/৪৪৮, ৬/৪৫১, ৬/৪৪৯, শরীফিয়্যাহ-২১, ৩৮,২৯, ২০, হাশিয়ায়ে নুরুল আনওয়ার-১, মওসুআতে কাশ্শাফ ইসতেলাহাত আল ফুনুন ওয়াল উলূম-১/১০১৮, লিসানুল আরব-৩/৪২২, মু’জিমুল ফিক্বহে ওয়াল মুতাফাক্কিহ-৩৩৬ পৃষ্ঠা)।

 

মুসাফাহা সংক্রান্ত

(৮০৫১) এনামুল হক্ব, (ছাত্র- মেখল হামিউচ্ছুন্নাহ্ মাদ্রাসা) সিলেট।

জিজ্ঞাসাঃ আমি সিলেটের জনৈক এক আলেমের সাথে মুসাফাহা করলাম দুই হাত দ্বারা। এতে উনি বললেন, দুই হাতে মুসাফাহা করা সুন্নাত নয়, বরং এক হাতে মুসাফাহা করা সুন্নাত। আমার এই প্রশ্নের সঠিক সমাধান জানালে খুশি হব।

সমাধানঃ হাদীস ও ফিক্বাহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে একথা প্রতীয়মান হয় যে, দুই হাতে মুসাফাহা করা সুন্নাত। সুতরাং দুই হাতে মুসাফাহা করা সুন্নাত নয়, এ কথা সঠিক নয়। (আদ্দুররুল মুখতার-৯/৫৪৮, উমদাতুল ক্বারী-২২/২৫৩)।

 

গাউছুল আজম বা মুজাদ্দিদ সংক্রান্ত

(৮০৫২) মুহাম্মদ সেকান্দর আলম, আধার মানিক, রাউজান, চট্টগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ  আমরা কিছু দিন পূর্ব থেকে শুনে আসছি যে, প্রতি যুগে যুগে নাকি এক একজন যামানার গাউছুল আজম এসে থাকে। এই কথাটি সত্যি কিনা? তাকে চেনার আলামত কী? কেউ যদি নিজেকে নিজে গাউছুল আজম দাবী করে অথবা তার সন্তান সন্তানাদি দাবী করে, আমার পিতা যামানার গাউছুল আযম ছিলেন; এ ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী? এবং আমাদের করণীয় কী?

সমাধানঃ প্রতি যুগে যুগে এক একজন যামানার গাউছুল আযম এসে থাকে এ কথাটি সত্য নয়। আর কেউ যদি নিজেকে গাউছুল আযম দাবী করে, অথবা তার সন্তানরা তাদের পিতার গাউছুল আযম হওয়ার দাবী করে, তাহলে তা অবাস্তব বলে বিবেচিত হবে। শরীয়তে এ ধরণের গাউছুল আজম আসার কথা কোথাও বলা হয়নি। এ ব্যাপারে মানুষের করণীয় হল, মানুষ এ ধরণের গাউছুল আযম থেকে বেঁচে থাকবে। এবং মুত্ত্বাকী পরহেযগার ও হক্কানী আলেমদের সাথে সম্পর্ক রেখে নিজের ঈমান ও দ্বীনের উন্নতি সাধন করবে। উল্লেখ্য যে, গাউছুল আযম উপাধিতে কাউকে ভূষিত করা আদৌ শরীয়ত সম্মত নয়। তবে হাদীসে প্রত্যেক শতাব্দিতে একজন ‘মুজাদ্দিদ’ আসার কথা বলা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা.) থেকে একথা জানি, তিনি বলেছেন, আল্লাহ্ তাআলা এই উম্মতের (কল্যাণের) জন্য প্রত্যেক শতাব্দী শেষে এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন। যিনি তাদের দ্বীনকে তাজদীদ করবেন। (আবু দাউদ শরীফ)।

তাজদীদ শব্দের অর্থ হল কোন জিনিসকে নতুন করা। যিনি এরূপ কাজ করেন তাকে মুজাদ্দেদ বলে। দ্বীনকে নতুন করার অর্থ হল, দ্বীনে যে সকল কুসংস্কার ও বিদআত প্রবেশ করবে, তা থেকে দ্বীনকে মুক্ত করবেন। অর্থাৎ- কুরআন-হাদীসের সাথে মানুষকে পাবন্দ করার চেষ্ট করবেন, সুন্নাতের প্রচার প্রসার করবেন, ইলমের ব্যাপক প্রচার করবেন ইত্যাদি। তবে মুজাদ্দেদ একজন হবেন, না একাধিক ব্যক্তি হবেন, এ বিষয়টি নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য আছে। কারো মতে মুজাদ্দেদ একজনই হন। আবার কারো মত হল, মুজাদ্দেদ হক্কানী আলেমদের একটি জামাত হয়ে থাকে। আর উক্ত জামাতের প্রত্যেক ব্যক্তিই দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় সংস্কার করে থাকেন। (মিশকাত শরীফ-১/৩২, আবু দাউদ-৫/১০৩, মাহ্্মুদিয়্যাহ্- ৬/২৫৪-২৫৬ পৃষ্ঠা)।

 

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’ প্রসঙ্গে

(৮০৫৩) মুহাম্মদ বায়েজিদ হোসেন, কোটালিপাড়া, গোপালগঞ্জ।

জিজ্ঞাসাঃ গত মাসের মাসিক মুঈনুল ইসলামে একটি প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রশ্ন নম্বর (৬৭৬৪) প্রশ্নকারী আব্দুল মুতাআলী মোমেনশাহী। তার প্রশ্ন ছিল- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এটা হাদীস কিনা? উত্তরে বলা হয়েছে- এটি একটি হাদীসের অংশ। আর সেটা হল- (আত্তুহুরু শাতরুল ঈমান) অর্থ- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। কিন্তু আমি জানি, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। এখন আমার প্রশ্ন হল, যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ হয়, তাহলে  মনে করুন আমার একটি জামা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সেটা গায়ে দেয়ার পরে আমার ছোট ভাই সেই জামায় প্রস্রাব করল। এখন আমার জামা অপবিত্র হয়ে গেল। পক্ষান্তরে আরেকটি জামা সেটা পবিত্র কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। এখন জানতে ইচ্ছুক, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, নাকি পবিত্রতার মধ্যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দাখিল।

সমাধানঃ উক্ত হাদীসের অংশটির কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। তার মধ্য থেকে এখানে দু’টি ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হল-

(১) হাদীসের প্রথম শব্দ হচ্ছে ত্বহুর, আর ত্বহুর শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন করা, পবিত্রতা অর্জন দুই ভাবে করা যায়। এক অযু, দুই গোসল। হাদীসের দ্বিতীয় শব্দ হচ্ছে (শাত্রুন) তার অর্থ হচ্ছে অর্ধেক। এবং হাদীসের তৃতীয় শব্দ হচ্ছে ঈমান। এখন হাদীসের পুরো অর্থ হচ্ছে অযু বা গোসল ঈমানের অর্ধেক। কেননা ঈমান গুনাহে কবিরা এবং ছগিরা উভয়টাকে মিটিয়ে দেয়, পক্ষান্তরে অযু শুধু মাত্র গুনাহে ছগিরাকে মিটিয়ে দেয়, এদিকে লক্ষ্য করে অযুকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে।

(২) কোন কোন মুহাদ্দিসগণ উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা এরূপ করেন যে, এখানে ঈমান থেকে উদ্দেশ্য ঈমানের হাক্বিক্বত। আর ঈমানের হাকিকত হচ্ছে, অন্তরকে শিরক থেকে পবিত্রতা করা। এবং ‘ত্বহুর’ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে অঙ্গসূমহকে নাপাক থেকে পবিত্র করা। উল্লিখিত ব্যাখ্যা দ্বারা একথা পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে, পবিত্রতা অর্জন করা ঈমানের একটি অংশ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা উল্লিখিত হাদীসের আলোকে ঈমানের অংশ নয়। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাও দ্বীনের কাম্য। কেননা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অন্যান্য হাদীসের তাকিদ এসেছে। সুতরাং একথা বুঝা গেল, পবিত্রতা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দুইটি পৃথক পৃথক বিষয় এবং দুইটিই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং একটি অপরটির মধ্যে দাখিল নয়। (মিরকাত-২/৫১৬, মিশকাত-২/৩৮৫)।

 

‘হাজী সাহেব’ বলে সম্বোধন প্রসঙ্গে

(৮০৫৪) হাফেজ আহমদ আলী, বাবুুরহাট, সদর, নরসিংদী।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) কারো হজ্ব করার মত কোন মাল-সম্পদ নাই। তার উপর হজ্ব ফরযও হয়নি। ভিটা বাড়ী বিক্রি করে ঐ লোক সৌদী আরব গেছেন চাকুরীর উদ্দেশ্যে। ঐ লোক ২ বছর থেকে আবার বাংলাদেশে একেবারে চলে এসেছেন। এসে বলছেন যে, আমি বড় হজ্ব পালন করে আসছি। এখন ঐ লোককে হাজী সাহেব বলা যাবে কি?

(খ) ছেলে সন্তান জন্ম হলে দু’টি ছাগল আক্বিকা দিতে হয়, মেয়ে সন্তান হলে একটি দিতে হয়। ছাগলের পরিবর্তে খাশী দিলে আক্বিকা আদায় হবে কি? আক্বিকার গোশত কিভাবে খরচ করবে?

(গ) দাড়ি ছাঁটা লোকের পিছনে নামায হবে কি?

সমাধানঃ (ক) উক্ত ব্যক্তি যদি বাস্তবেই হজ্ব পালন করে এসে বলে, আমি হজ্ব পালন করে এসেছি, তাহলে তাকে হাজী সাহেব বলার ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া কোন সামর্থ্যহীন ব্যক্তি যে কোন ভাবে মক্কায় যাওয়ার পর যদি হজ্বের মাস শুরু হয়ে যায়, আর ঐ ব্যক্তির নিজস্ব এমন কিছু টাকা রয়েছে, যা পরিবারের জন্য খরচ করে হজ্বের দিন পর্যন্ত অবস্থান করা সম্ভব হয়, তাহলে তার উপর হজ্ব ফরয হয়ে যায়।

(খ) ছেলে সন্তান জন্ম হলে দু’টি ছাগল এবং মেয়ে হলে একটি ছাগল আক্বিকা করা মুস্তাহাব। তবে ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সামর্থ্য না থাকলে একটি ছাগল দ্বারা আক্বিকা করলেও আক্বিকা আদায় হয়ে যাবে। এবং আক্বিকার ক্ষেত্রে নর, মাদী এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। দু’টির যে কোনটি দ্বারাই আক্বিকা আদায় হয়ে যাবে। আক্বিকার গোশতের বিধান কুরবানীর গোশতের বিধানের মত। অর্থাৎ- কুরবানীর গোশত যে রকম নিজে খেতে পারে, আত্মীয়-স্বজনসহ অন্যান্যকে দিতে পারে, অনুরূপভাবে আক্বিকার গোশত নিজে খেতে পারবে, আত্মীয় স্বজনসহ অন্যান্যদেরকেও দিতে পারবে।

(গ) শরীয়তের দৃষ্টিতে দাড়ি রাখা ওয়াজিব। যাদের দাড়ি লম্বা হয়, তাদের দাড়ির তিন দিকেই এক মুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব। যদি কোন ব্যক্তি দাড়ি ছেঁটে এক মুষ্টির কম করে রাখে, তাহলে সে ব্যক্তি ফাসিক বলে গণ্য হবে। আর শরীয়তের দৃষ্টিতে ফাসিক ব্যক্তির ইমামতি মাকরূহে তাহরীমী। তাই তার পিছনে নামায পড়াও মাকরূহে তাহরীমী। (রদ্দুল মুহতার-৩/৪৫৫, ৩/৪৫৯, মিশকাত শরীফ-৩৬২, ৩৬৩, মিরকাত-৭/৭৪৮, ত্বাহত্ববি আলাল মারাক্বি-৩৪৪)।

 

জানাযার নামায প্রসঙ্গে

(৮০৫৫) আল-মুজাহিদ কবি মুহাম্মদ আব্দুল গনি খান, বাউকাঠী, ঝালকাঠী।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) জানাযার নামাযে ইমাম সাহেব তিন তাকবীর দিয়ে ডান দিকে সালাম ফিরিয়েছেন। তখন পিছন থেকে অনেক মুক্তাদী আল্লাহু আকবার তাকবীর বলে লোকমা দিয়েছেন। তা শুনে ইমাম সাহেব চতুর্থ তাকবীর দিয়ে তারপর উভয় দিকে সালাম ফিরিয়েছেন। এখন এতে কি জানাযা হয়েছে?

(খ) জনৈকা মহিলা বৃদ্ধা হয়ে মারা গেছে। জীবনে কোন দিন নামায পড়েনি, এমনকি নামায শিখেওনি। নামাযের কাফ্ফারা আদায় করতে হলে বয়স্কা (সাবালিগা) হওয়ার পর থেকে বাকী সব জীবনের কাফফারা আদায় করতে হবে কি? না এতে কোন ছাড় আছে?  কিভাবে কাফ্ফারা আদায় করতে হবে?

সমাধানঃ (ক) কুরআন-হাদীস ও ফিক্বাহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নোল্লিখিত অবস্থায় জানাযার নামাযের মধ্যে যদি ইমাম সাহেব তিন তাকবীর বলার পর ডান দিকে সালাম ফিরিয়ে ফেলে, এমতাবস্থায় মুক্তাদীগণ পিছন থেকে তাকবীর বলে, যদ্বারা ইমাম সাহেবও তাদের সঙ্গে তাকবীর বলে সালাম ফিরান, তাহলে এতে করে নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে।

(খ) যদি কোন ব্যক্তি তার জীবনে কোন নামাযই আদায় না করে থাকেন, আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে যায়, তাহলে উক্ত ব্যক্তির সাবালেগ হওয়ার পর থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সকল নামযের কাফ্ফারা আদায় করে দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যদি মাল সম্পদ রেখে যায় ও অছিয়ত করে যায়, তাহলে তার মালের এক তৃতীয়াংশ থেকে যত দূর সম্ভব আদায় করে দিবে। আর যদি এর দ্বারা পুরো জীবনের নামাযের কাফ্ফারা আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে ওয়ারিশদের মাল থেকে বাকী কাফ্ফারা আদায় করা জরুরী নয়। হ্যাঁ যদি আদায় করে দেয়, হয়তো আল্লাহ্ মাফ করে দিতে পারেন। (ফাত্ওয়ায়ে হিন্দিয়্যা-১/১৬৫, আর্দ্দুরুল মুখতার-২/৫৩৩ পৃষ্ঠা)।

 

রান্নার চুলার জ্বালানী কাজে গোবর ব্যবহার প্রসঙ্গে

(৮০৫৬) আলহাজ্ব মুহাম্মদ মুক্তার হোসেন, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের দেশের কিছু আলেম বলেন, গোবর দ্বারা রান্না করলে নাকি ভাত তরকারী খাওয়া নিষেধ বা খাওয়া যায় না। আবার যদিও খাওয়া যায়, খেলে নাকি ইবাদত বন্দেগী আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। কথাটি কতটুকু সত্য?

সমাধানঃ গোবর কিংবা গোবর থেকে উৎপন্ন গ্যাস দিয়ে খানা পাকালে খানায় কোন সমস্য হয় না। খানা পবিত্র থাকে এবং খাওয়া হালাল থাকে। কেননা, গোবর পুড়ে যখন আগুন জ্বলে তখন আপন অবস্থা বহাল থাকে না। আর আগুনে এমন কোন নাপাকীর সঞ্চারও হয় না যে, ভাত খাওয়া নিষেধ হবে। যারা নিষেধ বলে থাকেন, তারা হয়ত গোবর পুড়া ছাই উড়ে খাবারে পড়তে পারে; এ ভয়ে নিষেধ করেন। এটাও ঠিক নয়। পোড়া ছাই পাক। তাতে খানায় সমস্যা হবে না এবং ইবাদতও নষ্ট হবে না। তাছাড়া মদীনাবাসীগণও গোবরের লাঠিকে লাকড়ী হিসেবে ব্যবহার করত। (তানবিরুল আবসার আলা-র্দুরুল মুখতার-১/৫৩৩-৫৩৪, ১/৫২০, বাহরুর রায়েক-৯/৩৬৫, বাদায়েউস সানায়ে-১/১৯৭, ফাত্ওয়ায়ে মাহমুদিয়া-২৭/২৫৩)।

 

তারাবীহ্’র ইমামতিতে বিনিময় গ্রহণ, জমি বন্ধক এবং মসজিদের তহবিল থেকে ধার দেওয়া প্রসঙ্গে

(৮০৫৭) মুহাম্মদ বজলুর রহমান ইবনে মকবুল হোসাইন ভূঁইয়া, মির্জাপুর, টাংগাইল।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আমরা দেখে আসছি ও ওলামায়ে কেরামগণও বলছেন এবং বাস্তবায়ন হয়ে আসছে যে, পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায এবং জুমআর নামাযের ইমামতির বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা বেতন বা হাদিয়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয। পক্ষান্তরে তারাবীহ্ নামাযের ইমামতির বিনিময়ে পরিশ্রমিক/হাদিয়া/বেতন দেওয়া নেওয়াকে ওলামায়ে কেরাম নাজায়েয বা হারাম বলেছেন। বিষয়টি আমাদের নিকট অস্পষ্ট এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায জুমআর নামায এবং তারাবীহর নামায সবটাতেই তো পবিত্র কুরআন শরীফ পড়া হয়। তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয এবং জুমআর নামাযের ইমামতির বিনিময়ে হাদিয়া বা বেতন দেওয়া নেওয়া জায়েয। পক্ষান্তরে তারাবীহ্’র ইমামতির বিনিময়ে হাদিয়া বা বেতন দেওয়া নেওয়া নাজায়েয বা হারাম কেন?

(খ) আমাদের এলাকায় জমি বন্ধক রাখার প্রচলন রয়েছে। জমির মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ঐ টাকা ফেরত দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জমিটি অর্থদাতা ভোগ করে থাকে। এবং যারা দ্বীনদার বলে পরিচিত, তারা প্রতি বছর জমির মালিককে জমির খাজনা বা ৪-৫ শত টাকা নগদ দিয়ে থাকে, অথবা বন্ধকী টাকা থেকে তা কর্তন করে দেয়। জমি লাভে বা বন্ধক রাখার উক্ত পদ্ধতিটি শরীয়ত সম্মত কি না? যদি না হয়, তাহলে জমি বন্ধকের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি কী?

(গ) আমাদের গ্রামে একটি হিফ্য মাদ্রাসা রয়েছে। উক্ত মাদ্রাসার সাধারণ তহবিলে টাকার সাথে গোরাবা তহবিলের এবং মসজিদের তহবিলের টাকা ধার নিয়ে মাদ্রাসা কমিটির কর্মকর্তাবৃন্দ উক্ত পদ্ধতিতে কিছু ফসলী জমি লাভে বন্ধক রেখেছেন। এবং উক্ত জমির ফসল বিক্রি করে তা দ্বারা মাদ্রাসার উন্নয়ন এবং উস্তাদগণের বেতন দিচ্ছেন। উল্লেখ্য যে, মাদ্রাসার উস্তাদগণও বিষয়টি জানেন। বিষয়টি আমাদের নিকট খটকা লাগছে এবং এর শরীয়ত সম্মত ফায়সালা কী?

সমাধানঃ কুরআন-হাদীস ও ফিক্বহে হানাফীর আলোকে আপনার প্রশ্নত্রয়ের পর্যায়ক্রমে সমাধান নিম্নরূপ-

(ক) তারাবীহ’র নামাযের ইমামতি করে টাকা/পারিশ্রমিক প্রদান ও গ্রহণ নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি ঢালাওভাবে নয়। বরং জমহুর তথা বিশাল সংখ্যক উলামা ও ফুক্বাহায়ে কেরামের অভিমত হলো, সূরা তারাবিহ পড়িয়ে ইমামতির পরিশ্রমিক প্রদান ও গ্রহণ হালাল ও বৈধ। তবে কুরআন খতমের মাধ্যমে ইমামতি করে পারিশ্রমিক প্রদান ও গ্রহণ বৈধ নয়। আর এ অবৈধতা কিন্তু ইমামতির কারণে নয়, বরং তিলাওয়াতের মুজাররাদা তথা শুধু কুরআন শোনানোর চুক্তি সন্দেহে নাজায়েয। সুতরাং বুঝা গেল, পাঁচ ওয়াক্ত নামায এবং জুমার নামাযের ইমামতির মত তারাবিহ্’র নামাযের ইমামতির জন্য পারিশ্রমিক প্রদান ও গ্রহণ উভয়টি জায়েয। তবে শর্ত হলো, তারাবির নামাযে কুরআন খতমের আবশ্যকতা না থাকতে হবে। কেননা কুরআন খতমের আবশ্যকতা থাকলে পারিশ্রমিক বা বিনিময়টা ইমামতির উপর আবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে তিলাওয়াতে মুজাররাদা তথা কুরআন শোনানোর উপরও আবর্তিত হয়, যা নাজায়েয। উল্লেখ্য, তারাবির নামাযের জামাত সকল উলামা ও ফুক্বাহার ঐক্যমতে দ্বীন ইসলামের নিদর্শন।

আর দ্বীন ইসলামের (শি’আর) তথা নিদর্শন রক্ষা করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। অতএব, কোন ইমামের মাধ্যমে তারাবির জামাত কায়েম করা মুসলমানদের কর্তব্য। মুতাআখখিরীন ফুক্বাহাদের মতে এ জন্য যদি ইমামকে বিনিময় দিতে হয়, তাহলে বিনিময় দিয়ে হলেও জামাত কায়েম করতে হবে। আর ইমামের ইমামতির মাধ্যমে নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য অবশ্যই কুরআনের কিছু অংশ তাকে পড়তেই হবে। ফলে সূরা দিয়ে তারাবিহ্ পড়ালে যদিও তাতে তিলাওয়াত থাকে, কিন্তু তা মুখ্য নয়। বরং এক্ষেত্রে ইমামতিটাই মুখ্য। এজন্য সূরা তারাবিহ্ পড়িয়ে বিনিময় গ্রহণ বৈধ। পক্ষান্তরে ইমামের ইমামতি শুদ্ধ হওয়ার জন্য এবং ইমামতির মাধ্যমে মুকতাদিদের নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য কুরআন খতম আবশ্যক নয়। সুতরাং তারাবিহ্’র নামযে যখন কোন ইমামকে কুরআন খতমের জন্য নিযুক্ত করা হয়, তখন সেখানে দু’টি বিষয় মূখ্য হয়ে যায়। এক- ইমামতি, দুই- তিলাওয়াতে কুরআন। আর পরবর্তী ফুক্বাহায়ে কেরামের ঐক্যমতে ইমামতির বিনিময় বৈধ হলেও তিলাওয়াতে কুরআন এর বিনিময় বৈধ নয়। আর খতমে তারাবির ইমামতি যেহেতু মুখ্য তিলাওয়াতে কুরআনের সাথে আবর্তিত এবং সম্পৃক্ত, তাই খতমে তারাবিহ পড়িয়ে বিনিময় গ্রহণ বৈধ হবে না। কারণ, তখন কুরআন বিক্রি করে আহার যোগানোর গোনাহ হবে।

(খ) প্রশ্নে বর্ণিত বন্ধক পদ্ধতিটি শরীয়ত বিবর্জিত, শরীয়ত এ জাতীয় বন্ধক লেনদেনকে সুদের ভিত্তিতে হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ ঋণদাতা প্রদত্ত ঋণের বিনিময়ে ঋণগ্রহীতা থেকে কোন লাভ বা মুনাফা ভোগ করার নামই সুদ। আর বন্ধক গ্রহীতা যেহেতু প্রদত্ত ঋণের বিনিময়ে বন্ধক দাতার ফসলি সম্পদ ভোগ করছে, তাই তা সুদ ও হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর যেসব বন্ধক গ্রহীতা নামে মাত্র দু’একশ বা পাঁচশ টাকা খাজনা বাবদ পরিশোধ করে, তাদের জন্যও বন্ধক দাতার ফসলি জমিন ভোগ করা হারাম ও নাজায়েয হবে। কারণ, একটা জমির ভাড়া মূল্য স্বাভাবিক ভাবে দু’একশ টাকা হয় না এবং ঐ জমির সমপরিমান অন্য জমিগুলোর ভাড়া সে তুলনায় অনেক বেশি। এমন কি বন্ধক গ্রহীতা ঋণ প্রদান না করলে বন্ধকদাতা তথা ঋণ গ্রহীতা নিজের জমি দু’একশ টাকার বিনিময়ে আদৌ তাকে ভাড়া বা ইজারা দিতো না। সুতরাং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে দু’একশ টাকার বিনিময়ে অধিক টাকার ফসল ভোগ করা সম্পূর্ণ সুদের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, সমাজের মানুষকে এ জাতীয় লেনদেন থেকে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য ও ফরয।

এরপর আপনি জানতে চেয়েছেন জমি বন্ধকের শরীয়তে সম্মত পদ্ধতি কী? হ্যাঁ, বন্ধকের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি হলো ঋণদাতা সম্পূর্ণ সাওয়াবের আশায় আল্লাহ্কে রাজী করার এবং জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত লাভের প্রত্যাশায় সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাধ্যমত ঋণপ্রদান করবে। আর সে ঋণ সময়মত উসূলের নিশ্চয়তার জন্য ঋণ গ্রহীতার জমি বা অন্য কোন বস্তু নিজের কাছে বন্ধক তথা বাঁধা রাখবে। সে জমি বা বস্তু থেকে কোন ধরণের ফায়দা ভোগ করা ব্যতীত।

কিন্তু ঋণদাতা যদি সওয়াবের আশা না করে, বরং মানবতার খাতিরে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ দিতে চায়, আবার ঋণের বিনিময়ে ঋণগ্রহীতার জমি বা অন্য কিছু ভোগ করতে চায়, তাহলে সূদ থেকে বাঁচার জন্য শরীয়ত তাকে একটি পথ বাতলিয়ে দিয়েছে। আর তা হলো, যার ঋণের প্রয়োজন সে ঋণ দাতাকে বলবে (উদাহরণ স্বরূপ) আমি ১০,০০০ দশ হাজার টাকার বিনিময়ে আমার অমুক জমি আপনার নিকট বিক্রি করছি এই শর্তে যে, যখন আমি উক্ত ১০,০০০ দশ হাজার টাকা পরিশোধ করে দেব, তখন আপনি আমার ঐ জমি আমার কাছে ফেরৎ বিক্রি করতে বাধ্য থাকবেন। শরীয়তের পরিভাষায় এ চুক্তিকে (বাই বিল ওয়াফা) তথা ফেরৎ বিক্রয়চুক্তি বলে। সুতরাং এভাবে চুক্তি করলে জমিন রেজিষ্ট্রি করতে হবে না। ঋণদাতা জমির ফসল ভোগ করতে পারবে। এবং ঋণগ্রহীতা পূর্ণ টাকা পরিশোধ করার পর সে ঐ জমি পূণরায় তার নিকট বিক্রয় করতে বাধ্য থাকবে।

(গ) মাদ্রাসার সাধারণ ফান্ডের জন্য মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড থেকে ধার নেয়া, অনুরূপ মাদ্রাসার জন্য মসজিদ তহবিল বা ফান্ড থেকে টাকা ধার নেয়া শরীয়তে জায়েয- যদি মাদ্রাসাটি মসজিদের আওতাভুক্ত হয়। শর্ত হলো, ঐ ধার দেয়া বা নেয়ার মুহূর্তে গরীব ছাত্রদের জন্য গোরাবা তহবিলের টাকার প্রয়োজন না হওয়া। সাথে সাথে ঐ টাকা ফেরৎ পাওয়ারও পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জন্য নাজায়েয পদ্ধতিতে জমি বন্ধক নিয়ে সে জমির ফসল বিক্রি করে মাদ্রাসার উন্নয়ন মূলক কাজে ব্যবহার উস্তাদদের বেতন দেয়া ইত্যাদি কোনটি জায়েয হচ্ছে না। কারণ স্পষ্ট সূদের টাকা। (রদ্দুল মুহতার-৯/৭৬, ৭৭, আল মাওসূআহ-২৬/৯৮, শরহে উকুদ- ৬৬, আর্দ্দুরুল মুখতার-৭/৫৪৫, ফাত্ওয়ায়ে আলমগীরী-২/৪৬৪, ফাত্ওয়ায়ে শামী-৮/১১০)।

 

বিভিন্ন তরীক্বা, পীর-মুরীদ, ইল্লাল্লাহ’র যিকির ও তাবিজ সংক্রান্ত

(৮০৫৮) মুহাম্মদ রেজাউল হক, প্রভাষক- ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ (১) ঢাকার হাতেমবাগ জামে মসজিদের খতীব মুফতি জসীম উদ্দীন সাহেব এক ভাষণে বলেছেন যে, রাসূল (সা.)এর যুগে চিশতিয়া কাদেরিয়া, সাবেরিয়া, ও নকশবন্দিয়া এই তরিকাগুলি বিদ্যমান ছিল না। এগুলো পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে মুসলিম জাতিকে সিরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করতে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এই তরিক্বা অবলম্বনকারী লোকজন সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শয়তানের তরিক্বা অনুসরণ করছে। এসব বক্তব্য কি সত্য?

(২) তিনি আরও বলেন, পীর মুরিদী বাইআত শরীয়তে প্রমাণিত নয়। শরীয়তে বাইআতে রিদওয়ান নামে যুদ্ধের বাইয়াত আছে। কিন্তু পীর-মুরিদী বাইয়াত নেই। এগুলো শিয়াদের সংস্কৃতি থেকে এদেশে এসেছে। সত্য কিনা জানতে চাই?

(৩) তিনি আরও বলেন, শুধু “ইল্লাল্লাহ্”-এর যিকির শরীয়তে নেই। এটি কুরআন ও হাদীস বিবর্জিত। এটি অর্থহীন এবং অপূর্ণাঙ্গ একটি বাক্য। সত্য কিনা জানতে চাই?

(৪) তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার তাবিজ ব্যবহার হাদীসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সত্য কিনা জানতে চাই?

সমাধানঃ (১) রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবা, তাবেয়ী, তাবেতাবিয়ীনের যুগে ছিল না- এমন কাজ যদি দ্বীনের মধ্যে ইবাদত মনে করে অথবা অধিক সাওয়াবের আশায় সংযোজন ও বৃদ্ধি করে, তবে তা বিদআত ও সীরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতকারী কাজ বলে বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে সে তিন যুগের পর আবিষ্কৃত যে সব কাজ, দ্বীনী কোন বিধি-বিধান পূর্ণাঙ্গ পালনে সাহায্যকারী হয়, তা সীরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতকারী নয়। বরং মুস্তাহাব ও উত্তম। যেমন- প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষ প্রতিষ্ঠান। তদ্রুপ চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সাবেরিয়া, নকশবন্দিয়া এ তরীক্বাগুলি যদিও সে তিন যুগে ছিল না। কিন্তু আত্মশুদ্ধি; যা ফরয ও আল্লাহ্ প্রাপ্তির মাধ্যম, যা  প্রত্যেকের জন্য অতীব জরুরী, তার সাহায্যকারীও মাধ্যম। কারণ, মুঈনুদ্দীন চিশতী, আব্দুর কাদের জিলানী, খাজা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ও খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দী (রাহ.) প্রমুখ বুযুর্গগণের এ সকল তরীক্বাসমূহ চালু করার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও পরকালের সফলতা লাভে মানুষকে সাহায্য করা। কাজেই তাদের তরীক্বাসমূহ যারা গ্রহণ করবে, তারা সঠিক পথে আছে। এ তরীকা সমূহকে যারা শয়তানের তরীক্বা বলে, তারা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্টতায় রয়েছে।

(২) যারা বলেন শরীয়তে বাইআত বলতে শুধু যুদ্ধের বাইআত আছে, পীর-মুরীদী বাইআত শিয়াদের সংস্কৃতি থেকে এসেছে শরীয়তে তার প্রমাণ নেই, তাদের একথা নিঃসন্দেহে অজ্ঞতা। কেননা বুখারী ও মুসলিম শরীফে জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)এর কাছে নামাযের গুরুত্ব যাকাত দেয়া এবং প্রত্যেক মুসলমানের মঙ্গলকামনা করার উপর বাইআত হয়েছি। (মিশকাত)। এ হাদীস থেকে নেকী কাজের উপর মুর্শীদে কামেলের কাছে বাইআত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়। তাই তো সমস্ত ওলামা ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, কুরআন হাদীসের পরিপূর্ণ জ্ঞানী ও তদনুযায়ী আমলকারী পীরের কাছে বাইআত গ্রহণ করা মুস্তাহাব, মতান্তরে সুন্নাত।

(৩) যদি “ইল্লাল্লাহ্” এর যিকিরের পূর্বে লা’ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ এর যিকির করে এবং ইল্লাল্লাহ্-এর যিকিরের পরেও তার সাথে মিলিয়ে লা’ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ এর যিকির করে, তবে অবশ্যই জায়েয হবে। এবং প্রতি অক্ষরে দশটি করে নেকী হবে (মাজমাউয যাওয়ায়েদ (তাবরানী)-১০/১০৬)। আর তার আগে পরে না মিলিয়ে প্রথম থেকেই শুধু ইল্লাল্লাহ্ এর যিকির ঠিক নয়। (মিশকাত-২৭, মিরক্বাত-১/৩৬৬, ফাত্ওয়ায়ে রশিদিয়্যা-২২৪, আহসানুল ফাত্ওয়া-১/৫৪৫, ফাত্ওয়ায়ে মাহমুদিয়্যাহ-৬/২৮৪, আশরাফুল ফাত্ওয়ায়-১/৩২২, আহকামুল কুরআন-৫/৫৫)।

(৪) তাবীজ যদি কোন কুফরী, শিরকী কথা দ্বারা হয় বা কোন অবৈধ উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা জায়েয নেই। কুরআন-হাদীসের বাক্যাবলী দ্বারা বৈধ উদ্দেশ্য হলে, তাবীজ ও ঝাড়-ফুঁক করা অবশ্যই জায়েয আছে। যেমন- আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাযি.) তার বাচ্চাদের জন্য তাবীজ লিখে দিয়েছেন। (আবু দাউদ)। হযরত মুজাহিদ (রাহ.) আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে সীরীন (রাহ.) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)এর পুত্র উবায়দুল্লাহ্ ও জাহ্হাক প্রমূখের অন্যদেরকে তাবীজ লিখে দেয়ার কথা, সূতা বাঁধা, তাবীজ হাতে বা গলায় বাঁধা, বৈধ হওয়ার মর্মে তাদের মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে আবি শাইবা, হাদীস নং-২৪০১১-১২ পৃষ্ঠা)।

 

বিজাতিদের শেষ পরিণতি এবং মূর্তি পূজা সম্পর্কে

(৮০৫৯) মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম, দেওয়ান নগর, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) মুসলিম ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান জাতির অবস্থা কি রূপ হবে জানতে চাই।

(খ) হিন্দুরা ১০ হাত ওয়ালা দূর্গা তৈরী করে পূঁজা করেন। এর প্রচলন কীভাবে হল?

সমাধানঃ (ক) কুরআন-হাদীস এবং ফিক্বাহ শাস্ত্রের গ্রহণযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর আনীত দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস রেখে আমল করে, তাকে মুসলিম বা মুসলমান বলে। আর ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের উপর বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কি ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া কোন আমালও গ্রহণ হয় না। কেননা, কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, অর্থাৎ- আল্লাহর নিকট একমাত্র ইসলামই গ্রহণযোগ্য ধর্ম। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা বলেন, অর্থাৎ- যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা কুবুল করা হবে না এবং তারা আখেরাতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত। আর যারা এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস এবং মুহাম্মাদ (সা.) এর আনীত দ্বীনের উপর বিশ্বাস করবে না, তাদের স্থান জাহান্নাম। যেমন- কুরআন পাক থেকে বোঝা যায়, অর্থাৎ- নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তার সাথে শরীক করে। তবে শিরক ব্যতীত অন্য গুনাহ ইচ্ছা করলে মাফ করে দিতে পারেন। আর যে লোক আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করল, সে যেন আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করলো। (সূরা নিসা আয়াত-৪৮)।

(খ) মূর্তি পূজার সূচনাকাল ছিল হযরত আদম ও হযরত নূহ (আ.)এর আমলের মাঝামাঝি সময়। সূরা নূহের ২৩নং আয়াতে পাঁচটি প্রতিমার নাম পাওয়া যায়। প্রকৃত পক্ষে এই পাঁচ জন আল্লাহ্ তায়ালার নেক ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দা ছিলেন। তাদের অনেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল। তাদের ওফাতের পর ভক্তরা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত ও বিধিবিধানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখে। কিছু দিন পর শয়তান তাদেরকে এই বলে প্ররোচিত করল যে, তোমরা যেসব মাহাপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উপাসনা কর। যদি তাদের মূর্তি তৈরী করে সামনে রেখে নাও, তবে তোমাদের উপাসনা পূর্ণতা লাভ করার এবং বিনয় ও একাগ্রতা অর্জিত হবে। তারা শয়তানের ধোঁকা বুঝতে না পেরে মহাপুরুষদের প্রতিকৃতি তৈরী করে উপসনালয়ে স্থাপন করল। এবং তাদের স্মৃতি জাগরিত করে ইবাদতে বিশেষ পুলক অনুভব করতে লাগল। এমতাবস্থায় তাদের সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেল এবং সম্পূর্ণ নতুন এক বংশধর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল। এবার শয়তান এসে তাদেরকে বোঝাল যে, তোমাদের পূর্ব পুরুষদের খোদাও উপাস্য মূর্তিই ছিল। তারা এই মূর্তিগুলোরই উপাসনা করত। এখান থেকে মূর্তি পূজার সূচনা হয়ে গেল। (মাআরিফুল কুরআন (বাংলা)-১৪০৮ পৃষ্ঠা, রূহুল মাআনী-১৫/৮৮ পৃষ্ঠা)।

 

রাফউল ইয়াদাইন সম্পর্কিত

(৮০৬০) আলহাজ্ব মুহাম্মদ মুক্তার হোসেন, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।

জিজ্ঞাসাঃ রাসূল (সা.)এর বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, রাফউল ইয়াদাইন নামাযের মধ্যে করতে হবে। কিন্তু আমরা যারা আবু হানিফা (রহ.)এর অনুসরণ করি, তার রাফয়ে ইয়াদাইন করি না। আসলে আমরা রাসূল (সা.)এর কথা মানবো, না আবু হানিফা (রাহ.)এর কথা মানবো? কোনটা মানলে আমরা মুক্তি প্রাপ্ত দল হিসেবে নাজাত পাবো? আর আপনারা তো আহলে হাদীস ওয়াল জামাতের দাবীদার তাহলে আপনারা কী রফয়ে ইয়াদাইন করেন? বিস্তারিত জানালে আমরা দ্বিধা দ্বন্দ্ব থেকে বাঁচতে পারতাম।

সমাধানঃ মূল সমাধানে যাওয়ার পূর্বে ভূমিকা স্বরূপ কিছু কথা বলে নেয়া দরকার। মুসলমানের জীবনের উন্নতি, অগ্রগতি ও সফলতা নির্ভর করে দ্বীনের উপর চলার মধ্যে। দ্বীন হলো আল্লাহর হুকুম ও রাসূল (সা.)এর তরীকা। অর্থাৎ- কুরআন হাদীস ইজমা কিয়াসের সমন্বয়ই দ্বীন। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, কুরআন বুঝতে আমরা হাদীসের মুহ্তাজ। আর হাদীসকে যথাযথভাবে বুঝতে সাহাবায়ে কেরামের কথা ও কাজের দিকে মুহতাজ। সাহাবায়ে কেরামের কোন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে তাবিঈনের প্রতি নজর করতে হবে। যেহেতু তারা সরাসরি সাহাবায়ে কেরামকে পেয়েছেন। আর তাবিঈন, তাবে তাবেঈনের মধ্যে মাযহাবের ইমামগণ অগ্রগণ্য। আর ইমামগণের মধ্যে ইমাম আবু হানীফা (রাহ.)এর মর্তবা ও মর্যাদা সর্বসম্মতি ক্রমে সর্বাগ্রে। সুতরাং কুরআন হাদীসের কোন ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানীফার কথা অগ্রগণ্য।

এখন কুরআনে যদি এমন কোন আমল/বিষয় পাওয়া যায়, যার বিপরীত আমল তাওয়াতুর সূত্রে হুযূর (সা.) থেকে প্রমাণিত হয়, তো কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, হাদীসের উপর আমলকারী এ ব্যক্তি কুরআনের বিরোধিতা করেছে। কেননা, আয়াতটি মানসুখও হতে পারে। তেমনি নবী (সা.) থেকেও একই বিষয়ে দুই ধরণের উক্তি পাওয়া গেলে বা মৌন সম্মতি পাওয়া গেলে এক্ষেত্রে একটি হাদীসের উপর আমলকারীকে কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, সে হাদীসের বিপরীত আমল করেছে। কেননা দু’টোই শুদ্ধ হতে পারে। মূল কথা হলো, চার মাযহাবের ইমামগণ পরবর্তী বর্ণিত বিপরীত সমস্যাকে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসের সমন্বয়ে উম্মতের সহজতার জন্য সুবিন্যস্তভাবে পেশ করেছেন। তা না হলে সমস্ত হাদীসের কিতাব অনুসন্ধান করে শুধু দুই রাকাত নামায কিভাবে পড়তে হয় তা বের করাও এই যুগের মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই ইমামগণের কথা কোন নতুন শরীয়ত নয়। তাদের কথা মানা, মানে কুরআন হাদীসের কথা মানা। কেননা, তারা কুরআন হাদীস বুঝে, তার মর্মার্থ ও সারাংশ সুস্পষ্ট ভাবে আমাদের সামনে পেশ করেছেন। বস্তুতঃ তাদের কথা না মানলে কুরআন হাদীসও মানা হয় না। কেননা, এ যুগে এমন কোন মানুষ নেই, যিনি কুরআন হাদীস থেকে সমস্ত মাসআলা বের করে, পরস্পর বিরোধপূর্ণ হাদীস ও আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বিধান করে আমল করতে পারেন। তাছাড়া এ যুগে এক লক্ষ হাদীসও সনদসহ মুখস্ত বলতে পারেন, এমন ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বিরল। অথচ মাযহাবের ইমামগণ লক্ষ লক্ষ হাদীস সনদসহ মুখস্ত বলতে পারতেন।

যাহোক, এখন মূল জওয়াবের দিকে যাচ্ছি। মূলতঃ রাফয়ে ইয়াদাইনের বিষয়টি সাহাবা যুগ থেকে বিরোধপূর্ণ, তবে তা নামায হওয়া না হওয়া নিয়ে নয়, বরং উত্তম অনুত্তম নিয়ে। সাহাবা যুগেও কোন সাহাবা রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন এবং কোন সাহাবা করতেন না। তবে তারা একে অপরকে খারাপ মনে করতেন না। কিন্তু এ যুগে মানুষ স্বীয় প্রবৃত্তির পেছনে পড়ে একে অপরকে ঘৃণা করে থাকে। পরস্পরের মধ্যে ফাটল ও দ্বন্ধ সৃষ্টি করে।

আর এবিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা এবং যারা রাফয়ে ইয়াদাইন করে না, তাদেরকে আপত্তি ও সমালোচনার নিশানা বানানো প্রকারান্তরে সাহাবীদেরই নিন্দা ও সমালোচনা করার শামিল। কেননা, সাহাবাদের মধ্যে এ আমল ছিল। বলাবাহুল্য, এ শ্রেণীর মানুষ সাহাবায়ে কেরামের নীতি ও পথ থেকে বিচ্যুত।

এখন হাদীসের আলোকে আমরা প্রমাণ করব যে, রুকুতে যাওয়ার সময়, উঠার সময় ও ৩য় রাকাতে দাঁড়িয়ে রাফয়ে ইয়াদাইন না করাই গ্রহণযোগ্য। আর সাহাবায়ে কেরাম ও সলফে সালিহীনের কর্মধারাও তাই ছিল। তাই শুরু ব্যতীত অন্যান্য সময় রাফয়ে ইয়াদাইন না করা চাই। যা হানাফী মাযাহাবের মুকাল্লিদগণের জন্য অবশ্যই অনুসরণীয়। আর তারা অন্য মাযহাবের অনুসরণ করবে না।

প্রথম দলীলঃ নবীজী (সা.)এর নামাযঃ অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.) বলেন, আমি কি তোমাদের নিয়ে রাসূল (সা.)এর নামাযের মত নামায আদায় করব না? এর পর তিনি নামায পড়লেন এবং শুধু নামাযের শুরুতে রাফয়ে ইয়াদাইন করলেন। (জামে তিরমিযী-১/৫৯)। এ হাদীস থেকে বুঝা গেল যে, রাসূল (সা.) শুধু নামাযের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইন করতেন। এর পর আর করতেন না।

দ্বিতীয় দলীলঃ রাফয়ে ইয়াদাইন সম্পর্কে হাদীসের বারণঃ হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাযি.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছে তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, অর্থাৎ- কি ব্যাপার আমি তোমাদের হাত উঠাতে কেন দেখি, যেন তা বেয়াড়া ঘোড়ার ঊর্ধ্বে উত্থিত লেজ সদৃশ। তোমরা নামাযে স্থির থাকবে। (সহীহ মুসলিম-১/১৮১)।

তৃতীয় দলীলঃ হযরত উমর (রাযি.)এর আমলঃ আসওয়াদ (রাহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, অর্থাৎ- আমি হযরত উমর (রাযি.)কে দেখেছি। তিনি শুধু প্রথম তাকবীরের সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন, পরে করতেন না। ইমাম ত্বাহাভী (রাহ.) বলেন, হযরত উমর (রাযি.)এর আমল এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)এর কোনরূপ বিরোধিতা না থাকাই প্রমাণ করে যে, এটিই সঠিক পদ্ধতি এবং এ পদ্ধতির বিরোধিতা করা কারো জন্যে উচিত নয়।

চতুর্থ দলীলঃ হযরত আলী (রাযি.)এর আমলঃ হযরত আসিম ইবনে কুলাইব (রাহ.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, অর্থাৎ- হযরত আলী (রাযি.) নামাযে প্রথম তাকবীরে হাত উঠাতেন, এরপর আর হাত উঠাতেন না। এভাবে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাযি.), আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.)সহ খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল এভাবেই চলে আসছে, যা স্থানাভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।

পঞ্চম দলীলঃ সাহাবায়ে কেরামের কর্মধারাঃ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.)এর (রাফয়ে ইয়াদাইন না করা সংক্রান্ত) হাদীস হাসান পর্যায়ে উত্তীর্ণ এবং অনেক আহলে ইলম, সাহাবা, তাবিঈন এই মত পোষণ করতেন। ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহ.) ও কুফাবাসী ফকীহগণ এই ফাত্ওয়া দিয়েছেন। (জামে তিরমিযী-১/৫৯ পৃষ্ঠা)।

ষষ্ঠ দলীলঃ হযরত ইবরাহীম নাখয়ী (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ- নামাযের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইন করার পর অন্য কোথাও রাফয়ে ইয়াদাইন করো না। (জামিউল মাসানীদ-১/৪৩৫, মাকতাবায়ে হানাফিয়্যা)।

এছাড়াও আরো প্রমাণাদি রয়েছে। তবে আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে উল্লেখ করছি না। উপরোক্ত প্রমাণাদির আলোকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, নামাযের শুরু ব্যতীত অন্যান্য স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করা যাবে না। এটাই হাদীসের কথা, যা ইমাম আবু হানীফারও বক্তব্য। আর আপনি যেসব হাদীস থেকে রাফয়ে ইয়াদাইনের বিষয়টি জানতে পেরেছেন, হাদীসসমূহ মূলতঃ ইসলামের প্রাথমিক যুগের। আমরা যে সব হাদীস পেশ করেছি, সেগুলো পরের এবং শক্তিশালী। যা দ্বারা হুযূর (সা.) ও সাহাবীগণের সর্বশেষ আমল নামাযের ক্ষেত্রে শুরু ব্যতীত অন্য সময় রাফয়ে ইয়াদাইন না করা প্রমাণিত হয়।

এছাড়াও ফিক্বাহ শাস্ত্রে হাদীসগুলোর বিভিন্ন জাওয়াব দেয়া হয়েছে। যেমন- নছবুর রায়া গ্রন্থে আল্লামা জামালুদ্দীন আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ বিন ইউসুফ যাইলাঈ হানাফী (রাহ.) সালাত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে দু’একটি জাওয়াব উল্লেখ করছি।

(ক) বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইবনে উমর (রাযি.)এর যে হাদীসটি রফয়ে ইয়াদাইনের ব্যাপারে রয়েছে, তার বিপরীত হাদীসও তাঁর আমলের ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে। হাদীসটি মানছুখ হওয়ার কথাও রয়েছে।

(খ) বুখারী শরীফে বর্ণিত মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আতার হাদীসটির ব্যাপারে ইমাম ত্বাহাভী (রাহ.) শরহুল আছার কিতাবে আপত্তি উত্থাপন করেছেন।

(গ) মুসলিম শরীফে বর্ণিত ওয়ায়েল বিন হাজর এর হাদীসটিও বিরোধপূর্ণ। কেননা, তা ইবনে মাসঊদ এর হাদীসের বিপরীত। অথচ ইবনে মাসঊদ (রাযি.) ওয়ায়েল (রাযি.) থেকেও অধিক বুঝবান ও নবীর সুহবতপ্রাপ্ত। এভাবে সব হাদীসের জওয়াব রয়েছে। (নছবুর রায়া-১/৪০৭-৪১৭ পৃষ্ঠা)।

 


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি