তাফসীরে কালামুল্লাহ

 

।। হযরত মাওলানা মুফতী জসিমুদ্দীন ।।

মানুষ নিজ ভাল-মন্দ আমলের ফলাফলই ভোগ করবে

مَّنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدي لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ط وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ط وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً

অনুবাদঃ যে কেউ সৎ পথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎ পথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথ ভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৫ আয়াত)।

ব্যখ্যাঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগের আয়াতে বান্দার আমলনামা এবং হিসাব-কিতাব সম্পর্কে ইরশাদ করেছিলেন যে, বান্দা নিজেই তার হিসাবের জন্য যথেষ্ট হবে। এখানে আল্লাহ রব্বুর আলামীন পরিষ্কারভাবে ইরশাদ করছেন এবং জানিয়ে দিচ্ছেন যে, যেই ব্যক্তি হিদায়াতের উপর চলবে, সত্যের পথে অগ্রসর হবে এবং নববী আদর্শের অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে তার উত্তম প্রতিদান পাবে। আর যেই ব্যক্তি হঠকারিতা করবে, সত্যের পথ থেকে সরে যাবে, গোমরাহীর পথে চলবে, সে নিজেই তার জন্য দায়ী এবং তার কুফল সেই ভোগ করবে। তার পাপের বোঝা না অন্য কাউকে দেওয়া হবে, আর না তার উপর অন্যের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে। বরং প্রত্যেকে আপন আপন কর্মের ফল ভোগ করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব থেকে বড় ন্যায়বিচারক বাদশাহ এবং তিনি কারো উপর জুলুম করেন না, তার জন্য এ আয়াতই যথেষ্ট। যেখানে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করছেন,“লা তাযিরু ওয়াযিরাতুন-বিযরা উখরা” অর্থাৎ- ‘একজন অন্যজনের বোঝা বহন করবে না (প্রত্যেককে তার প্রাপ্যটুকুই দেওয়া হবে)’।

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন, যার অর্থ- “যে যাররা পরিমাণ ভাল আমল করবে, তাও সে দেখতে পাবে। আর যে যাররা পরিমাণ খারাপ আমল করবে, তাও সে দেখতে পাবে”।

এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, এক আয়াতের মধ্যে ইরশাদ হয়েছে, “ওয়া লা-ইয়াহমিলুন্না আছক্বালাহুম ওয়া আছক্বালাম মা’আ আছক্বালিহিম”। অর্থাৎ- কাফিরদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, ‘তারা তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে এবং সাথে সাথে ঐ সমস্ত লোকদের (যাদেরকে তারা পথভ্রষ্ট করেছে তাদের) পাপের বোঝাও বহন করবে’।

এখানে উভয় আয়াতের মাঝে কোন বিরোধ নেই। কারণ, কাফেরদেরকে যে অন্যের বোঝা বহন করার কাথা বলা হচ্ছে, তা মূলতঃ অন্যের পাপের বোঝা নয়, বরং তাদেরই কৃতকর্মের ফল। কেননা একটা বোঝা তো হল তাদের নিজেদের আমল, যা সে নিজে করেছে। আর অপরটি হল যে, সে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তার বোঝা। আর সেখানে যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদের বোঝা থেকে কোন কিছু কম করা হবে না। বরং তাদেরকে তাদের কর্মের পরিপূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কত বড় দয়ালু এবং ন্যয়বিচারক বাদশাহ! এত কিছুর পরও আরো এক ধাপ এগিয়ে ইরশাদ করেছেন, “ওয়া মা কুন্না মু’আযযীবীনা হাত্তা নাব’আছা রাসূলা”। অর্থাৎ- কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না’। যা কিনা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ন্যায়ের এবং ইনসাফের কথা যে, কাউকে শাস্তি প্রদান করার পূর্বে তাকে অবিহিত করে দেওয়া হয়, তাকে সাবধান করে দেওয়া হয় যে, এ কাজ না করলে শাস্তি পেতে হবে। সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, রাসূল পাঠিয়ে তাদের ব্যাপারে পাকা-পোক্ত দলীল বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেন কেউ এ কথার দাবী না করতে পারে যে, আমি এ বিষয়ে অজ্ঞ বা বেখবর ছিলাম।

বিখ্যাত তাফসীরবিদ আল্লামা ইবনে কাছীর (রাহ.) এই আয়াতের ব্যখ্যায় একটি বিষয়/মাসআলা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যার সারসংক্ষেপ হল-

মানুষের ঐ সমস্ত বাচ্চা যারা ছোট থাকতেই মারা যায় এবং তাদের পিতা-মাতা কাফের, তাদের হুকুম কি? অনুরূপ পাগল, বধীর (যে কানে শোনে না), বার্ধক্যের দরূন যার বুদ্ধিমত্তা লোপ পেয়েছে এবং যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, তার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলো না, তাদের হুকুম কি? তারা জান্নাতে যাবে, না জাহান্নামে? এ ব্যাপারে উলামায়ে উম্মতের তিনটি মত রয়েছে, যার প্রত্যেকটির মূলে রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীস। যেগুলোর কিছু দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা জাহান্নামে যাবে, কিছু দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা জান্নাতে যাবে এবং কিছু দ্বারা বুঝা যায় যে, তাদের ব্যাপার আল্লাহ তায়ালা যা চান ফায়সালা করবেন।

উলামায়ে কেরামের মতামতগুলো হল-

এক. তারা জান্নাতী। এর দলীল হিসেবে হযরত সামুরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত হাদীস পেশ করা হয়। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক বাচ্চা ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে (অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করার যোগ্যতা নিয়ে দুনিয়াতে আসে)। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন! হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কাফের-মুশরিকদের সন্তানরাও? (অর্থাৎ তারাও কি ইসলামের যোগ্যতার উপর জন্ম গ্রহণ করে?) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেলেন, ‘(হ্যাঁ) কাফের-মুশরিকদের সন্তানরাও (সেই যোগ্যতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে)’।

অন্য এক রেওয়াতে এসেছে, হযরত সামুরা (রাযি.) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কাফের-মুশরিকদের সন্তানদের ব্যপারে প্রশ্ন করলাম (যে তাদের হাশর কি হবে), রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ‘তারা জান্নাতীদের খাদেম হবে’।

দুই. তারা তাদের পিতা-মাতার সাথে জাহান্নামে যাবে। দলীল হল- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবি কাইস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার আম্মাজান হযরত আয়েশা (রাযি.)এর নিকট আসলাম এবং কাফেরদের সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম (যে তারা জান্নাতী না জাহান্নামী)। তিনি বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তারা তাদের পিতা-মাতার সঙ্গী হবে (অর্থৎ- তারা তাদের সাথে জাহান্নামে যাবে)। (হযরত আয়েশা আরজ করলেন) হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! কোন আমল ছাড়াই (তারা জাহান্নামে যাবে)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন “আল্লাহ তায়ালাই তাদের ভবিষ্যৎ কর্ম সম্পর্কে ভাল জানেন”।

তিন. তৃতীয় মত হল যে তারা জান্নাতে যাবে, না জাহান্নামে যাবে, তা কেবল মাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন। এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা যাবে না। কেনান, বুখারী শরীফ এবং মুসলিম শরীফের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফের-মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন, “ আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন তারা (যদি বেচে থাকত তাহলে) কি আমল করত”। অর্থাৎ- তারা কি ইসলাম কবুল করে ভাগ্যবান হত না কুফুরের উপরই জীবনটা মিটিয়ে দিত, তা তো আল্লাহ তায়ালার ইলমের মধ্যে রয়েছেই। সুতরাং সেই অনুপাতে তাকে বদলা দেওয়া হবে।

উক্ত মতগুলোর মধ্যে আল্লামা ইবনে কাছীর (রাহ.) তৃতীয় মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রাহ.)এরও মত। উল্লেখ্য যে, এই মতবিরোধ কেবলমাত্র কাফের-মুশরিকদের সন্তানদের ব্যাপারে। মুসলমানদের সন্তানদের ব্যাপারে কোন মতবিরোধ নেই। তাদের ব্যাপারে সকলেই একমত যে, তার জান্নাতী।

যেহেতু এই বিষয়টি অনেক জটিল এবং এর জন্য অনেক দালীল-আদিল্লার প্রয়োজন, তাই অনেক উলামায়ে কেরাম এ বিষয় নিয়ে বাক-বিতন্ডা করাটা অপছন্দ করেন।

শিক্ষাঃ এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হল যে, মানুষ যা কিছু করে তা সে নিজের জন্যই করে। অর্থাৎ- কেউ যদি ভাল পথে চলে তাহলে তার এই ভাল পথে চলাটা তার জন্য কল্যাণের কারণ হবে। আর কেউ যদি মন্দ পথে চলে, তাহলে তার এই মন্দ পথে চলাটা তার জন্যই ক্ষতির  কারণ হবে। যা কিছু মানুষ আমল করবে তাই তাকে বদলা হিসেবে কিয়ামতের দিন দেওয়া হবে। তাতে বিন্দু পরিমাণও কারো উপর অন্যায় করা হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবী রাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার মনোনীত রাস্তা বলে দিয়েছেন। কোনটা সঠিক কোনটা ভুল, কোনটা হেদায়েতের পথ আর কোনটা গোমরাহীর পথ; তা দেখিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের প্রত্যেককে রাসূলের ত্বরিকার অনুস্বরণ করতে হবে। কেননা, আল্লাহ তায়ালার হুকুমগুলো রাসূলের ত্বরিকা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করার নাম হল দ্বীন। তাই রাসূলুল্লাহ(সা.)এর ত্বরিকা অনুস্বরণ করে নিজের ঈমান-আমলকে বেশি থেকে বেশি সুন্দর ও পরিমার্জিত করতে হবে। যাতে করে কিয়ামতের দিবসে উত্তম বদলা পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তার মর্জি মোতাবেক তাঁর রাসূলের ত্বরিকা অনুস্বরণ করে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন!

লেখকঃ  উস্তাযুল ফিক্বহ ওয়াল হাদীস এবং বিভাগীয় পরিচালক- উচ্চতর তাফসীর ও কুরআন গবেষণা বিভাগ, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি