প্রসঙ্গঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

 

।। মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান ।।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়। এই সংবিধানে ৪টি মূলনীতি সংযোজিত হয়। যথা- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। বলা হয়, এগুলি ছিল মুক্তি যুদ্ধের চেতনা। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে নয় মাস ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে বলা হয়ে থাকে, ত্রিশ লক্ষ প্রাণ বলিদান হয়েছে। ইজ্জত গেছে দু’ লাখ মা বোনের। যারা বেঁচে রয়েছেন, যুদ্ধ প্রাক্কালে তারাও অনেকে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। দেশটি প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে দু’টি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যথা ভারত ডমনিয়ন এবং পাকিস্তান। ব্রিটিশ সরকার এমনিতেই ভারতবাসীকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয়নি।

বহু আন্দোলন, বহু নিপীড়ন এবং রক্তপাতের পরে ব্রিটিশ সরকার এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ভারত বিভক্ত হওয়ার কারণ দ্বিজাতি তত্ব। এই তত্ত্বের আবিষ্কারক মুসলমানের রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ। আর এর পুরোধা ছিলেন সিন্ধুর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। যে কারণে আর যাদের দোষেই হোক স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্বের মুহূর্তে হিন্দু-মুসলমানে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হবার কারণে দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভব। নতুবা অখন্ড স্বাধীন ভারতে অবাধে রামরাজত্ব কায়েম করা যেতো। ১৫/২০ পার্সেন্ট মুসলমান তা ঠেকাতে পারতো না; পারলে স্বাধীনতা পরবর্তীতে হিন্দুরা ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরী মসজিদ ভাংতে পারতো না। ভারতের ১৫ কোটি মুসলমান কী তা ঠেকাতে পেরেছে?

ভারত বিভক্তির সময় তা তিন ভাগে বিভক্ত হওয়া অত্যন্ত যুক্তি সংগত ছিল। আর, তৃতীয়াংশটির নাম হতো বাংলাদেশ। এবার যুক্তিগুলো বলা যাক। ১৭৫৭ সালে সুবা বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলাকে প্রতারণা এবং প্রহসনের যুদ্ধে পরাজিত করে ব্রিটিশ কোম্পানী ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের সূত্রপাত করে। তখনকার সুবা বাংলা ছিল বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে একটি শক্তিশালী বৃহৎ জনপদ। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার মানুষ যতোটা সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছে, ততোটা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ করেনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম বসু, উল্লাস কর, বারীন, যতীন, কানাই প্রমুখ বহু বাঙালি ফাঁসীতে প্রাণ দিয়েছে, দ্বীপান্তরে গেছেন।

তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ, প্রীতিলতা, প্রফুল্ল চাকী প্রমুখেরা সশস্ত্র সংগ্রাম করে প্রাণ দিয়েছেন। বাংলায় খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতাও অল্প ছিলেন না। চিওরঞ্জন দাশ, শরৎ চন্দ্র বসু, অবিন্দ ঘোষ, সুভাষ বসু, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলনা ভাসানী, নিসার আলী তিতুমীর প্রমুখ বহু বিখ্যাত নেতা ছিলেন। সুভাষ বসুতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মানীতে প্রবাসী স্বাধীন ভারত সরকার গঠন করেছিলেন। তার সংগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না জার্মানীর পতন ঘটায়। তা ছাড়াও বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। এই সকল বিবেচনায় আনলে বাংলা ভাষা ভাষীদের নিয়ে সেদিন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ হতে পারতো। চেষ্টাও করা হয়নি, তা নয়। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের প্রবল বিরোধিতার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ না হয়ে বাংলাদেশ দু’ভাগ হয়ে পূর্ব বঙ্গ (পূর্ব বাংলা) পাকিস্তানের ভাগে পড়লো এবং পশ্চিম বঙ্গ ভারত ডমিনিয়নের সঙ্গে থাকলো।

ইসলামের ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে যে পাকিস্তানের জন্ম, সেই পাকিস্তানও শাসিত হচ্ছিল ব্রিটিশ শাসকদের প্রণীত অনৈসলামিক আইনে। ব্রিটিশদের কোনো ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড পাকিস্তান সরকার বাতিল করেনি। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হলেও দেশে কোনো ইসলামী আইন জারী করা হয়নি। বরং পাক সরকার কর্তৃক সংশোধিত মুসলিম পারিবারিক আইনে ইসলামী শরীয়াহ আইনের বরখেলাপ করা হয়।

এই সময়ে পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশ মিলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান নামে এক প্রদেশে পরিণত করা হয় এবং পূর্ব বাংলার নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান। স্বাধীনতা লাভের সময়েই পাকিস্তানের লোক সংখ্যার ৫৬%ছিল পূর্ব বাংলার অদিবাসী। জনসংখ্যায় গরীষ্ঠতা থাকলেও পাকিস্তান সরকারের কোনো গুরুত্ব পদ বাঙালিরা পায়নি। বরং প্রবীণ বাঙালি নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমূখেরা ছিলেন উপেক্ষিত। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ গর্ভণর জেনারেল, লিয়াকত আলী প্রধান মন্ত্রী, চৌধুরী জাফরুল্লাহ পররাষ্ট্র মন্ত্রী। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভায় যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল কিছুদনি আইন মন্ত্রী থাকার পর ভারতে চলে যান।

পাকিস্তানের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় সিন্ধু প্রদেশের করাচীতে। তিন সেনা প্রধান পশ্চিম পাকিস্তানী এবং সেনা হেড কোয়ার্টারও সেখানেই।

অতঃ ১৯৪৮ এর শুরুতেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা একমাত্র উর্দূ হবার কথা ঘোষণা করেন জিন্নাহ সাহেব। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে উর্দূভাষী পাকিস্তান সরকার আদৌ মূল্যায়ন করেনি। সে কারণেই পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালিরা উর্দূভাষী স্বৈরাচারী পাক সরকারের প্রতি নাখোশ। প্রথম প্রতিবাদ ওঠে ভাষার দাবী নিয়ে। তখনকার শ্লোগান ছিল, ‘আর কোনো দাবী নাই। রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই ভাষা আন্দোলন ক্রমে জোরদার হলো।

এই আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেম, অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া প্রমূখের নেতৃত্বে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে জনমত গঠনের ভূমিকা পালন করে। তদুদ্দেশ্যে লেখা হয় পুস্তিকা ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, না উর্দু’ নামে। পত্রিকা প্রকাশ করা হয় ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে আসে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ছাত্ররা মিছিল করে। সেই মিছিলে পাকিস্তানী পুলিশের গুলীতে মৃত্যুবরণ করে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার এবং আরো অনেকে। ছাত্র ব্যতীত কিছু অ-ছাত্রও নিহত হয়। পুলিশ লাশ সরিয়ে নেওয়ার কারণে ভাষা শহীদের সঠিক সংখ্যা নিরুপণ করা যায়নি। আন্দোলনের কারণে বহু ছাত্র-ছাত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তখন পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন। সে কারণে তাকে বলা হতো খুনী নূরুল আমীন।

পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান সরকার ভাবতো তাদের উপনিবেশ। তাই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো সকল ক্ষেত্রে। এখানকার উপার্জন থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন খাতে প্রচুর ব্যয়ের কারণে পূর্ব বাংলা থাকতো প্রায় উপেক্ষিত। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ করলে তাদের উপরে চালানো হতো অত্যাচারের স্টীম রোলার। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে পূর্ব বাংলায় শেরে বাংলা একে ফজলুল হক,  মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আতাহার আলী প্রমূখ মিলে যুক্ত ফ্রণ্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেন। তখন কৃষক শ্রমিক পার্টির শীর্ষ নেতা শেরে বাংলা, আওয়ামী মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা মাওলানা ভাসানী, খেলাফত পার্টির শীর্ষ নেতা মাওলানা আতাহার আলী। এবারের নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্ট সংখ্যা গরীষ্ঠতা অর্জন করে বিজয়ী হয়। অতঃপর পূর্ব বাংলায় শেরে বাংলার নেতৃত্বে মন্ত্রী সভা গঠিত হয়। এই মন্ত্রী সভায় যুবনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী ছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাঙালিদের এই বিজয় পশ্চিম পাকিস্তানীরা ঠেকাতেও পারেনি, আবার সহ্যও করতে পারছিল না। তাই চলতে শুরু হলো ঘন ঘন আবর্তন বিবর্তন। শেরে বাংলার মন্ত্রী সভা বাতিল করে গভর্ণরের শাসন জারী করা হলো। ইস্কান্দার মির্জা এলেন গভর্ণরের দায়িত্বে। ১৯৫৫ সালে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় নতুন মন্ত্রীসভা গঠিত হলো। এই সালের অক্টোবর মাসে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেলের দায়িত্বে আসেন। ১৯৫৬ সালের ২৩শে মার্চ  পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজান্ত্র ঘোষণা করা হয়। গভর্ণর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা হলেন এই প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট। এই সময়ে পশ্চিমের চারটি প্রদেশ মিলে এক প্রদেশে পরিণত হয়। পূর্ববাংলার নামকরণ এসময় থেকে পূর্ব পাকিস্তান। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এ সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন। তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর  নিযুক্ত করা হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভায়ও পরিবর্তন আসে। ১২ই সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন। এদিকে গভর্ণর শেরে বাংলার নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। এই সময় বাংলাকেও রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্ত ফ্রণ্টের অভাবনীয় বিজয়ে পশ্চিমা নেতারা লাগাতার ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চলে। ১৯৫৮ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত সরকারের কোনো স্থিতিশীলতা ছিল না। এক সময়ে সোহরাওয়ার্দীর পতন ঘটে এবং ইসমাঈল ইব্রাহীম চুন্দ্রিগড় মাত্র কয়েকদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর মালিক ফিরোজ খাঁ নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পূর্ব পাকিস্তানেও এই ধারাই বহাল ছিল। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ১৯৫৮ সালের ৩১শে মার্চ গভর্ণর পদ থেকে অপসারিত হন। দুর্নীতি, অরাজকতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারী করেন ১৯৫৮ সালের ৮ই অক্টোবর। সেনাপতি জেনারেল আইউব খান প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্বে আসেন। ২৭শে অক্টোবর তিনি ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারিত করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন।

স্বৈরাচারী সেনাশাসক আইউব খান বিভিন্ন অজুহাতে তার শাসন ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা এবং তাদের উর্দূওয়ালাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার দিকে মনোনিবেশ করলেন। প্রথমতঃ দুর্নীতি দমনের অজুহাতে বেপরোয়াভাবে বাঙালি রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের আটক করে জেলে পাঠাতে শুরু করলেন। পাশ করলেন জননিরাপত্তা আইন। যাকে দুর্নীতিতে আটক করা গেল না, তাকে জননিরাপত্তা আইনে আটক করা ঠেকায় কে? সামরিক শাসনে কারো প্রতিবাদ করা সম্ভব ছিল না। অতঃপর আবিষ্কার করা হলো মৌলিক গণতন্ত্র। এই তন্ত্রে জনগণ শুধু ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। পরবর্তী সংসদ নির্বাচন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইত্যাদিতে মৌলিক গণতন্ত্রে নির্বাচিতদের শুধু ভোটদানের অধিকার থাকবে। জেল-যুলুমের মধ্য থেকে আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্র উৎরে গেল।

১৯৬৬ সাল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জীবিত না থাকায় এবং মাওলানা ভাসানী আওয়ামী মুসলিমলীগ থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেওয়ায় ন্যাপ নামে নতুন দল করায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব নিতে হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

তাঁরই নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হয়। ৬৬ সালেই বঙ্গবন্ধু ৬ দফা প্রণয়ন করেন। এই ৬ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাসনসহ আরো কিছু দাবী ছিল, যাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে না হয়। দাবীগুলি খুবই সংগত ছিল। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীদের একক মোড়লীপনা করার সুযোগ ছিল না এই ছয় দফায়। পূর্ব পাকিস্তানে ৬ দফা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেলো। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ভাবলো যে, দফা মানে পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার কৌশল। এক সময়ে আইউবী শাসনের দশ বছর পূর্ণ হলো। তিনি ঘটা করে Decade of Reforms (উন্নয়ন দশক) উৎসবের আয়োজন করলেন দেশব্যাপী। তার কীর্তি কলাপের কাহিনী নিয়ে তিনি লিখলেন Friends, Not Masters (বন্ধু, প্রভু নয়) নামে একটি বই। সেটি প্রকাশ করে প্রচার করা হলো। কিন্তু কিছুতেই আইউবী শাসনকে বাঙালি কখনো সুনজরে দেখেনি।

১৯৬৮ সালে কতিপয় বাঙালি সেনা সদস্যকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী হিসেবে আটক করা হয়। ৩৫ জন আসামীর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন এক নম্বরে। সামরিক আদালতে তাদের বিচার চলছিল। ফলতঃ ১৯৬৯ সালে বাঙালি ছাত্র জনতার যৌথ উদ্যোগে আইউব বিরোধী গণঅভ্যুত্থান ঘটলো। অবশেষে আইউব খানকে আগরতলা ষড়যন্ত মামলা প্রত্যাহার করে সকল বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হলো। তবুও আইউব খানের ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হয়নি। তিনি সেনাপতি আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। ইয়াহিয়া খান দেশে সামরিক শাসন জারী করলেও ৭০এর ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশ্বাস দেন।

সেমতে  ৭ই এবং ১৭ই ডিসেম্বর যথাক্রমে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ৩১০ আসনের মধ্যে ২৯৮ আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগের সংখ্যা গরীষ্ঠতা ঠেকানো যায়নি। অতএব, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের দায়িত্বও আওয়ামী লীগের উপর বর্তালো। নির্বাচনোত্তর তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিধান থাকলেও ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগের ডাক দিলেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে ভাষণ দিলেন। জাতিকে দিক নির্দেশনা দিলেন। সেই ভাষণের শেষের দিকে তিনি বললেন, “আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

অসহযোগ আন্দোলন পুরোপুরি সফল হয়েছিল। মার্চের মাঝামাঝি সময় ইয়াহিয়া খান, যুলফিকার আলী ভুট্টোসহ কতিপয় পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করে একটা সমঝোতায় আসার উদ্দেশ্যে। অবশ্য অন্তরালে ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমা সৈন্য মোতায়েন এবং অস্ত্র-শস্ত্রের মওজুদ বাড়ানোর উদ্দেশ্য। গোপনে সব কার্য সমাধা করে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা একে একে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান।

ইয়াহিয়া খান চলে যান ২৫শে মার্চ বিকেলে। সন্ধ্যার বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে সামরিক শাসন ঘোষণা করেন। মধ্য রাত্রে পাক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর। সে রাতে আক্রান্ত হয় ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কর্মচারীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পীলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প (বর্তমান বিজিবি) রাজার বাগের পুলিশ হেড কোয়ার্টার দখল করা হয়। বঙ্গ ইপিআর এবং পুলিশ সদস্য আহত নিহত হয়। সেই ভয়াল রাত্রীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করা হয়।

২৬শে  মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। প্রাণ ভয়ে লক্ষাধিক বাঙালি আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। সেখানে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি পদে রেখে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হলো উপ রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। প্রধানমন্ত্রী করা হয় তাজউদ্দিন আহমদকে। অন্যান্য মন্ত্রীবর্গ খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম.মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান। সংগঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশকে ১১টি যুদ্ধ সেক্টরে বিভক্ত করা হলো। প্রতি সেক্টরে নিযুক্ত হলেন একজন করে সেক্টর কমান্ডার। এরা সবাই ছিলেন পাক সেনাবাহিনীর বাঙালী সেনা অফিসার। মুক্তিবাহিনী গঠিত হয় বাংলাদেশে অবস্থানরত সেনা সদস্য, পুলিশ, ইপিআর এবং আনসারদের নিয়ে। এদের সঙ্গে যুক্ত হন বাংলাদেশের শিক্ষক, ছাত্র, সরকারী কর্মচারী এবং গ্রামের কৃষক শ্রমিক নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ। কর্ণেল (অব.) আতাউল গণী উসমানীকে নিযুক্ত করা হয় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।

সেদিন মুক্তিযুদ্ধ করা কেন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, তা বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হলো। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধ বিসমিল্লাহর বিরুদ্ধে ছিল না, এমনকি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধেও ছিল না। যুদ্ধ ছিল অত্যাচারী শোষক, বঞ্চনাকারী পাক সরকারের বিরুদ্ধে। আর, ইনশাআল্লাহ বলে যে ঘোষণা বঙ্গবুন্ধু শেখ মুজবুর রহমান দিয়েছিলেন, সেটা সফল হয়েছে। আমরা ত্রিশ লক্ষ প্রাণ এবং দু’ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা লাভ করেছি। বাঙালি জাতি আজ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক। এটাই চেয়েছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। আমরাও তাই চেয়েছিলাম।

কিন্তু অধুনা একদল মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন, সেইটাই মগজে ঢুকছে না। ৭২-এর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ থাকলো না, থাকলো ধর্মবর্জিত সমাজতন্ত্র, সেই সঙ্গে আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও যুক্ত হলো। এ সবই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? দেশের ৯০% মুসলমান কি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল দেশ থেকে তাদের ধর্ম ইসলামকে খেদানোর জন্য? আমার তো তা মনে হয় না।

পাকিস্তানের ঊর্দুভাষী সরকারের সঙ্গে বাঙালিদের তো মুসলমানের ধর্ম নিয়ে সংঘাত ছিল না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের কথা থাকায় একদল লোক ইসলাম বিরোধিতায় মত্ত হয়ে গেল। ১৯৭৫-এর পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সংবিধানে কিছু সংশোধনী এলো। তার ফলে সংবিধান শীর্ষে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম’ যুক্ত হলো। সমাজতন্ত্র বাদ দিয়ে তদস্থলে ‘এক আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা’ যুক্ত হলো। আর ধর্মনিরপেক্ষতা বর্জিত হলো। এই পরিবর্তনটা হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে।

অতঃপর এরশাদ যখন রাষ্ট্রপতি হন, তখন তিনি ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংবিধান ভুক্ত করলেন। দেশের ১০% হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টানরা বিসমিল্লাহ, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা এবং রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম অপছন্দ করতে পারেন। তাদের অপছন্দ করার যুক্তি আছে। কিন্তু মুসমানদের না পছন্দ হবার যুক্তি নেই। যদি ঈমানদার মুসলমান হন। তবে আমি অপছন্দের নয়, যুক্তির কথা বলতে চাই যে, আমাদের দেশে বহু ইসলাম নিষিদ্ধ কর্মকান্ড চলছে, এখানে ‘রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম’ কি মানানসই হয়? আমার বিবেক বিবেচনা অবশ্য সায় দেয় না।

যেখানে আচার আচরণে, মানুষের নামকরণে (মুসলমানদের) ফেইসবুক, ব্লগে, প্রিন্ট মিডিয়ায় ইসলাম অবমাননার খবর পাওয়া যায়, যেখানে তৃণমূলপর্যায়ে সূদের ব্যবসায় চলছে, যেখানে নারীদের ঘোমটা পর্দার বালাই উঠে যাবার পথে, যেখানে স্কুল-কলেজের পাঠ্য তালিকায় ইসলামী ভাবধারার কবিতা প্রবন্ধ থাকে না, যেখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে গান-বাজনা নাচের ব্যবস্থা থাকে, যেদেশে মুর্তি-ভাস্কর্যের প্রতিষ্ঠা বাধাহীন, সেখানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহাল রেখে কী লাভ? আমারতো মনে হয়, তাতে ইসলামকে অবমাননা করা হয়। বর্তমান সরকার তো ৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। ‘বিসমিল্লাহির রহামানির রহীম’-এর বঙ্গানুবাদ ‘পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’ সার্বজনীন করে নিয়েছে; অবশ্য তাদের বিবেচনায়। তবে দ্বীনদার মুসলমান আল্লাহ’র স্থলে কখনও সৃষ্টিকর্তা বলবে না।

আল্লাহ অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা। আর মুসলমানদের সৃষ্টিকর্তার নাম কখনোই ঈশ্বর, গড নয়। মুসলমানকে ‘আল্লাহ’ নামেই সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে হবে, ঈশ্বর বা গড নামে নয়। তাতেই তাদের ধর্মীয় নিদের্শনা ও আনুগত্য প্রকাশ পাবে। সেক্ষেত্রে দ্ব্যর্থবোধক অনুদিত শব্দের ব্যবহার মুসলমানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশ যেদিকে এগুচ্ছে, কার্যতঃ এটা নিছক ধর্মনিরপেক্ষ নয়। বরং পৌত্তলিক ধর্ম এবং তদাশ্রয়ী সংস্কৃতি অবাধ এবং ব্যাপকতর করার চেষ্টা দৃশ্যমান। এখানে ইসলাম ধর্ম, ধর্মীয় সংস্কৃতি, ভাবধারা, বইপত্র ইত্যাদির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় জঙ্গীবাদের নমুনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে ইসলাম বিরোধী হিন্দুত্ববাদ, সেটাকে দিনে দিনে সামনে আনা হচ্ছে। অতএব, তারপরও যদি কেউ দ্বীনদার মুসলমান থাকতে চায়, তাকে অর্গলবদ্ধ গৃহকোণে নির্বাক থাকতে হবে। কথায় বলে ‘বোবার শত্রু নেই’ যার শত্রু নেই, তার আর ভয় কিসের? এমনতর পরিস্থিতির দিকেই দেশকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। আল্লাহই মু’মিনদের একমাত্র ভরসা। #


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি