ওসীয়্যাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

।। হাফেয মাওলানা মাহমুদুর রহমান ।।

ওসীয়্যাতের সংজ্ঞা হচ্ছে নিজের উপর আল্লাহ্ তাআলার হক্ অথবা বান্দার হক্ সংশ্লিষ্ট কোন করণীয় বা বর্জনীয় ফরয বা ওয়াজিব যদি বাকী থাকে, এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তির উপর তার ওয়ারিসদের প্রতি এ ব্যাপারে ওসীয়্যাত করাও ফরয বা ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হবে। তার যিম্মায় কোন ফরয-ওয়াজিব যদি বাকী না থাকে তাহলে ওসীয়্যাত করা মুস্তাহাব। (শরহে মুসলিম-২/৩৯, তাকমিলায়ে ফাত্হুল মুলহিম-২/৯৪, ৯৫, দুররে মুখতার-৬/৬৪৮)।

ওসীয়্যাতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে মুসলমানের উপর ওসীয়্যাত যোগ্য কিছু রয়েছে, তার জন্য ওসীয়্যাতনামা না লিখে দুই রাতও অতিবাহিত করা উচিৎ নয়। (বুখারী শরীফ-১/৩৮২, মুসলিম শরীফ-২/৩৯)।

কোন কোন বর্ণনায় এক রাত আবার কোন বর্ণনায় তিন রাতের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ বলেন, আসলে হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কোন মুসলমানের জন্য নিজের ওসীয়্যাতনামা লিপিবদ্ধ করা ব্যতীত সামান্য সময়ও অতিবাহিত করা উচিৎ নয়। কিন্তু সুষ্ঠুভাবে ওসীয়্যাত বিষয়াবলীকে চিন্তা করে লেখার জন্য উপরোল্লিখিত সময়ের কথা বলা হয়েছে। যার সর্বশেষ সময় হল, তিন দিন। (ফাত্হুল বারী-৫/৩৫৮)। এজন্য উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ইব্নে উমর (রাযি.) বলেন, যেদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উক্ত কথা শুনেছি, সেদিন থেকে এক রাত অতিক্রম করার পূর্বেই আমার ওসীয়্যাতনামা আমার নিকট লিখে রেখেছি। (মুসলিম শরীফ-২/৩৯, ফাত্হুল বারী-৫/৩৮৫)। তাই উলামায়ে কিরাম সুস্থাবস্থায় যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি নিজের ওসীয়্যাতনামা লিপিবদ্ধ করে রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন। (শরহে মুসলিম-২/৩৯)।

ওসীয়্যাতের উপরোল্লিখিত বিধানসমূহ জ্ঞানসম্পন্ন, স্বাধীন, বয়স্ক, অল্প বয়স্ক নর-নারী সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। তাদের বুদ্ধিমান, চতুর বা বিবেচনাশীল হওয়া ও মহিলাদের জন্য বিবাহিতা হওয়া এবং স্বামীর অনুমতি নেওয়া এগুলোর কোনটাই শর্ত নয়। (ফাত্হুল বারী-৫/৩৫৬)। একবার ওসীয়্যাতনামা লিপিবদ্ধ করার পর পুণরায় কোন বিষয়ে ওসীয়্যাত করার প্রয়োজন দেখা দিলে পূর্বের ওসীয়্যাতনামার সঙ্গে তা সংযোজন করে নিবে। (র্শহে মুসলিম-২/৩৯)। হযরত জাবির (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ওসীয়্যাত করে মারা গেল সে সঠিক রাস্তা ও সুন্নাতের পথের উপর রয়েই মারা গেল, তাক্বওয়া ও শাহাদাতের উপর মারা গেল এবং ক্ষমা প্রাপ্তাবস্থায় মারা গেল। (ইব্নে মাজাহ্-১৯৮ পৃঃ)।

উক্ত হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, নিজের যিম্মায় কোন হক্ না থাকলেও ওসীয়্যাত করা, ক্ষমাপ্রাপ্তি এবং বড় পুণ্য ও সাওয়াবের অধিকারী হওয়ার কারণ। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৫)।

ওসীয়্যাতের উপর হাদীস শরীফের এ তাকীদ ও ফযীলতের প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি রেখেই হযরাত উলামায়ে কিরাম যুগে যুগে ওসীয়্যাতনামা লেখার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। ইমামে আযম আবু হানীফা (রাহ্.), বড় পীর আব্দুল ক্বাদীর জিলানী (রাহ্.), শাহ্ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহ্লভী (রাহ্.), হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রাহ্.)এর মত বুযুর্গানে দ্বীনের ওসীয়্যাতই এর প্রমাণ। এ বিষয়ে একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, ওসীয়্যাত করা না হলে অনাদায়ী নামায রোযার জন্য ওয়ারিসগণের উপর কাফ্ফারা, ফিদ্ইয়া আদায় করার হুকুম ওয়াজিব হিসেবে বর্তায় না। (জাওয়াহিরুল ফিক্বাহ্-১/৩৯৩)। তবে যারা ওলী ও ওয়ারিস থাকে, তারা নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দিলে দিতে পারে। এতে আশা করা যায়, আল্লাহ্ তায়ালা নিজ দয়া গুণে তা কবুল করে নিবেন এবং মৃত ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, ওসীয়্যাত করা না হলে মৃত ব্যক্তির মাল থেকে ফিদ্ইয়া দেওয়া জায়েয নয়। (বেহেশতী যেওর-৩/২০, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-৩/৪৪)।

সমগ্র জীবন দ্বীনদারী বজায় রেখে চলার পরও নিজের সন্তান-সন্ততিকে দ্বীনি শিক্ষা না দেওয়ার কারণে অনেকেরই মৃত্যু কালীন এবং মৃত্যুর পরবর্তী কাজগুলো সুন্নাত মোতাবেক আদায় হয়-ই না, বরং তাতে নানা প্রকার বিদ্আত ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটে। এগুলো থেকে বেঁচে থাকার জন্য নিজের সন্তান-সন্ততিকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া এবং বিশেষভাবে জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাদেরকে এতদুদ্দেশ্যে ওসীয়্যাত করে যাওয়া প্রত্যেকের জন্যই অপরিহার্য কর্তব্য। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২১, ২২, ৪/২৩১, ২৩২)।

যামানার প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখেই আরিফ বিল্লাহ্ হযরত মাওলানা শাহ্ হাকীম মুহাম্মদ আখতার দামাত বারাকাতুহুম (করাচী)এর লিখিত ওসীয়্যাত নামার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমাদের একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়াবলীর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে অত্র ওসীয়্যাত নামাটি হযরতের বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা মুফ্তী নূরুল আমীন (মুফ্তী দারুল উলূম মাদ্রাসা, খুলনা এবং খতীব ও পেশ ইমাম মিনারা জামে মসজিদ, খুলনা) কর্তৃক লিখিত হল। যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে ওয়ারিসগণের প্রতি ওসীয়্যাত করতে পারেন। ওসীয়্যাত নামাটি নিুরূপ।

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আমি ……………………. এর পক্ষ থেকে নিজ সন্তানাদি এবং প্রিয়জনদের প্রতি ওসীয়্যাত করছি।

তারিখ- …………………….

ওসীয়্যাতনামা

(১) আমার মুমূর্ষ অবস্থায় সূরা ইয়াসীন নিজে বা অন্য কারো দ্বারা বেশী বেশী পাঠ করবে বা করাবে। (ইব্নে মাজাহ্-১/১০৫, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৯১)। এবং কালেমার তালক্বীন করবে বা করাবে।

এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গাইরে মাহ্রাম মহিলাদের আমার নিকটে আসতেই দিবে না/কোন গাইরে মাহ্রাম পুরুষ দ্বারা কালেমার তালক্বীন, সূরা ইয়াসীন পাঠ ইত্যাদির ক্ষেত্রে খাস পর্দার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবে। সাবধান! যেন খাস পর্দার খেলাফ না হয়। (মুসলিম শরীফ-১/৩০০, তিরমিযী শরীফ-১/১৯২, র্দুরে মুখ্তার-২/১৯০)। মৃত্যুর পর আমার লাশের পাশে সম্মিলিতভাবে কুরআন পাঠ করবেনা বা করাবে না। তবে পৃথক পৃথকভাবে নিজ নিজ স্থান থেকে যার যা তাওফীক হয় পাঠ করে বখ্শে দিতে পারবে। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৯৪)।

(২) মারা যাওয়ার সাথে সাথে প্রথমেই গোসল ও স্বল্প সময়ের মধ্যে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। (আবুদাঊদ শরীফ-২/৪৫০, র্দুরে মুখ্তার-২/১৯৩)।

(৩) আমার জানাযার প্রস্তুতি, গোসল, কাফন ও দাফনের ক্ষেত্রে পুরাপুরি সুন্নাতের অনুসরণ করবে। (মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৬ পৃঃ)।

(৪) আমার মৃত্যুর পর উŽচস্বরে ক্রন্দন বা নাজায়েয কথা বলবে না। (তিরমিযী শরীফ-১/১৯৫, বুখারী শরীফ-১/১৭২, মুসলিম শরীফ-১/৩০২, মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৬ পৃঃ)।

(৫) আল্লাহ্ তায়ালার মেহেরবানীতে যদি বৃহস্পতি বার রাত্রে বা শুক্রবার সকালে আমার মৃত্যু নসীব হয়, তাহলে জুম্আর পূর্বেই কাফন-দাফন সম্পন্ন করবে। জানাযায় বেশী লোক শরীক হওয়ার উদ্দেশ্যে বা কোন নিকটতম আত্মীয়ের দর্শনের জন্য আমাকে জুম্আর আগে যেন কাফন-দাফন হতে বিরত না রাখা হয়। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/২৩৯, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৮, ৪/২৪১)। মৃত্যু হলে আমাকে ……………….. দ্বারা জানাযার ব্যবস্থা করবে। (মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৬ পৃঃ)।

(৬) অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে যদি আমার বিগত জীবনের নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদী অনাদায়ী থাকে, তাহলে কাফফারা, ফিদ্ইয়া, হজ্ব , যাকাত আমার স্থাবর অস্থাবর ষোল আনা সম্পত্তি থেকে প্রথমে আমার কাফন-দাফন ও ঋণ পরিশোধের পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে, তার এক তৃতীয়াংশ দ্বারা আদায় করবে। (জাওয়াহিরুল ফিক্বাহ্-১/৩৯২, মিরক্বাত-৪/২২৮, বেহেশ্তী যেওর-৩/২০)।

(৭) আমার মৃত্যুর পর আত্মার মাগফিরাতের জন্য যদি কোন কিছু করতে ইচ্ছা কর, তাহলে দ্বীনদার আমলদার পরহেযগার ও হক্কানী মুফ্তী আলেমের সাথে পরামর্শ করে কাজ করবে। নিজের ইচ্ছামত কোন কাজ করবে না। (ফাযায়েলে সাদাক্বাত, ২য় খণ্ড)।

(৮) আমাকে বুগলী বা সিন্দুকী কবরে দাফন করবে। কারণ তা উৎকৃষ্ট। (বুখারী শরীফ-১/১৭৯, মুসলিম শরীফ-১/৩১১, আবুদাঊদ শরীফ-২/৪৫৮, তিরমিযী শরীফ-১/২০২, র্দুরে মুখ্তার-২/২২৪)। কবরে ঠিক ডান কাতে ক্বিবলামুখী করে শোয়ানো সুন্নাত। এমনভাবে শোয়াবে, যেন সিনা পুরোপুরি ক্বিবলার দিকে ফিরে থাকে। প্রয়োজন হলে মাথা এবং পিঠের নীচে মাটি দেওয়া যাবে। (চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে কেবল মুখটি ক্বিবলার দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার নিয়ম সঠিক নয়। এতে শুধু লাশের উপর কষ্ট দেওয়া হয়)। (ফাত্ওয়ায়ে আলমগিরী-১/১৬৬, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৮)।

(৯) পুরুষদের জন্য কবর যিয়ারত করা মুস্তাহাব। (যিয়ারতের শাব্দিক অর্থ দেখা বা দর্শন করা। পরিভাষায় কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীকে সালামের দোয়া পড়ে কবরের কথা, কবরের আযাবের কথা এবং দুনিয়ার যিন্দেগীর অসারতার কথা চিন্তা করে অন্তর নরম করা এবং মৃত ব্যক্তিদের জন্য কিছু সাওয়াব বখ্শিশ করাকে কবর যিয়ারত বলে।) সপ্তাহে অন্ততঃ একদিন আমার কবর যিয়ারত করার চেষ্টা করবে। শুক্রবার সবচেয়ে ভাল। (মুসলিম শরীফ-১/৩১৩, ৩১৪, তিরমিযী শরীফ-১/২০৩, আবুদাঊদ শরীফ-২/৪৬১, ফাত্হুল বারী-৩/১৪৮)।

 

সাওয়াব বখশিশ করার কয়েকটি সঠিক নিয়ম

(ক) কিছু টাকা-পয়সা, ভাত-কাপড় কোন অভাবগ্রস্ত মু’মিন লোককে দান করে তার নিকট কোন কিছু প্রকাশ না করে নিজেরাই আল্লাহর নিকট দোয়া করবে যে, হে আল্লাহ্! এর বিনিময়ে যে সাওয়াব হয় তা অমুককে পৌঁছে দিও। (মুসলিম শরীফ-১/৩২৪)।

(খ) সাদাকায়ে জারিয়া তথা মাদ্রাসা, মসজিদ, তালিবে ইল্ম-মুর্দারিসগণের খরচ, দ্বীনি কিতাব ইত্যাদি কাজে কিছু টাকা-পয়সা বা স্থাবর সম্পত্তি দান করে নিজেই আল্লাহর কাছে দোয়া করবে যে, হে আল্লাহ্! এর যা কিছু সাওয়াব হয়, তা অমুককে পৌঁছে দিও। নিয়্যাতে যেন গোলমাল না হয়, অর্থাৎ- নাম যশ খ্যাতির নিয়্যাত হওয়া উচিৎ নয়। খালেস আল্লাহর ওয়াস্তে নিয়্যাত করবে। নতুবা সাওয়াব হবে না বা পৌঁছবে না। (মুসলিম শরীফ-২/৪১)।

(গ) পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু অংশ পাঠ করে যেমন সূরা ফাতিহা, সূরা বাক্বারার প্রথম ও শেষ তিন আয়াত, সূরা ইয়াসীন, সূরা মুল্ক, সূরা ইখ্লাস তিন বার ইত্যাদি বা সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ, নফল নামায-রোযা, তাস্বীহ্, ইস্তিগফার, দরূদ শরীফ পড়ার মাধ্যমে আমাকে উপকৃত করবে।

কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “মৃত ব্যক্তি কবরে পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকা ব্যক্তির ন্যায়। সদা সে পিতা-মাতা ও ভাই-বোন, বন্ধুর দোয়া দ্বারা উপকৃত হওয়ার প্রতীক্ষায় থাকে।” (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/২৪৩, ফাত্হুল মুলহিম-৩/৩৮, মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৭ পৃঃ)। অতঃপর আল্লাহর নিকট এরূপ দোয়া করবে যে, হে আল্লাহ্! অমুকের গুনাহ্ মাফ করে দাও, কবর আযাব হতে বাঁচিয়ে রাখ, অমুকের আখেরাতের মুশ্কিল আসান করে দাও। তার উপর রহ্মত নাযিল কর। তাকে চিরস্থায়ী সুখ দান কর। তার ভুল-ত্র€টি মাফ করে দাও। তোমার দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা তার পাপরাশিকে ক্ষমা করে দাও। ময়লা কাপড় যেমন ধুয়ে পরিস্কার করা হয়, তাকে পাপের ময়লা থেকে সেরূপ পরিস্কার করে দাও। এই জগতের বাড়ী, সঙ্গী এবং যুগল থেকে উত্তম বাড়ী, উত্তম সঙ্গী এবং উত্তম যুগল দান কর। তাকে বেহেশ্ত দান কর। তাকে সম্মানিত কর। তার স্থান প্রশস্ত করে দাও এবং কবর ও দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। (মুসলিম শরীফ-১/৩১১)।

(১০) সাওয়াব রিসানীর উদ্দেশ্যে প্রচলিত যে সমস্ত অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ বর্জন করবে। যেমন, মীলাদ মাহ্ফিল, কুলখানি, তিন দিনের বা ৪০ দিনের খানা খাওয়ানো, মৃত্যু বা জন্ম বার্ষিকী পালন ইত্যাদি। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/২৪০, মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৬ পৃঃ)।

(১১) পারিশ্রমিকের বিনিময় যেমন, টাকা-পয়সা নযরানা স্বরূপ লেনদেন করা, খানা খাওয়ানো বা মিষ্টি বিতরণের মধ্য দিয়ে হোক, কুরআন খতম, কালেমা খতম ও দোয়া দরূদ করানো থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকবে। এগুলো কুরআন-হাদীসের আলোকে সম্পূর্ণ হারাম। (তাফ্সীরে মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ ৪২ নং আয়াত, ছারছীনার মরহূম পীর হযরত মাওলানা শাহ্ নেছার উদ্দীন আহ্মদ (রাহ্.) প্রণীত আল্ ক্বওলুস্ সাদীদ-৩, ৪ পৃঃ)। মাআরিফুল কুরআনে ফাত্ওয়ায়ে শামীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আল্লামা শামী র্দুরে মুখ্তারের শরাহ্ এবং শিফাউল আলীল গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে এবং অকাট্য দলীলাদিসহ প্রমাণ করেছেন যে, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মৃতদের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম বা অন্য কোন দোয়া-কালাম ও ওযীফা পাঠ করানো হারাম। কারণ এর উপর কোন ধর্মীয় মৌলিক প্রয়োজন নির্ভরশীল নয়। এখন যেহেতু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরআন পড়া হারাম, সুতরাং যে পড়বে এবং যে পড়াবে, উভয়ই গুনাহ্গার হবে। বস্তুতঃ যে পড়ছে সে যখন কোন সাওয়াব পাচ্ছে না, তখন মৃতের আত্মার প্রতি সে কি পৌঁছাবে? কবরের পাশে বসে দেখে দেখে বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরআন শরীফ খতম করানোর রীতি সাহাবী, তাবিঈন এবং প্রথম যুগের উম্মতগণের দ্বারা কোথাও বর্ণিত বা প্রমাণিত নেই। সুতরাং এগুলো নিঃসন্দেহে বিদ্আত।

(১২) যে এলাকায় আমার ইন্তিকাল হয় সে এলাকার কবরস্থানে আমাকে দাফন করবে। (ত্বাহ্ত্বাভী-৩৩৭ পৃঃ, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৭, ৪/২১৮)।

(১৩) গোসল দেওয়ার সময় (পুরুষ হলে) নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত, (মহিলা হলে) সম্পূর্ণ শরীরের পর্দার প্রতি খেয়াল রাখবে। যার নিয়মঃ দু’জন লোক একটি চাদর শরীরের সামান্য উপরে দুই পাশ থেকে টেনে ধরবে। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/২২৩, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-৪/২২৩)। এবং গায়েবানা জানাযা পড়বে না ও পড়াবে না। কেননা, এটা শরীয়তে নাজায়েয। (দুররে মুখতার- ২/২০৯)।

(১৫) মরণোত্তর আমার চক্ষুসহ অন্য কোন অঙ্গ দান করবে না। কারণ তা নাজায়েয।

(১৬) মুখ দেখানোর প্রথা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করবে। বিশেষ করে গাইরে মাহ্রাম মহিলাদের, গাইরে মাহ্রাম পুরুষদেরকে মুখ দেখানো থেকে বিরত রাখবে। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-৪/২২৯)।

(১৭) স্মরণ রাখবে! কবরে ঘর বানানো হারাম। অতএব আমার কবর পাকা বা লেপা-পোঁচা করবেনা। মযবুতের জন্য কবর পাকা করা, কবর অনেক উঁচু করা এবং লেপা মাকরূহে তাহ্রীমী। (মুসলিম শরীফ-১/৩১২, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-৪/১৮৯, ১৯৯, তিরমিযী শরীফ-১/২০৩)।

(১৮) সুন্নাতের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে পাঁচ ওয়াক্ত নামায গুরুত্ব সহকারে জামাআতের সাথে, মহিলারা নিজ নিজ গৃহে পর্দা সহকারে আদায় করবে। নামাযের বাইরেও সুন্নাতের নিয়মাবলী ও মাসনূন দোয়াসমূহের প্রতি খুবই গুরুত্বারোপ করবে। (বুখারী শরীফ-১/৮৯, মুয়াত্তা মালিক-৩ পৃঃ, হিদায়া-১/১২৬)।

(১৯) স্বীয় বাড়ীতে বেপর্দা রমণী, জীব-জন্তুর ছবি, টিভি, গানবাদ্য এগুলো ঢুকতে দিবে না। (মুসলিম শরীফ-২/১৯৯ ও ২০০, কাশ্কুলে মা’রিফাত-৫৬৭ পৃঃ, তিরমিযী শরীফ-২/৪৪, মিশ্কাত শরীফ-২/৩১৮)।

(২০) বিবাহ-শাদীসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে সকল প্রকার কু-প্রথা, অপচয় থেকে বিরত থাকবে। যেমন, গায়ে হলুদ, গেট সাজানো, ক্লাবে বিবাহ ইত্যাদি। বিশেষ করে বিবাহ সুন্নাত মোতাবেক মসজিদে সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে। (তিরমিযী শরীফ-১/২০৭, বেহেশ্তী যেওর-৬/১৬-৪১)।

(২১) সব সময় সুন্নাতানুসারী আলেম, তালেবে ইল্ম, হক্কানী পীর-বুযুর্গ ও অন্যান্য সকল দ্বীনের সহীহ্ খাদেম ও মুবাল্লিগদেরকে আন্তরিকভাবে মুহাব্বত করবে, খেদমত করবে এবং সু-সম্পর্ক রেখে চলবে। (তা’লীমুল মুতাআল্লিম-৫৮ পৃঃ, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৬)।

(২২) প্রতিদিন কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের অভ্যাস করবে। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২২)। এবং কোন সুদক্ষ ক্বারী সাহেবের নিকট থেকে কুরআন শরীফের অক্ষরগুলো মশ্ক্ব করে নিবে। সবসময় কুরআন শরীফের ৪টি হকের দিকে লক্ষ্য রাখবে। হকগুলো হলো, পবিত্র কুরআন শরীফের (ক) মুহাব্বত (খ) সম্মান (গ) বিশুদ্ধ তিলাওয়াত (ঘ) কুরআন শরীফের আদেশ নিষেধের অনুসরণ করা। (কাশকুলে মা’রিফাত-৫৬৭ পৃঃ)।

(২৩) হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক্) যথাযথ আদায় না করে থাকলে হক্ প্রাপ্তদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবে এবং অর্থ সম্পদ সংশ্লিষ্ট হক্ হলে সেগুলো পরিশোধের ব্যবস্থা করবে। (তিরমিযী শরীফ-১/২০৬, ইব্নে মাজাহ্-২/১৭৭, মা-লাবুদ্দা মিনহু-১৩৭ পৃঃ)।

(২৪) ত্যাজ্য সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে বন্টনের পূর্বে কোন প্রকার দান-খয়রাত, গরীব-মিসকীনদের খাওয়ানো ইত্যাদি থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে। কারণ ত্যাজ্য সম্পত্তি বন্টনের পূর্বে তা থেকে মেহ্মানদের আদর-আপ্যায়ন, দান-খয়রাত ইত্যাদি করা বৈধ নয়। এ ধরনের দান-খয়রাত দ্বারা মৃত ব্যক্তি কোন সাওয়াব পায় না। বরং সাওয়াব মনে করে দেওয়া আরো কঠোর গুনাহ্। বিশেষ করে ওয়ারিস যদি নাবালক এতীম থাকে। কেননা, এতীমের মাল খাওয়া আগুন খাওয়ার শামিল। এতীমের অনুমতি নিয়েও দান-খয়রাত করবে না, কারণ নাবালকের অনুমতি ধর্তব্য নয়। (তাফ্সীরে মা’আরিফুল কুরআন-২/২১৮)।

(২৫) ছেলে-মেয়েসহ সকল ওয়ারিসের হক্ পাই পাই হিসেব করে বুঝিয়ে দিবে। বিশেষ করে মেয়েদের হকের ব্যাপারে বেশী সাবধানতা অবলম্বন করবে। (তাফ্সীরে মাআরিফুল কুরআন-২/২১৫)।

(২৬) ভাই-বোনের পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্ককে কোন মূল্যেও ভঙ্গ হতে দিবে না। এই সুন্দরতম সম্পর্ক এবং বহু দামী মূলধনের হিফাযতের জন্য যদি নফ্সের কামনা-বাসনা ও মাল-সম্পদ এবং পদ-মর্যাদাও কুরবানী দিতে হয়, তবুও তাতে কখনও অস্বীকৃতি জানাবে না। আপোষের মধ্যে ঐক্য এবং মুহাব্বতের দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি ও আখেরাতের নিয়ামতসমূহ ছাড়াও দুনিয়ার মধ্যে শান্তি, তৃপ্তি, খুশী, বরকত এবং সম্মান ও মাল-সম্পদের মধ্যে উন্নতি হয়। এর বিপরীত মতানৈক্য, আল্লাহ্ তায়ালার অসন্তুষ্টি এবং আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও দুনিয়াতে পেরেশানী, অপমান, দারিদ্রতা ও ধ্বংসের কারণ হয়। স্মরণ রাখতে হবে যে, দুনিয়াবী সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে আল্লাহ্ তায়ালার কোনরূপ হুকুম যেন আদৌ লঘন করা না হয়। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৩, ২৪)।

(২৭) কোন সমস্যা বা প্রয়োজন সামনে আসলে সালাতুল হাজাত নামায পড়ে একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার নিকট সমাধান চেয়ে নেওয়ার অভ্যাস করবে এবং কোন নেককার আলেম বা প্রিয়জনদের নিকট দোয়ার আবেদন জানাবে। মাঝে মধ্যে সালাতুল হাজাত পড়ে আল্লাহ্ তায়ালার নিকট স্বীয় আÍশুদ্ধির জন্য দোয়া করবে। (কাশ্কুলে মা’রিফাত-৫৬৮, আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৭)।

পরিশেষ, দুনিয়ায় চলতে গেলে আচার-ব্যবহার, কথা-বার্তায় এমন কি শাসনের ক্ষেত্রে শিক্ষা-দীক্ষায়, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কেউ না কেউ কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কাজেই আমি সকলের কাছে আল্লাহর ওয়া¯ে ক্ষমা চাই। আমাকে দিল থেকে ক্ষমা করে দিবে। যদি জানতে পার যে, কেউ আমার দ্বারা কষ্ট পেয়েছে, তবে তার নিকট আমার পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। (আহ্সানুল ফাত্ওয়া-১/২৬)।

স্বাক্ষর……………………………………………………

গ্রাম………………………………………………………

পোঃ……………………………………………………….

থানা………………………………………………………

জেলা……………………………………………………..


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি