জিজ্ঞাসা-সমাধান -ফতোয়া বিভাগ, হাটহাজারী মাদ্রাসা।

কবর সংক্রান্ত প্রচলিত কিছু প্রথা

(৮০২৪) মাওলানা মুহাম্মদ আবু সাঈদ, নালিতাবাড়ী।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) অনেক এলাকায় দেখা যায় যে, কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর অনেকেই চাল-ডাল, টাকা-পয়সা ইত্যাদি দেয় এবং সেগুলোকে একত্র করে পরে সেগুলো গরীব ও ফকীর-মিসকীনকে দেয়। আর একটি বিষয় হলো, মৃত ব্যক্তিকে দাফন দেওয়ার পর তার কবরের চার পাশে চারটি খেজুরের ডাল পুঁতে দেওয়া হয় এবং এ সময় চার কুল পড়া হয়। আমার জানার বিষয় হলো, এই সমস্ত প্রথার কোনো ভিত্তি আছে কি-না?

(খ) কবরের উপর কোনো গাছ লাগানো যাবে কি-না? লাগানো গেলে কোন কোন শ্রেণীর গাছ লাগানো যাবে না, জানাবেন।

সমাধানঃ (ক) ইসলাম যে সমস্ত ইবাদতকে কোনো বিষয়ের সাথে নির্দিষ্ট করেনি সেগুলোকে কোনো বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা শরীয়ত পরিপন্থী। তাই মৃতের কাফন-দাফনকে কেন্দ্র করে টাকা-পয়সা চাল-ডাল ইত্যাদি জমা করে গরীবদের মাঝে বিতরণ করা কুসংস্কার ও বিদআত। এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যকীয় এবং মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর কবরের চার কোনে খেজুর গাছের ডাল বা অন্য কোনো পাতাবাহার গাছ আবশ্যক না ভেবে লাগালে কোনো সমস্যা নেই। তবে প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে চার কুল পড়ার ভিত্তি কুরআন-হাদিসে পাওয়া যায়নি।

(খ) কবরের উপর কাঁটাদার গাছ লাগানো কবরের আদব পরিপন্থী। তবে কবরের পাশে ফুল গাছ বা পাতাবাহার গাছ লাগানো যাবে, এতে কোনো সমস্যা নেই। (বুখারী শরীফ- ১/১৮২, মুসলিম শরীফ- ২/৭৭, সাবাহাতুল ফিক্র ফিল জিহরি বিয যিক্রি- ৬২)।

 

প্যাকেটে ছবিযুক্ত পণ্য বিক্রয় প্রসঙ্গে

(৮০২৫) মুহাম্মদ ফরহাদ, মেঘনা সাইকেল কারখানা, নতুন বাজার, শ্রীপুর, গাজীপুর।

জিজ্ঞাসাঃ আমি একজন কসমেটিকস ব্যাবসায়ী এবং পাশাপাশি বই পুস্তক বিক্রি করি। আমার প্রশ্ন হল, অনেক কসমেটিকসের গায়ে বা বই পুস্তকের কভারের উপর মানুষের বা জীব-জন্তুর ছবি দেখা যায়। এ অবস্থায় বেচা-কেনা জায়েয হবে কি-না? মেহেরবানী করে জানালে উপকৃত হব।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে একথা স্পষ্ট যে, যদি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ছবি মুখ্য উদ্দেশ্য না হয়, বরং পণ্যের সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুতে (যেমন- সিল, স্টিকার, প্যাকেটের গায়ে) কোনো প্রাণীর ছবি থাকে এবং এমন ছোট হয় যে, দূর থেকে বুঝা না যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বস্তু হিসেবে তার বেচা-কেনা জায়েয। সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় আপনার বেচা-কেনা জায়েয হবে। (আশবাহুন নাযায়ের- ১/৫৩ ও ১/৫৮, কিফায়াতুল মুফতী- ৯/২৪২, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৯/২৮৭, জাওয়াহেরুল ফিক্বাহ- ৩/২৩৮)।

 

সুন্নাত ও নফল নামায ঘরে পড়া প্রসঙ্গে

(৮০২৬) মুহাম্মদ নূরুল আবছার, ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ সুন্নাত ও নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম, নাকি মসজিদে পড়া উত্তম।

সমাধানঃ প্রকৃত মাসআলা তো হল, সকল সুন্নাত ও নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম। কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধকতার দরুন এই হুকুম পরিবর্তন হতে পারে। আর প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে।

বর্তমানের ঈমানী চেতনার দুর্বলতার যামানায় যেহেতু সুন্নাতকে ঘরের জন্য ছেড়ে দিলে পরে আদায় করা হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এমনকি হতে পারে একেবারেই পড়া হল না। এই জন্য পরবর্তী ফুকাহাগণ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাকে মসজিদে পড়ার হুকুম দেন। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ১/৪৫৮, ইমদাদুল ফাতাওয়া- ১/৩০৮, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ- ৪/২২৬)।

 

বিয়ে প্রসঙ্গে

(৮০২৭) নাম-ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ আমার প্রশ্ন হল, সৎ শ্বাশুড়িকে বা স্ত্রীর সৎ মাকে বিয়ে করা জায়েয হবে কি-না?

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে একথা স্পষ্ট যে, সৎ শ্বাশুড়িকে বা স্ত্রীর সৎ মাকে বিয়ে করা জায়েয। কেননা, শরীয়তের মূলনীতি হল, আত্মীয় সম্পর্কের দুই মহিলাকে এক ব্যক্তির বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা তখন জায়েয হবে, যখন দুই মহিলা কোনো একজনকে পুরুষে রুপান্তর করা হলে অপরজন তার মাহরাম হয়। তেমনিভাবে ২য় মহিলাকেও পুরুষ মানলে অপর জন মাহরাম হয়। তবে যদি একজনকে পুরুষ মানলে মাহরাম হয় অপর জনকে পুরুষ মানলে মাহরাম না হয়, তবে উভয় মহিলাকে এক ব্যক্তির বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা জায়েয। (দুররে মুখতার- ৪/১২৪, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/৩০৬, ফাতাওয়ায়ে হাকানিয়া- ৪/৩৩২)।

 

মসজিদে ঘোষণা প্রচার

(৮০২৮) মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (শহিদ), নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের জামে মসজিদে ফরয নামায শেষ হবার সাথে সাথে বিভিন্ন এলান দেয়া হয়। আবার কখনো কিতাব তালীম বা বয়ান করা হয়। যার কারণে মাসবুক ব্যক্তির নামায আদায়ে ব্যাঘাত ঘটে। প্রশ্ন হলো, উক্ত এলান বা বয়ান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটা সঠিক? বিস্তারিত জানিয়ে সামাজিক বিবাদ মিটাতে সহায়ক হবেন।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, নামাযী ব্যক্তির নামাযে বিঘœ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। অতএব, মাসবুক ব্যক্তির নামায শেষ হওয়ার পূর্বে মসজিদে কোনো ধরণের এলান, ওয়ায-নসিহত করা যাবে না। হ্যাঁ, যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ এলান থাকে এবং মুসল্লীগণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সংক্ষেপে এমনভাবে এলান করবে যাতে অন্য নামাযীদের নামাযে ব্যাঘাত না ঘটে। (সূরা নূর- ৩৬, মিশকাতুল মাসাবিহ- ১/৯০, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৯/৬৫৬)।

 

মহরের পরিমান সম্পর্কে

(৮০২৯) মাওলানা ওমর ফারুক, ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ মহরের মাঝে আসল কোনটি এবং মহরে ফাতেমী সুন্নাত কি-না? বিস্তারিত জানতে চাই।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে মহর নির্ধারণ করা আল্লাহপ্রদত্ত বিধান। মহর কয়েক প্রকার। যথা- (১) ১০ দিরহাম সমপরিমাণ; ইহা ন্যূনতম মহর। এ ধরণের মহর ধার্য করা জায়েয হবে না। (২) মহরে মিছিল তথা পাত্রীর মা, বোন, খালাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মহর। (৩) মহরে মুসাম্মা অর্থাৎ- উভয় পক্ষ মিলে যে মহর ঠিক করা হয়। কিন্তু ১০ দিরহামের কম হতে পারবে না। তবে বেশির কোনো সীমা নেই। (৪) মহরে ফাতেমী ১৫০ (একশত পঞ্চাশ) তোলা রূপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ। বিবাহের ক্ষেত্রে মহরে ফাতেমী মুস্তাহাব। (সূরা নীসা- ২৪, সুনানে তিরমীযী- ১/২১১, আবু দাউদ- ১/২৮৭ ও ১/২৮৮, নাসাঈ শরীফ- ২/৭২, সুনানে ইবনে মাযাহ- ১/১৩৫ ও ১/১৩৬, দুররে মুখতার- ৪/২২০, ও ৪/২২৩, জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ৪/৩৫২ ও ৪/৩৫৫, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া- ৮/২৩১, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৭/২৭১০।

 

সামাজিক প্রথা প্রসঙ্গে

(৮০৩০) মুহাম্মদ জামাত আলী বেপারী, বাগবাড়ী, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের এলাকায় অনেক মানুষ আছেন, যারা রাতের বেলায় কাউকে টাকা কর্জ দেয় না। তার কারণ হল, ঘরের লক্ষ্মী চলে যাবে। তেমনি রাতে ঘর ঝাড়– দেওয়া যাবে না। সকাল বেলা ঘর ঝাড়– দেওয়া ছাড়া নিজ প্রয়োজনেও টাকা বের করা যাবে না বা কর্জ দেওয়া যাবে না।

ব্যবসায়ীরা দিনের প্রথম বেচা-কেনাকে বাকি দিতে চায় না। তাদের ধারণা হল, আজ যত বেচা-কেনা হবে সব বাকিতে বিক্রি হবে বা লস হবে। সেজন্য সামান্য নগদ মূল্য হলেও ক্রয়কারীকে দিতে হবে। ব্যবসায়ী সেই টাকা কপালে নিয়ে সালাম করে এবং চুমা খায়।

কিছু মানুষ বসবাসের ঘর তৈরীর সময় দরজা দক্ষিণ দিক করে বানায়। এটাকে বেশ গুরুত্ব দেয় ও বরকতের কারণ মনে করে। গাভী বাচ্চা প্রসব করলে প্রথমে দুধ দোহন করে পানিতে ফেলে বিন্না থোপা অর্থাৎ- এক ধরণের ঘাসের গোড়ায় ঢেলে দেয়; প্রমুখ প্রথা রয়েছে। কুরআন হাদীসের আলোকে এসকল প্রথার সমাধান চাই।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নে বর্ণিত বিবরণগুলো হিন্দুদের রীতিনীতি, যা পরিষ্কার কুফুরী। এমন কথাবার্তা ও বিশ্বাস পোষণ থেকে দূরে থাকা সবার উপর ওয়াজিব ও ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ সমস্ত গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। (সূরা ইউনুস- ১০৭, সূরা যারিয়াত- ৫৮, সূরা তালাক- ৩, মিশকাতুল মাসাবিহ- ১/১৯)।

 

মাজারে মান্নত ও মাজার পাকা করা প্রসঙ্গে

(৮০৩১) মুহাম্মদ নাজির হুসাইন, দাসিরদিয়া, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ।

জিজ্ঞাসাঃ সম্মানিত মুফতী সাহেব, আমাদের গ্রামে একজন বৃদ্ধা মহিলা ছিল। তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তাদের বাড়িতে গদাই ফকিরের কবর আছে। তাই তিনি স্বপ্নের কথা বলে বাড়ীর ঐ স্থানকে সম্মান করতে বলেন। অথচ সেখানে বাস্তবে কবর আছে কি-না, তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না। পরে বাড়ীর লোকেরা উক্ত মহিলার কথা অনুযায়ী ঐ স্থানকে কবরের মত বানিয়ে পাকা করে ফেলে। পাকা করার পর কিছু মানুষ ঐ কবরকে সম্মান করতে থাকে। এছাড়া বিপদ-আপদ থেকে বাচার জন্য মাজারকে দুধ দিয়ে গোসল করায়, উক্ত মাজারের নামে মান্নত করে এবং বরকত লাভের উদ্দেশ্যে উক্ত মাজারে মোমবাতি আগরবাতি জ্বালায়। মাজারের মাটি নিয়ে গলায় ও শরীরে মাখে এবং মাজারকে কেন্দ্র করে সেখানে প্রতি বছর জলসা করা হয়। বর্তমানে ঐ মাজারকে বিল্ডিং করা হচ্ছিল, কিন্তু এলাকার আলেম সমাজ নিষেধ করায় কাজ স্থগিত রয়েছে।

এখন আমার জানার বিষয় হল- ১. প্রশ্নে উল্লিখিত মহিলার স্বপ্নের দ্বারা কি কবর প্রমাণিত হবে?

২. যদিও কবর প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই কবর পাকা করা কি জায়েয আছে?

৩. উক্ত কবরকে কেন্দ্র করে যে কাজগুলো হচ্ছে তা কতটুকু বৈধ?

৪. যদি গ্রামের সকলে মিলে ঐ মাজারকে ভেঙ্গে ফেলে বৈধ হবে কি? শরয়ী দলীল সহকারে সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

বি.দ্র. প্রশ্নে উল্লিখিত মহিলা ও গদাই ফকির বিশেষ কোনো ব্যক্তিত্ব বা বুজুর্গ ছিলেন না।

সমাধানঃ বর্তমানে বাংলাদেশে মাজার হচ্ছে শিরক ও বিদআতের আড্ডাখানা এবং অঘোষিত রমরমা ব্যবসা কেন্দ্র। আর অধিকাংশ মাজার ভন্ড ধোঁকাবাজরা চালু করেছে স্বপ্নের দোহাই দিয়েই। আর এই মাজার নামক ভাইরাসের মাধ্যমে ইহুদী খ্রীস্টানদের দালালরা মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা ধ্বংসের গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। তাই- (১) প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ব্যতীত উক্ত মহিলার স্বপ্নের দ্বারা কবর প্রমাণিত হবে না। (২) কবর পাকা করা জায়েয নেই। (৩) উক্ত কবরকে কেন্দ্র করে যে কাজগুলো হচ্ছে তা কোনটাই জায়েয নয়। কেননা, বিপদ-আপদ থেকে বাঁচানোর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার জন্য কবরকে দুধ দিয়ে গোসল করানো ও মাজারের নামে মান্নত করা ইত্যাদি শিরক ও কঠোর গুনাহের কাজ।

প্রশ্নে উল্লিখিত শিরকের আড্ডাখানায় বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মোমবাতি আগরবাতি ইত্যাদি জ্বালানো ও মাজারের মাটি নিয়ে গলা ও শরীরে মাখা এবং মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর জলসা করা কোনটাই জায়েয নেই।  (৪) আপনারা গ্রামের সকলে মিলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে উক্ত মাজার তথা শিরকের আড্ডাখানাকে ভেঙ্গে ফেলা বা উচ্ছেদ করা জায়েয তো হবেই, বরং আরো সাওয়াব হবে। তবে সংঘাত বা সংঘর্ষের আশংকা থাকলে ব্যাপক আকারে সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। (সূরা মায়েদা- ২, তাফসীরে ইবনে কাসীর- ৩/৮, মুসলীম শরীফ- ১/৩১২, মিশকাতুল মাসাবিহ- ১/২৭, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৯/২০৪, দুররুল মুখতার- ২/৪৩৯, রদ্দুল মুহতার- ২/৪৩৯, মিরকাতুল মাফাতিহ- ৮/৪৩১ ও ৪/১৫৫, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ১/২২৭)।

নামাযের নিয়্যাত সম্পর্কে

(৮০৩২) মুহাম্মদ আব্দুল আলীম মন্ডল, দীঘলকান্দি, সাঘাটা, গাইবান্ধা।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের এলাকায় অনেকেই একথা বলেন যে, “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা…..”।

এই নিয়্যাত যারা জানে না তাদের নামায হয় না। আমাদের জানার বিষয় হল, তাদের কথা কতটুকু সত্য এবং নিয়্যাতের সঠিক পন্থা কী?

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নে বর্ণিত নিয়্যাত সম্পর্কে তারা যে মন্তব্য করে তা সম্পূর্ণই মনগড়া ও ভিত্তিহীন কথা এবং “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা……” ইহা মানুষের বানানো নিয়্যাত। নিয়্যাতের সঠিক পন্থা- মনে মনে নামাযের ইচ্ছা পোষণ করলেই নিয়্যাতের জন্য যথেষ্ট হবে। তবে মনের সাথে সাথে মুখে উচ্চারণ করা উত্তম। (সূরা বাইয়্যিনা- ৫, সহীহ বুখারী- ১/২, ফাতাওয়ায়ে কাযীখান- ১/৫৩)।

 

বরযাত্রী সম্পর্কে

(৮০৩৩) মুহাম্মদ আব্দুল আলীম, বাঘবাড়ী, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা।

জিজ্ঞাসাঃ ছেলের পক্ষ মেয়ের পক্ষকে বলে আমরা বরযাত্রী হিসেবে এত জন আসব। আমাদেরকে খাওয়াতে হবে। বিয়ের দিন নির্দিষ্ট বরযাত্রীর চেয়ে বেশি সংখ্যক বরযাত্রী আসে। এর কারণ হল, মেয়ে পক্ষকে খানা-পিনার সংকটে ফেলে লজ্জা দেওয়া। এটাকে বরপক্ষের লোকজন অহংকার ও গৌরবের বস্তু বলে মনে করে। অনেক সময় নববধূকে বলে ফেলে, দেখেছি বিয়ের দিন তোমার বাবা ঠিকমত একবেলা খাওয়াতে পারেনি ইত্যাদি কথাবার্তা।

বিয়ের পর বর কনেকে জোর করে একসাথে দুই রাকাত নফল নামায পড়ায়, এমন জায়াগায় যেখানে বিয়ে বাড়ীর প্রায় সব মানুষ দেখতে পায়। বর-কনেকে লক্ষ্য করে বলতে থাকে, কার আগে কে নামায শেষ করতে পারে ইত্যাদি কথাবার্তা বলে থাকে। পুরো বিষয়টি কুরআন-হাদীসের মাধ্যমে সমাধান চাই।

সমাধানঃ ধর্মীয় বিধান হতে জানা যায় যে, বিয়ের নিয়ম আদিকাল অর্থাৎ হযরত আদম ও হাওয়া (আ.) হতে এ পর্যন্ত চলে আসছে, যা মুসলমানদের জন্য ইবাদত।

বর্তমানে বরযাত্রীর নামে যে খানা-পিনার প্রথা চালু আছে, তা সোনালী তিন যুগ অর্থাৎ- নবী কারীম (সা.), সাহাবা (রাযি.) ও তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীনগণের যুগে ছিল না। এটা সম্পূর্ণ বিধর্মীদের রীতিনীতি, যা ত্যাগ করা জরুরী।

সম্ভব হলে ওলিমা করবে বরের পক্ষ থেকে । অথবা বিয়ের মজলিসে খেজুর ছিটিয়ে দিবে। মানুষকে লজ্জায় বা চাপে ফেলে তার মাল ভক্ষণ করা হারাম। চাই তা কোন অনুষ্ঠানে হোক বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে হোক। নিকৃষ্টতম সুদ হল, মুসলমানের ইজ্জত নষ্ট করা।

প্রচলিত নিয়মে যে নামায পড়ানো হয়, তা বর্জন করা সবার জন্য জরুরী। তবে নিজ ইচ্ছায় বিবাহের শোকরিয়া হিসেবে নফল নামায আদায় করা উত্তম।

বি.দ্র. বর্তমানে বিয়ে উপলক্ষে পর্দার মত গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে লঙ্ঘন করা হয়, যা মহাপাপ ও অন্যায়। (সূরা নিসা- ২৯, সুনানে তিরমিযী- ১/২০৮, মিশকাতুল মাসাবিহ- ১/১৫৫, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৬/৩৭)।

 

নামায প্রসঙ্গে

(৮০৩৪) মুহাম্মদ বখতিয়ার, সহকারী মেরিন ইঞ্জিয়ার, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, ঢাকা।

জিজ্ঞাসাঃ আমি ভাসমান সরকারী জলযানের উপর (নৌবাহিনী) চাকুরী করি। এর মধ্যে প্রায়শঃ উপকূলীয় অঞ্চলে আসা-যাওয়া করতে হয়। এমতাবস্থায় আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায কোন নিয়মে আদায় করব, তা জানালে খুবই উপকৃত হব।

সমাধানঃ কুরআন-হাদীসের মৌলিক বিধান হতে জানা যায় যে, আপনি যে উপকূলীয় অঞ্চলে গমন করেন তা যদি আপনার চাকুরীর অবস্থানস্থল (স্থায়ী অফিস অথবা ওয়াতনে ইকামত) হতে ৭৮ কিলোমিটার দূরত্বে হয় এবং সেখানে ১৫ দিনের চেয়ে কম সময় থাকার নিয়্যাত করেন, তাহলে ৪ রাকাতবিশিষ্ট ফরয নমাযকে কসর অর্থাৎ ২ রাকাত আদায় করতে হবে।

উল্লেখ্য, সুন্নাতের কোনো কসর নাই। একান্ত ব্যস্ততা ছাড়া ফজরের সুন্নাত ত্যাগ করা যাবে না। অন্য সব সুন্নাত আদায় করা উত্তম, যদি সুযোগ থাকে। (সূরা নিসা- ১০১, সুনানে তিরমিযী- ১/১২০-১২১, সুনানে নাসাঈ- ১/২৫৬, কিফায়াতুল মুফতী- ৩/৩৭৩)।

 

রোযা থাকা অবস্থায় ইনজেকশন গ্রহণ প্রসঙ্গে

(৮০৩৫) নাম-ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ কোনো রোযাদার ব্যক্তি যদি রোযা থাকা অবস্থায় ইনজেকশন ব্যবহার করে, তাহলে কি রোযা ভেঙ্গে যাবে? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব, ইনশাআল্লাহ।

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, ইনজেকশন দ্বারা রোযা ভঙ্গ হবে না। কারণ ইনজেকশন করা হয় গোশত ছেদ করে বা রগের মধ্যে। আর ঐ তরল পদার্থ গোশতে বা রগে থেকে যায়। সেখান থেকে অতিক্রম করে পেটে পৌঁছে না, কিংবা ব্রেইনে খাবারের স্বাদ অনুভূত হয় না। আর পৌঁছলেও তা চুইয়ে চুইয়ে পৌঁছে। আর রোযা ভঙ্গ হওয়ার জন্য পেটে খাবার বা ব্রেইনে খাবারের স্বাদ অনুভূত হওয়া জরুরী। শুধু কোনো অঙ্গে বা রগে পৌঁছাটা রোযা ভঙ্গের কারণ নয়। অতএব, বোঝা গেল ইনজেকশন দ্বারা রোযা ভঙ্গ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে- ২/২৪৩, ফাতাওয়ায়ে কাযীখান- ১/১৩০, দুররে মুখতার মাআশ শামী- ৩/৪৩২, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ১/২৬৬, বাহরুর রায়েক- ২/৪৮৭, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৫/১৭৫-১৭৯)।

 

তালাক প্রসঙ্গে

(৮০৩৬) হারেছ আল-মাহমুদ, উত্তর হাওলা, মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা।

জিজ্ঞাসাঃ এক সময় আমার কাকা রাগের মাথায় আমার কাকিকে বললো, তুমি যদি আর ঝগড়া কর তাহলে তুমি তালাক, এই ঘরে তোমার ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কথাগুলো বলার ১/২ মাস পর আবার ঝগড়া শুরু হলো, কিন্তু কাকা ঘরে ছিলো না। এখন আমার জানার বিষয় হলো, কথাগুলো বলার কারণে তালাক হবে কি-না? বিস্তারিত জানাবেন এবং এ মুহূর্তে কাকার কী করা উচিত?

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ‘তুমি যদি আর ঝগড়া কর তাহলে তালাক’ একথা থেকে আপনার কাকার যদি উদ্দেশ্য হয় যে আমার সাথে ঝগড়া করলে তালাক, তাহলে প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী তালাক হবে না। কেননা ঝগড়ার সময় তিনি বাড়ি ছিলেন না। আর যদি উদ্দেশ্য এমন হয় যে, আমার পরিবার বা অন্য কারো সাথে ঝগড়া করলে তালাক। সে ক্ষেত্রে প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী যেহেতু তালাককে ঝগড়ার সাথে শর্তযুক্ত করার পরে আপনার কাকি ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে, সেহেতু তার উপর এক তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার কাকার জন্য ইদ্দতের সময়-সীমার ভিতরে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকবে। আর যদি উক্ত সময়ের ভিতর তার পূর্বের কথা প্রত্যাহার করে স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে নতুন মহরানা ধার্য করে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ দোহরাতে হবে। অন্যথায় উক্ত স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না।

উল্লেখ্য যে, আপনার কাকি যদি ঋতুবর্তী হয়ে থাকে, তাহলে তার ইদ্দতের সময়-সীমা হবে তিন হায়েয। আর যদি তার ঋতু¯্রাব বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তিন মাস। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/৪২০, হিদায়া- ২/৩৮৫, দুররে মুখতার- ৪/৪৫৭, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া- ৮/৩০৭)।

 

রোযা প্রসঙ্গে

(৮০৩৭) মুহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন, ভোলা।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আমার জানার বিষয় হল, যদি কোনো ব্যক্তি রোযা অবস্থায় কুলি করে এবং গলার ভিতরে পানি প্রবেশ করে, তাহলে তার রোযার কী হুকুম?

(খ)  যদি কোনো রোযাদার ব্যক্তির গলার ভিতরে মাছি অথবা ধোঁয়া প্রবেশ করে, তাহলে তার রোযার কী হুকুম?

(গ) যদি কোনো ব্যক্তি সাহরী খাওয়ার পর পান মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে যায়, সকালে উঠার পরও যদি তার মুখে পান থাকে, তাহলে তার রোযার কী হুকুম? জানিয়ে বাধিতে করবেন।

সমাধানঃ (ক) ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, রোযার কথা স্মরণ থাকা অবস্থায় যদি কুলি করার সময় অনিচ্ছায় পানি গলার ভিতর প্রবেশ করে, তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করা ওয়াজিব। এজন্য রোযা অবস্থায় কুলি করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।

(খ) রোযা অবস্থায় যদি অনিচ্ছায় গলার ভিতর ধোঁয়া বা মাছি ঢুকে যায় তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না। আর যদি ইচ্ছা করে ঢুকায় তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করা ওয়াজিব। তাই রোযার মাসে দিনের বেলা আগরবাতি ও লোবান ইত্যাদি জ্বালানো হতে বিরত থাকা কর্তব্য।

(গ) যদি কোনো ব্যক্তি পান মুখে রেখে ঘুমিয়ে যায় তাহলে তার হুকুম হলো, যদি ঐ পানের রস বা কোনো অংশ গলার ভিতর চলে গেছে বলে ধারণা হয়, তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। পরে কাযা করে নিবে।

আর যদি এমন ধারণা না হয় তাহলে রোযা নষ্ট হবে না। তবে এমন খাদ্যদ্রব্য মুখে রাখা মাকরূহ। তাই রোযা অবস্থায় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/৩৯০, হিদায়া- ১/১৯৯, দুররে মুখতার- ২/৪০১ ও ২/০৩৮, জাওয়াহেরুল ফাতাওয়া- ১/১৬ ও ১/২০, এমদাদুল ফাতাওয়া- ২/১৬৯)।

 

প্রচলিত তাসবিহ ছড়া প্রসঙ্গে

(৮০৩৮) মুহাম্মদ ইমরান হুসাইন, খুলনা।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের দেশে প্রচলিত তাসবিহ যেখানে একশটি পাথর বা অন্য কিছুর দানা থাকে। এই জাতীয় তাসবীর দানা গণনা করে যিকির করা জায়েয আছে কি-না? এক আহলে হাদীস বক্তা বলেছেন, তসবীহ দ্বারা যিকির করা বিদআত। কেননা এক সাহাবী পাথর গুণে যিকির করছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখে বললেন, আমার জীবদ্দশায় তোমরা বিদআত শুরু করে দিলে? আহলে হাদীসের কথা সহীহ কি-না? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, যদি লোকদেখানো উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে প্রচলিত তাসবীহ দ্বারা যিকির করা জায়েয আছে। প্রশ্নোল্লিখিত আহলে হাদীস বক্তার কথা সঠিক নয়। কেননা সহীহ হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক মহিলাকে খেজুর দানা অথবা কঙ্কর মাধ্যমে তাসবীহ পড়তে দেখে নিষেধ করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে কোনো কিছু করতে দেখে নিষেধ না করার অর্থ হচ্ছে এই কাজে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি আছে। এটাকে হাদীসের পরিভাষায় “তাক্বীরুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” বলে। তা মারফু হাদীসের অন্তর্ভূক্ত। আর তা কখনো বিদআত হতে পারে না। সুতরাং এই তথাকথিত আহলে হাদীস আলেম যে কথা বলেছেন, এই অর্থে কোনো হাদীস পাওয়া যায়নি। (মিরকাতুল মাফাতিহ- ৫/২২১, রদ্দুল মুহতার- ১/২৫০ ও ২৫১, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/১৬৪)।

 

বাইয়ে মুদারাবা প্রসঙ্গে

(৮০৩৯) আবুল হাসান, ফতুল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের এখানে ‘ওলামা পরিষদ ফতুল্লা’ নামক একটি সমিতি রয়েছে। এই সমিতির ৩,৫০,০০০ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা লাভ লসের ভিত্তিতে আমাদের এক সদস্যকে ব্যাবসার জন্য দেওয়া হয়েছিল। ১ বৎসর পর চুক্তি অনুযায়ী লাভের অর্ধ্বেক টাকা, অর্থাৎ- ১,৪০,০০০ (এক লক্ষ চল্লিশ হাজার) টাকা লাভ হওয়ায় তার অর্ধ্বেক অর্থাৎ ৭০,০০০ (সত্তর হাজার) টাকা এবং মূল টাকা সমিতিকে ফেরত দেন। ৩৫০,০০০+৭০,০০০= ৪,২০,০০০ লাভের টাকা সকলের অংশে চলে যায়। পারবর্তীতে সমিতির টাকা আবার ব্যাবসার জন্য দেয়ার সিদ্ধান্ত হল, কিন্তু দেশের অবস্থা খারাপ থাকার কারণে ব্যাবসার জন্য কেউ টাকা নিতে রাজি হচ্ছিল না। পরে আবার সকলে পূর্বের ব্যক্তিকে টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এবার টাকার পরিমান ৩,৬০,০০০ (তিন লক্ষ ষাট হাজার) এতো অল্প টাকায় কোনো ব্যবসা না পাওয়ায় সেই সদস্য ফতুল্লার ৭জন ব্যবসায়ীসহ মোট ৮ জন মিলে ১টি জায়গা ক্রয় করেন। প্রতি সদস্যের ৪,৭৫,০০০ (চার লক্ষ পাঁচাত্তর হাজার) টাকা করে মোট ৩৮,০০,০০০ (আটত্রিশ লক্ষ) টাকা ব্যয়ে সোয়া একত্রিশ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। জমির দলীল মিউটিশনসহ প্রতি শতাংশ প্রায় ১ লক্ষ ২২ হাজার টাকা করে পড়ে। ১ বৎসর পর জমির শতাংশ হয়ে গেল ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। সমিতির মিটিংয়ে সকলে সিদ্ধান্ত নিল আরো কিছু দিন অপেক্ষা করা হোক। দেখতে দেখতে ৩ বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু জমির দাম বাড়ল না। বর্তমানে প্রতি শতাংশ সর্বোচ্চ ৮০,০০০ টাকা মূল্য হবে। এখন সমিতির সকলে বলছেন এর দায়ভার আমরা কেউ বহন করব না। সমিতিতে পূর্ণ ৩,৬০,০০০ (তনি লক্ষ ষাট হাজার) টাকা ফেরত দিতে হবে এবং জমি উক্ত সদস্যের থেকে যাবে।

এদিকে উক্ত সদস্যের বক্তব্য হল, জমি আপনারা যেভাবে পারেন বিক্রি করেন। অথবা সকল সদস্যের নামে করে নেন। অথবা আপনারা কেউ ক্রয় করেন। আর যদি আমাকে দিতে চান তাহলে বর্তমান বাজার মূল্যেই দিতে হবে।

আমাদের এক সদস্য বললেন, আমি মাসআলা জানা লোক, জমি বিক্রি করলে লাভ-লসের হিসাব আসবে। যেহেতু বিক্রিই হয়নি, তাই লাভ লসের হিসাব আসবে না। এখন আমাদের জানার বিষয় হল, বর্তমান বাজার মূল্যের আশি হাজার টাকার জমি যদি উক্ত সদস্যকে যবরদস্তি করে ১,২২,০০০ (একলক্ষ বাইশ হাজার) টাকায় নিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে এই লেন-দেনটি জায়েয হবে, নাকি সুদ হবে? আমাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে বাধিত হবেন।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নোক্ত বক্তব্যানুযায়ী আপনাদের যেই সদস্যকে দ্বিতীয়বার ৩,৬০,০০০  (তিন লক্ষ ষাট হাজার) টাকা প্রদান করেছেন। সেই অর্থ যদি প্রথমবারের মতোই লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে আংশিদারী হিসেবে প্রদান করে থাকেন, তাহলে উক্ত সদস্যের সাথে আপনাদের মুদারাবার (লাভ-ক্ষতির অংশদারিত্ব ভিত্তিক যৌথ ব্যবসার) চুক্তি হয়েছে।

আর মুদারাবার বিধান হলো, মুদারিবের (লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব ভিত্তিক যৌথ ব্যবসাকারীর) পক্ষ থেকে কোন প্রকার সীমালঙ্ঘন বা অনিয়ম ছাড়াই যদি মুদারাবার অর্থ বিনষ্ট হয়ে যায় বা তাতে লোকসান দেখা দেয়, তাহলে তা অর্থদাতারই বহন করতে হয়। তাই আপনাদের উক্ত সদস্যের কাছ থেকে এর জন্য ক্ষতিপূরণ নেওয়া যাবে না এবং জবরদস্তি করে তার কাছে উক্ত জমি বিক্রিও করা যাবে না। কেননা ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার জন্য ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সন্তুষ্টি আবশ্যক। বরং উক্ত জমি আপনাদের সমিতিরই থেকে যাবে।

তবে যদি মুদারাবার চুক্তির সময় তাকে নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবসা করার অনুমতি প্রদান না করে থাকেন, অর্থাৎ তাকে একথা বলেননি যে, “তোমার যেভাবে খুশি এই টাকা দ্বারা ব্যবসা করতে পারবে” তাহলে তার কাছ থেকে এর ক্ষতিপূরণ নেওয়া যাবে। কারণ মুদারাবার অর্থ দ্বারা মালিকের অনুমতিবিহীন অন্য কারো সাথে যৌথ ব্যবসা করা বা তার সাথে নিজস্ব অর্থ যোগ করা বৈধ নয়। এমতাবস্থায় লাভ ক্ষতির দায়দায়িত্ব মুদারিবের বহন করতে হয়।

কিন্তু যদি সেখানকার প্রচলন এমন হয় যে, মুদারাবার অর্থের সাথে নিজস্ব অর্থ যোগ করলে বা অন্য কারো সাথে যৌথ ব্যবসা করলেও অর্থদাতাগণ তা থেকে নিষেধ করে না, তাহলেও তার থেকে ক্ষতিপূরণ নেওয়া যাবে না। (ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ১৫/৩৯০ ও ১৯৮ এবং ১৫/৩৯৯, দুররে মুখতার- ৮/৪৩১)।

 

জানাযার জামাত সংক্রান্ত

(৮০৪০) আহলে শূরার পক্ষে, মুহাম্মদ শামসুদ্দীন।

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের খুলনা জেলার তাবলীগী মার্কাজ মসজিদটি শহরের আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। মসজিদের পিছনে বড় মাঠ আছে, সেখানে ঈদের নামায ও জানাযার নামায আদায় করা হয়। তাবলীগের মার্কায হওয়ার কারণে প্রতি বৃহস্পতিবার এবং বিশেষ মাশওয়ারার দিনগুলিতে বহু মানুষের জমায়েত হয়ে থাকে। এসব দিনে মাগরিব, এশা ও ফজরবাদ বয়ান-তালীমের আমল হয়ে থাকে। এসময় জানাযা এসে গেলে নামাযের জন্য সবাই বাইরে চলে গেলে মার্কাযি আমলে কিছুটা ইনতেশার পয়দা হয় এবং মজমা জমাতে বেশ সময় চলে যায়। এখন আমাদের জানার বিষয় হল, উক্ত জরুরতের কারণে কেবল ঐ দিনগুলিতে জানাযার নামায মসজিদে আদায় করতে পারবো কি-না?

উল্লেখ থাকে যে, মসজিদের মেহরাবে দরজা আছে এবং পশ্চিমে এ পরিমাণ জায়গা আছে যে মাইয়্যেত এবং ইমাম সাহেবসহ এক কাতার মুসল্লী দাঁড়াতে পারে।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, শরয়ী উযর ব্যতীত মসজিদে জানাযার নামায পড়া সর্বাবস্থায় মাকরূহ, চাই লাশ মসজিদের ভিতরে রাখা হোক বা বাহিরে।

আর শরয়ী উযর হল, মসজিদ ব্যতীত জানাযার নামায পড়ার অন্য কোন উপায় না থাকা। যেমন, প্রবল বৃষ্টি যার দরুন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও জানাযার নামায পড়া অসম্ভব হয়ে পড়ে বা মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও জানাযা পড়ার মত কোনো স্থান না থাকে। এমতাবস্থায় মসজিদে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ হবে না।

প্রশ্নোল্লিখিত উযর শরয়ী উযরের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় উক্ত উযরের কারণে মসজিদে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ হবে। আর প্রশ্নে যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ- লাশ, ইমাম সাহেব এবং এক কাতার মুক্তাদি মসজিদের বাইরে থাকবে। এপদ্ধতিতে জানাযার নামায আদায় করলে যে সকল মুক্তাদী মসজিদের ভিতরে দাঁড়াবে তাদের নামায মাকরূহ হবে। (আবু দাউদ- ৪৫৪, খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ২২২-২২৩, ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া- ১৩২, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/২২৪, বাহরুর রায়েক- ২/৩২৭)।

 

ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত

(৮০৪১) মুহাম্মদ ইদরীস আলী, কুড়িগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আজ থেকে ৩৫ বৎসর পূর্বে আমার বাবা আমার চাচার কাছ থেকে তিন শতাংশ জমি ক্রয় করেছিলেন, তৎকালীন সময় এক শতাংশ জমির মূল্য ছিলো ৩০০ টাকা, সেই হিসেবে তিন শতাংশ জমি ৯০০ টাকা দিয়ে ক্রয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় চাচার কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি করে নেননি। বর্তমানে সেই জমির মূল্য ১ শতাংশ ১৫ হাজার টাকা। এখন আমার বাবা চাচার কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি চাইলে চাচা অস্বীকৃতি জানান এবং বর্তমান মূল্য হিসেবে ১ শতাংশ ১৫ হাজার টাকা চাচ্ছেন এবং তারপর রেজিষ্ট্রি করে দিবেন। এখন আমার জানার বিষয় হলো, উল্লিখিত তিন শতাংশ জমি বর্তমান সময়ের মূল্য দিয়ে কিনে রেজিষ্ট্রি করে নিতে হবে, নাকি আগের ক্রয় ঠিক রেখে শুধু রেজিষ্ট্রি করে নিলেই হবে? জানিয়ে বাধিত করবেন।

(খ) আমার বড় ভাই আমার কাছে মাঝে মাঝে দুই শত টাকা করে ঋণ চান এবং বলেন, দশ দিন পর তিন শত টাকা দিবো। আমি একশত টাকা বেশি পাওয়ার আশায় দুই শত টাকা ঋণ দেই এবং আমার ভাইও ভাবেন যে, একশত টাকা বেশি দিলে তার উপকার হবে। এখন আমার জানার বিষয় হলো, অতিরিক্ত একশত টাকা কি সুদের মধ্যে গন্য হবে?

সমাধানঃ (ক) ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নে উল্লেখিত বর্ণনা অনুযায়ী যেহেতু বেচা-কেনা পরিপূর্ণ হয়েছে। তার রেজিষ্ট্রি না হওয়ার কারণে বর্তমান সময়ের মূল্য চাওয়ার শরীয়তের বিধান অনুযায়ী কোনো অধিকার নেই এবং জমি পূর্বের মূল্য অনুযায়ী রেজিষ্ট্রি করে দেওয়া আবশ্যক।

(খ) হ্যাঁ, আপনার অতিরিক্ত একশত টাকা সুদের মধ্যে গণ্য হবে। (হিদায়া- ৩/৪, দুররে মুখতার মাআশ শামী- ৭/৪১৩, ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৪/৪৫)।

 

বাচ্চাদেরকে টিকা, পোলিও ইত্যাদি দেওয়া প্রসঙ্গে

(৮০৪২) মুহাম্মদ খালিদ, ফেনী।

জিজ্ঞাসাঃ আমরা জানি রোগ হলে ঔষধ ব্যবহার করা সুন্নাত। বর্তমানে আমাদের শিশুদেরকে ভবিষ্যতের রোগ ব্যধি থেকে সুস্থ থাকার জন্য টিকা, পোলিও ইত্যাদি দিয়ে থাকি। যার কারণে দেখা যায়, বাচ্চা যন্ত্রণার কারণে জ্বর ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়। আমার প্রশ্ন হলো, বাচ্চাদেরকে এমন ঔষধ প্রয়োগ করা শরীয়াত সম্মত কি-না? মেহেরবানী করে জানালে কৃতজ্ঞ হব।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, আপনি বিজ্ঞ ডাক্তারদের স্মরণাপন্ন হয়ে এ বিষয়ে জানতে পারেন যে, পোলিও, টিকা ইত্যাদি বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজনীয় বা উপকারী কি-না? যদি প্রয়োজনীয় বা উপকারী হয়, তাহলে বাচ্চাদেরকে এমন ঔষধ ব্যবহার করাতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা আল্লার হাবীব (সা.) ইরশাদ করেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা (রোগ ব্যধির) চিকিৎসা কর। কেননা, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রোগেরই ঔষধ সৃষ্টি করেছেন, বার্ধক্য আর মৃত্যু ছাড়া। (মিরকাত- ৮/৩৪৬, সহীহ বুখারী- ২/৮৪৮, ফাতহুল কদীর- ১০/৭৯)।

 

ইতিকাফের ক্বাযা আদায়ের প্রসঙ্গে

(৮০৪৩) মুহাম্মদ আকরামুল্লাহ, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আমি মাসিক মুঈনুল ইসলামের একজন নিয়মিত পাঠক। আল্লাহর রহমতে বিগত বেশ কয়েক বছর হতে আমি রমযানের শেষ দশদিন নিয়মিত ইতিকাফ করে আসছি। আর আল্লাহর তৌফিকে আমার হায়াতের মধ্যে যত রমযান পাব সব রমযানেই শেষ দশদিন ইতিকাফ করার নিয়ত করছি। আপনারাও আমার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যাতে আমাকে রহমত বরকত ও তৌফিক দেন।

গত ২৮ শে রমযান আমার ছোট ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তিকাল করায় আমাকে ইতিকাফ ভঙ্গ করে দেশের বাড়িতে যেতে হয়েছিল।

মাসিক মুঈনুল ইসলাম জুন ২০১৬ সংখার ১৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “রমযানের ইতিকাফের ক্বাযা দিতে হলে রমযানের মাস আবশ্যক নয় তবে রোযা রাখা আবশ্যক”। এখন আমার জানার বিষয় হলো, আমি কি যে তিন দিন ইতিকাফে থাকিনি সে তিন দিনের ক্বাযা ইতিকাফ করব, নাকি পুরো ১০দিনের ইতিকাফ করতে হবে। আর যদি তিন দিনের ক্বাযা তিন দিন করলে আদায় হয়ে যায় তবে মাসের তিন দিন নফল রোযা অর্থাৎ ১৩,১৪,১৫ তারিখের রোযার সাথে ইতিকাফ করে নিলে ক্বাযা আদায় হয়ে যাবে কি-না?

(খ) আমার জানার বিষয় হলো, যেহেতু আমি নিয়ত করে নিয়েছি যে, হায়াতের মধ্যে পাওয়া সব রমযানেই শেষ দশদিন (ইনশাআল্লাহ) ইতিকাফ করব। এখন যদি শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণবশতঃ কখনো রমযানের ইতিকাফ করতে অক্ষম হয়ে যাই, তবে পরবর্তীতে ক্বাযা করতে পারব কি-না? এবং কীভাবে করব? কুরআন-হাদীসের আলোকে সঠিক উত্তর দানে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ (ক) ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নে উল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী আপনাকে শুধু একদিনের ক্বাযা করলেই চলবে। তবে রোযা রাখা আবশ্যক।

(খ) কোনো ভাল কাজের নিয়ত করার দ্বারা উক্ত কাজটি আদায় করা আবশ্যক নয়। অতএব, কোনা সমস্যার কারণে যদি আপনি আগত রমযানের দশদিনের ইতিকাফ আদায় করতে সক্ষম না হন, তাহলে পরবর্তীকালে তার ক্বাযা আদায় করতে হবে না। (রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৩৪ ও ৩/৪৩১, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া- ৭/২৭৫)।

 

মসজিদের অর্থ দিয়ে মাদরাসা চালানো প্রসঙ্গে

(৮০৪৪) মাওলানা মুহাম্মদ জাকির হুসাইন, ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ মসজিদের অর্থ দিয়ে মাদরাসা চালানোর ব্যাপারে শরীয়তের বিধান কী? শরয়ী দলীলের আলোকে উত্তর জানানোর আবেদন রইল।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, মসজিদের অর্থ দিয়ে মাদরাসা চালানো জায়েয হবে না। কেননা, মসজিদের টাকা মসজিদের জন্য ওয়াকফ করা। হ্যাঁ, যদি ঐ মাদরাসা মসজিদের অধীনে হয়, অর্থাৎ মসজিদ প্রতিষ্ঠাতাই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করল এবং বলল যে, এই মাদরাসা মসজিদের অধীনে থাকবে এবং মসজিদের আমদানী দ্বারা মাদ্রাসা চালানো হবে, তাহলে জায়েয হবে। (বাহরুর রায়েক- ৫/৩৬২, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৪/৩৬০ ও ৪/৪৩৩, ফতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৫/৭৩)।

 

মসজিদের ওয়াকফিয়া জমিতে মাদরাসা নির্মাণ প্রসঙ্গে

(৮০৪৫) মুহাম্মদ আকবর হোসেন মোল্লা, ঠিকানা বিহীন।

জিজ্ঞাসাঃ আমি মুহাম্মদ আকবর হোসেন মোল্লা। বিগত কয়েক বছর আগে আমার বাড়ীর পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করার নিয়তে কিছু জমি মৌখিকভাবে ওয়াকফ করি। অতঃপর সেই ঘোষণা মোতাবেক জনসাধারণকে নিয়ে মসজিদ নির্মাণকাজ উদ্বোধন করার লক্ষ্যে দোয়ার ব্যবস্থাও করি। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের অন্য এক মসজিদের পুনঃনির্মাণ কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জনৈক আলেমের পরামর্শে আমাদের নুতন উদ্বোধনকৃত মসজিদের কাজ সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধন্ত নিয়ে কাজ স্থগিত রাখি।

বর্তমানে কিছুদিন পূর্বে পুনরায় মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং চেষ্টা করতে থাকি। এরই মাঝে গ্রামের কতিপয় সাধারণ মানুষ উক্ত জমির ওপর একটি মহিলা মাদরাসা নির্মাণ করার ব্যাপারে আমাকে উৎসাহ প্রদান করেন। পাশাপাশি জনৈক মাওলানা সাহেবও উক্ত স্থানে মহিলা মাদরাসা নির্মাণ করা যাবে মর্মে আমাকে পরামর্শ প্রদান করেন। পক্ষান্তরে জনৈক আরেক মুফতী সাহেব মসজিদ নির্মাণ করতে হবে মর্মে পরামর্শ প্রদান করেন। তাই এ পরিস্থিতিতে আমার জানার বিষয় হচ্ছে যে, কোনো জায়গা মৌখিকভাবে মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে ওয়াকফ করে দিলে তা শরয়ী ওয়াকফ হয়ে যায় কি-না? যদি ওয়াকফ হয়ে যায়, তাহলে মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জমিতে মাদরাসা নির্মাণ করা জায়েয হবে কি-না?

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, কেউ যদি কোনো জায়গা মৌখিকভাবে মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে ওয়াকফ করে দেয়, তাহলে তা শরয়ী ওয়াকফ হয়ে যায়। কেননা ওয়াকফ সহীহ হওয়ার জন্য লিখিতভাবে ওয়াকফ করা শর্ত নয় বরং মৌখিকভাবে ওয়াকফ করলেই ওয়াকফ সহীহ হয়ে যায়। আর মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জমিতে মাদরাসা নির্মাণ করা জায়েয হবে না। (রদ্দুল মুহতার- ৬/৫২০, দুররে মুখতার- ৬/৬৪৯-৬৫০)।

 

তালাক প্রসঙ্গে

(৮০৪৬) মুহাম্মদ খালেদা মরিয়ম, পিরোজপুর।

জিজ্ঞাসাঃ এক মহিলার তার স্বামীর সাথে ঝগড়া হচ্ছে। এমতবস্থায় মহিলা বলল, আমি এখনই বাবার বাড়ি যাব। বাবার কাছে সব নালিশ করব। এর বিচার করতে হবে। বিয়ের পর থেকে তুমি আমাকে অনেক জ্বালাইছ। অনেক অপমান করেছ, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছ। আমি কোনোদিন এসব মানব না। তখন স্বামী বলল, ‘যা, যা, যা আরেকটা ছেলের সাথে বিয়ে বসে দেখ কত শান্তি’। আমার প্রশ্ন হল, এতে কি কোন তালাক হবে?

উল্লেখ্য স্বামীর তালাক দেওয়ার নিয়ত ছিল না। এমনিই রাগ করে বলেছে। যেসব সুস্পষ্ট ইঙ্গিতমূলক শব্দ রাগের সময় বললে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়, সেগুলো জানতে চাই।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নের বর্ণনা যদি সত্য হয়, অর্থাৎ- যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে থাকে, তাহলে এর দ্বারা তালাক হবে না।

তবে কিছু ইঙ্গিতমূলক শব্দ এরকম আছে যেগুলো রাগের সময় বললে তালাকের নিয়ত ছাড়াই তালাক হয়ে যায়। যেমন, তুমি ইদ্দত পালন কর, তুমি তোমার রেহেমকে পরিষ্কার কর, যাও তোমার স্বাধীনতা তোমাকে দিয়ে দিলাম ইত্যাদি। (রদ্দুল মুহতার- ৫১৬-৫২১, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৫২১-৫২২, হিদায়া- ২/৩৫৩)।

 

নামের শুরুতে মুহাম্মদ ও মুসাম্মত লেখা প্রসঙ্গে

(৮০৪৭) মুহাম্মদ খালিদ, ফেনী।

জিজ্ঞাসাঃ পুরুষদের নামের শুরুতে ‘মুহাম্মদ’ লিখা হয়, মহিলাদের নামের শুরুতে ‘মুসাম্মৎ’ লিখা হয়, শরীয়তে তার বাস্তবতা কতটুকু এবং কেন লিখা হয়। বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।

সমাধানঃ ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে প্রমাণিত হয় যে, নামের শুরুতে মুহাম্মদ ও মুসাম্মাৎ লেখা যাবে। আর মুহাম্মদ হচ্ছে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম। নিশ্চয় এই নাম আল্লাহর কাছে প্রিয়। তাই নামের শুরুতে মুহাম্মদ লিখে বরকতের আশা করা যায়।

আর মুসলমানদের উচিত শরীয়তের সীমায় থেকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিধর্মীদের বিরোধিতা করা। যেহেতু আমাদের এই ভারতবর্ষে অমুসলিম হিন্দুদের প্রভাব বেশী ছিল। আর তারা তাদের নামের শুরুতে ‘শ্রী’ এই জাতীয় শব্দ লিখত। তাদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মুসলমানরা শ্রী লিখতে শুরু করল। এজন্য হিন্দুয়ানী প্রভাব থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য উলামায়ে কিরাম তার মুকাবেলায় নামের শুরুতে মুহাম্মদ ও মুসাম্মৎ লিখার প্রথা চালু করেন। যেন মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে পার্থক্য হয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম- ১/২২, রদ্দুল মুহতার- ৯/৫৯৭, মিরকাতুল মাফাতিহ- ৪/১০)।  #

 

বিভাগটি পরিচালনা করে- “ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ”, আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি