তাফসীরে কালামুল্লাহ – মুফতী জসিমুদ্দীন

নাজাতের একমাত্র মাধ্যম- নেক আমল

সূরা- বনী ইসরাঈল

وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيْنِ فَمَحَوْنَا آيَةَ اللَّيْلِ وَجَعَلْنَا آيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِتَبْتَغُواْ فَضْلاً مِّن رَّبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُواْ عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ وَكُلَّ شَيْءٍ فَصَّلْنَاهُ تَفْصِيلاً o

 وَكُلَّ إِنسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَآئِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا o

 اقْرَأْ كَتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا o

তরজমাঃ (১২) আমি রাত্র ও দিনকে দু’টি নিদর্শন করেছি। অতঃপর নিষ্প্রভ করে দিয়েছি রাতের নিদর্শন এবং দিনের নিদর্শনকে দেখার উপযোগী করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর এবং যাতে তোমরা স্থির করতে পার বছরসমূহের গণনা ও হিসাব এবং আমি সব বিষয়কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।

(১৩) আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে।

(১৪) (এবং তাকে বলা হবে) পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা)। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্যে তুমিই যথেষ্ট।

ব্যাখ্যাঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপন বান্দাদের উপর স্বীয় নেয়ামতের কথা কালামে পাকের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন। এখানেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপন নিয়ামতসমূহের মধ্য হতে অনেক বড় দু’টি নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। আর তা হল, রাত এবং দিন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাতকে করেছেন আলোহীন, অন্ধকার, বিশ্রামের উপযুক্ত। যাতে করে মানুষ সারা দিনের ক্লান্তি-ক্লেশ দূর করতে পারে। আর দিনকে বানিয়েছেন আলোক-উজ্জল; যাতে করে মানুষ জীবিকা উপার্জন করতে পারে, দূর-দুরান্তে সফর করতে পারে, পার্থিব জীবনের বহু কর্ম সমাধা করতে পারে।

যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “লিতাবতাগু ফাদলাম মির-রাব্বিকুম” অর্থাৎ- “যাতে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর”। অনুরূপভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাত ও দিনকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে এবং ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সৃষ্টি করেছেন। একটিকে আরেকটির সাথে ধারাবাহিকতার শিকলে এমন ভাবে জুড়ে দিয়েছেন যে, একটির পর আরেকটি আসবে। কখনো একটি আরেকটির সাথে, অর্থাৎ- রাত দিনের সাথে এবং দিন রাতের সাথে একত্রিত হবে না। বরং রাত যাবে তারপর দিন আসবে, দিন যাবে তারপর রাত আসবে। যেমনটি সূরা ইয়াসিনের ৪০নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, অর্থাৎ- “সূর্য চন্দ্রের নাগাল পেতে পারে না আর না রাত দিনের আগে যাবে, প্রত্যেকে আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে”।

অনুরূপ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাত এবং দিন দু’টিকে একই রূপে এবং একই পন্থা দিয়ে সৃষ্টি করেননি। আর এর কারণ হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “লি তা’লামু আদাদাস সিনীনা ওয়াল হিসাব” অর্থাৎ- “যাতে তোমরা স্থির করতে পার বছরসমূহের গণনা ও হিসাব”।

আর মানব জীবনে এই সমস্ত বিষয় সমূহের আবশ্যকতা যে কতটা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি রাতের পরে দিন আর দিনের পরে রাত না এসে সব সময়ই রাত বা দিন থাকত, তবে মানুষ আরাম ও স্বস্তি লাভের অথবা কাজকর্ম করার সুশৃঙ্খল কোন সুযোগ পেত না। অনুরূপ মাস ও বছরের হিসাব-নিকাশ করতে পারত না, যার উপর মানুষের অসংখ্য বিষয়াদি এবং কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা কাসাছ এর ৭১, ৭২ এবং ৭৩ নং আয়াতের মধ্যে ইরশাদ করেন, যার সারমর্ম হল, “যদি আল্লাহ তায়ালা রাতকে লম্বা করে দিতেন কিয়ামত আসা পর্যন্ত, অর্থাৎ- শুধু রাতই থাকত দিন না হত, তাহলে কে আছে যে দিনের বেলার আলো ফিরিয়ে আনত? (যেই দিনের আলোতে মানুষ তার সমস্ত কাজ আঞ্জাম দেয়)। আর যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দিনকে কিয়ামত পর্যন্ত লম্বা করে দিতেন, অর্থাৎ- যদি এমন করে দিতেন যে, আর কখনো রাত হবে না, তাহলে কে আছে যে রাত নিয়ে আসত? যেই রাতে মানুষ তার সারা দিনের ক্লান্তি ক্লেশ দূর করে আরামের মাধ্যমে। সুতরাং এই দুইটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক মহান নেয়ামত ও রহমত। আর এই সবকিছুই এ জন্য যে, মানুষ আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করে”।

এই রাত্র দিনের ব্যবধান ও পার্থক্যের উপর (অর্থাৎ- দিন, মাস, বছর এর উপর) নির্ভর করে মানুষ তার সমস্ত কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকে। যেমন- নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, বয়সের তারতম্য, ব্যবসার লেনদেন ইত্যাদি। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্য এক জায়গায় ইরশাদ করেন-

অর্থাৎ- “তারা আপনার কাছে চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে! আপনি বলে দিন যে, চাঁদ হল মানুষের জন্য এবং হজ্বের সময় নির্ধারণের মাধ্যম”।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সময় অর্থাৎ রাত্র-দিন এবং তাতে মানুষের কাজ-কর্ম ইত্যাদি উল্লেখ করার পরে মানুষের আমলনামা সম্পর্কে ইরশাদ করেন যে, প্রত্যেক মানুষ তার আমলনামা সে নিজেই বহন করবে, এবং কিয়ামতের দিন তার সামনে তা খুলে দেওয়া হবে। আর সে নিজেই তার নিজের হিসাবের জন্য যথেষ্ঠ হবে।

অর্থাৎ- তার আমলনামা তার সামনে জমা করে দেওয়া হবে এবং সে নিজেই তা পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে যে, তার উপর কোন জুলুম করা হয়নি এবং এমন কোন কিছু লেখা হয়নি, যা সে করেনি। সামান্য পরিমাণ ভাল আমল করলেও তা সেখানে উপস্থিত পাবে এবং সামান্য পরিমাণ খারাপ আমল করলেও তা সেখানে পাবে।

যেমনটি সূরা যিলযালের শেষের দুই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, যার অর্থ- “যে যাররা পরিমাণ ভাল আমল করবে, তাও সে দেখতে পাবে। আর যে যাররা পরিমাণ খারাপ আমল করবে তাও সে দেখতে পাবে”। বান্দার প্রতিদিনের আমল প্রতিদিন আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তার উপর মোহর লাগিয়ে দেওয়া হয়। যেমনটি এক হাদীসে এসেছে, হযরত উক্ববা ইবনে আমের (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “প্রতিদিনের এমন কোন আমল নেই, যার উপর মোহর এঁটে দেয়া হয় না। আর মু’মিন বান্দা যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন ফেরেস্তারা আরয করে- হে আমাদের রব! আপনার অমুক বান্দাকে আপনি অসুস্থ করে দিয়েছেন (যার কারণে সে এখন কোন আমল করতে পারছে না) তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, তার জন্য আগের মত আমল লিখতে থাক যেমনটি তার সুস্থ অবস্থায় লিখতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে সুস্থ না হয় কিংবা মারা না যায়”।

কোন কিছু অস্বীকার করারও কোন সুযোগ থাকবে না। কারণ, সমস্ত কিছু আমল নামায় পুঙ্খানো পুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যেমনটি কিয়ামতের দিন কাফেরদের হতাশার কথা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা কাহাফে উল্লেখ করে বলছেন, “মা লি-হাযাল কিতাবি লা-য়ুগাদিরু ছাগীরাতাঁও ওয়ালা-কাবীরাতান ইল্লা আহসা-হা” অর্থাৎ- কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে যখন কাফেররা তাদের সমস্ত কুকর্মগুলো পুঙ্খানো পুঙ্খভাবে আমল নামায় লিপিবদ্ধ পাবে, তখন আফসোস করে বলতে থাকবে, “হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা! এ তো ছোট-বড় কোন কিছুই বাদ দেয়া হয়নি; সব কিছু এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে”!

কাল কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে মানুষ তার হিসাব-নিকাশের জন্য সে নিজেই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ- তার জন্য অন্য কারো প্রয়োজন পড়বে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ ফরমান- “কাফা বিনাফসিকাল-ইয়াওমা আলাইকা হাসিবা”। অর্থাৎ- তোমার হিসাবের জন্য তুমিই যথেষ্ট”। কেয়ামতের দিন যখন কাফের-মুনাফিকদের ব্যাপারে জাহান্নামের ফায়সালা হয়ে যাবে, তখন তারা তাদের আমলনামা অস্বীকার করবে। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের বাক শক্তি ছিনিয়ে নিবেন এবং তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে তাদের কুকর্মের সাক্ষি নিবেন। যেমনটি এক হাদীসের মধ্যে এসেছে যে, “কিয়ামতের দিন বান্দা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে তর্ক করবে। সে বলবে যে, হে আমার রব! আমাকে কি জুলুমের বদলা দিয়েছেন? আল্লাহ তায়ালা বলবেন যে, হ্যাঁ। তখন সে বলবে যে, আমি এটা মানি না (অর্থাৎ আমি কোন জুলুম-অন্যায় করিনি)। তবে আমি মানবো যদি আমার নিজের নফস থেকে কোন সাক্ষি থাকে তাহলে। তখন আল্লাহ তাবারাক ওয়া তায়ালা বলবেন, আজকে তোমার হিসাবের জন্য তুমিই এবং কিরামান কাতিবীনই যথেষ্ট। অতঃপর তার মুখে মোহর এঁটে দেওয়া হবে, অর্থাৎ- তার বাক শক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে এবং তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে যে, সে কি কি আমল করেছে তা বলার জন্য। তখন সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার দ্বারা কৃত আমলের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবে”। হাত সাক্ষি দিবে যে, তার দ্বারা সে কি কি ধরেছে। পা সাক্ষি দিবে যে, তার দ্বারা সে কোথায় কোথায় গিয়েছে। চোখ সাক্ষি দিবে যে, তার দ্বারা সে কি কি দেখেছে? কান সাক্ষি দিবে যে, তার দ্বারা সে কী কী শ্রবণ করেছে। এমনিভাবে প্রত্যেক অঙ্গ তার দ্বারা কৃতকর্মের পূর্ণ লিস্ট তুলে ধরবে পুঙ্খানো পুঙ্খভাবে। আর এ সম্পর্কেই তো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “আল-ইয়াওমা নাখতিমু আ’লা আফওয়াহিহিম ওয়া তুকাল্লিমুনা আইদিহিম ওয়া তাশহাদু আরজুলুহুম বিমা কা-নু ইয়াকসিবূন” অর্থাৎ “আজকে আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দিব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের আমল সম্পর্কে সাক্ষি দিবে”।

কবি তার ভাষায় খুব সুন্দর করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন-

دست گوید من چنیں دوزدیدہ ام

لب گوید من چنیں بوسیدہ ام

چشم گوید دیدہ ام سوےَ حرام

گوش گوید چیدہ ام سمر الکلام

অর্থাৎ- হাত বলবে আমার দ্বারা এই এই জিনিষ চুরি করেছে, ঠোট বলবে আমার দ্বারা এই এই মিথ্যা ইত্যাদি বলেছে। চোখ বলবে আমার দ্বারা হারাম জিনিষের দিকে নজর করেছে, কান বলবে আমার দ্বারা বেহুদা ও অনর্থক কথা-বার্ত শুনেছে।

সুতরাং আয়াত সমূহ দ্বারা একথাই বুঝা আসে যে, মানুষ ভাল-মন্দ যা কিছু সে করবে তার সব কিছু সে কেয়ামতের ময়দানে দেখতে পাবে এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। কোন প্রকারের জুলুম তার উপর করা হবে না। সুতরাং নাজাতের জন্য কেবলমাত্র নেক আমলই কাজে আসবে সে দিন। তাই আসুন, সকলে সদা-সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসূলের এতাআত করে নিজের জীবনকে ধন্য করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন!


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি