রমযানের ফাযায়েল ও মাসায়েল – মুফতী নূর আহমদ

ঈমানের চাহিদা হল ধর্মপথের ডাকাত নফ্সে আম্মারা তথা প্রবৃত্তিকে দমনের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং রূহ্কে সজীব ও পবিত্র রাখার জন্য সচেষ্ট হওয়া। এ কার্যসিদ্ধির জন্যেই মু’মিনের উপর আল্লাহ্ তাআলা রমযানের রোযা আদায় ফরয করে দিয়েছেন। আর এই রোযার সংজ্ঞা হলো, সুব্হে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকা। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে হায়েয ও নিফাস থেকে পবিত্র থাকার শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।

যেহেতু মানুষের নফস ও আত্মা সাধারণত এগুলোর প্রতিই বেশী আকৃষ্ট ও উৎসাহী হয়ে থাকে, তাই এসব কর্ম পরিত্যাগের দ্বারাই কুপ্রবৃত্তি ও বাসনা দমনের সাধনা সফল হবে এবং অন্তরাত্মা তাজা ও শক্তিমান হবে। আর এভাবে নফসকে তার বিভিন্ন চাহিদা থেকে বিরত রাখার মাধ্যমেই তাক্বওয়া অর্থাৎ সংযমশীলতার ভিত্তি স্থাপিত হবে। যার ফলশ্রুতিতে ক্রমান্বয়ে মুত্তাক্বী অর্থাৎ- খোদাভীরু হয়ে যাবে।

হযরত শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ্.) বলেন, মানুষ যখন সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগে উঠে এবং পঞ্চইন্দ্রীয় সক্রিয় হয়, তখন সে সব কিছুই অবলোকন করে, শ্রবণ করে, আরজু-আকাখা করে এবং স্বজাতীয় অন্যান্যকে পানাহার করতে দেখে, মেয়ে লোকদের মেলামেশা ও তাদের আকার-আকৃতির প্রতি দৃষ্টি নিপতিত হয়। যার কারণে মানুষের মধ্যে সৃষ্টিগতভাবেই তার সমূহ ক্ষুধা নিবৃত্তির মানসে কাম ও প্রবৃত্তি স্পৃহা প্রবল হয়ে উঠে। কিন্তু রাতের অবস্থা তার বিপরীত। অর্থাৎ এসব কিছু অবলোকন করা, শ্রবণ করা, মানুষের স্বাদ আস্বাদনের অবস্থা ইত্যাদি পূর্ণভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। তাই তো রাতকে নিদ্রার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মানুষ রাতের বেলা মৃতের ন্যায় নিদ্রায় বিভোর থাকে। দিনের বেলা যেহেতু বিভিন্ন আকর্ষণীয় জিনিস গোচরীভূত হয় এবং মেয়েলোকের আকার-আকৃতিও দৃষ্টিগোচর হয়, সেহেতু কাম-প্রবৃত্তির চাহিদা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কিন্তু জাগতিক কর্মব্যস্ততার কারণে সে সুযোগ তেমন একটা পায় না। পক্ষান্তরে রাতের বেলা তার পূর্ণ সুযোগ পাওয়া যায়। এজন্যই রাতে স্ত্রীসহবাস ইত্যাদি মানুষের অভ্যাসজনিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ মেয়েলোকের চাল-চলন, উঠা-বসা, তাদের আকার-আকৃতি অবলোকনে এবং গহনাপাতির ঝংকার শ্রবণে পুরুষের প্রবৃত্তি ও কামনার জাগরণ সাধারণত দিনের বেলায়ই হয়ে থাকে। এজন্যই পরওয়ারদিগার দিবসকে রোযার জন্য ধার্য করেছেন, যেন মানুষ কঠোর সাধনার মাধ্যমে দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি ও কামনার সাথে মুকাবেলা করে তাকে পরাস্ত করার অভ্যাস করে নিতে পারে। এর দ্বারা কয়েকটি সৎগুণ অর্জিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। যেমন-

(১) সবর আনিল মা’আসী অর্থাৎ যে সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, সেগুলো মনের জন্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, যত স্বাদেরই হোক না কেন, তা থেকে মনকে বিরত রাখার শক্তি অর্জিত হবে।

(২) সবর আলাত্তায়াত অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সমস্ত কাজের হুকুম করেছেন, সেগুলোর তামীল মনের উপর যত কঠিনই হোক না কেন, তাতে মনকে স্থির রাখা সম্ভব হবে।

(৩) সবর আলাল মাসাইব অর্থাৎ বিপদাপদ ও কষ্টের সময় সবর তথা ধৈর্য ধারণ করা, অধৈর্য না হওয়া এবং দুঃখ-কষ্ট ও সুখ-শাšিকে আল্লাহ্রই পক্ষ থেকে নির্ধারিত মনে করে মন-মস্তিস্ককে সে জন্য অধৈর্য করে না তোলার গুণ লাভ হবে।

উপরোক্ত বিশেষ কয়টি গুণ অর্জিত হবে এই রোযা রাখার দ্বারা, যা হলো তাক্বওয়ার ভিত্তি। এতে ইবাদত ও অভ্যাসের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবে। এজন্যই রাতের বেলা যেহেতু নিদ্রাযাপন ও অমনযোগিতার সময়, তাই তাহাজ্জুদ, তিলাওয়াত ও মুনাজাত ইত্যাদির প্রকৃষ্ট সময় হিসেবে রাতকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রমযানের তারাবীহ্ এবং খতমে কুরআনের সময় রাতকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যেন স্বভাবগত চাহিদা ও শরীয়তের চাহিদার মধ্যে পূর্ণ বিরোধ ফুটে উঠে।

রোযা যেন হিন্দু শাস্ত্রীয় উপবাসের মত হয়ে না যায়। কারণ তারা উপবাসব্রত পালনার্থে দিনের বেলায় ভাত ও রুটি ব্যতীত সর্বপ্রকার ফলমূল ভক্ষণ করে থাকে।

“তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর ফরয করা হয়েছিল।” এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী যুগেও সাধারণতঃ পানাহার এবং স্ত্রীসহবাস করা রোযার দিনে হারাম ছিল। হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত আদম (আ.)এর পর কোন জাতিই রোযার আবশ্যিক বিধান থেকে মুক্ত ছিল না। সুতরাং এ ধারণা করো না যে, রোযা জনিত কষ্ট কেবল উম্মতে মুহাম্মদিয়ার উপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরং এ কষ্ট এজন্য দেওয়া হয়েছে, যেন তোমরা পর্যায়ক্রমে মুত্তাক্বী হয়ে যেতে পার। কারণ, রোযার দ্বারা মানুষের প্রকৃতি প্রিয় ও আকর্ষণীয় বস্তু থেকে বিরত থাকার চর্চা বা অনুশীলন হয়। যদ্বারা অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার শক্তিও অর্জন হয়। তাছাড়া অধিকাংশ গুনাহ্র সূত্রপাত কামভাব এবং ক্রোধ থেকেই হয়ে থাকে।

এতদুভয় শক্তিই রোযার দ্বারা দুর্বল হয়ে কাবু হয়ে যায় এবং যত্রতত্র কাম ও ক্রোধে উন্মত্ত হওয়ার শক্তিও অবশিষ্ট থাকে না। এ জন্যই আমাদের উপর এই ইবাদত নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

“আইয়্যা-মাম মা’দদাত” অর্থাৎ নির্দিষ্ট কয়েকদিন মাত্র; অর্থাৎ খুব বেশীও না আবার খুব কমও না। যদি খুব কম হত, তাহলে কাম ও ক্রোধ দমনে তা তেমন কার্যকরী হত না। আর যদি খুব বেশী হত, তাহলে আদিষ্ট বিষয়সমূহ ও অন্যান্য ইবাদত পালনে মানুষ অসমর্থ হয়ে যেতো। যার ফলশ্রুতিতে তাক্বওয়া অর্জনে ত্রুটি এসে যেতো। এ জন্যই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, আর তা হলো বারো মাসের মধ্যে মাত্র একমাস সময়।

সপ্তাহ ও বৎসরের তুলনায় এক মাসই হলো মাধ্যমিক স্তর। তাছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রসমূহের আবর্তন গতির তিনটি অবস্থা রয়েছে। যথাঃ আহ্নিক গতি, মাসিক গতি ও বার্ষিক গতি। মাসিক গতিটি হলো মধ্যম গতির আবর্তন। সুপ্রসিদ্ধ আরবী প্রবাদ বাক্য, “খাইরুল উমূরি আওসাতুহা” অর্থাৎ “মধ্যম পন্থাই উত্তম” এ নিয়মানুসারেও রোযার জন্য সারা বছরের মধ্যে একমাস সময় যুক্তিযুক্ত।

পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতরণ লাওহে মাহ্ফুয থেকে দুনিয়ার আকাশে বাইতুল ইজ্জতে হয়েছিল। এ আকাশকেই চন্দ্রাকাশ বলা হয়। আর চন্দ্রগতির দ্বারা মাসিক গতির সৃষ্টি হয়। এ মাসিক গতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই পূর্ণ একমাস রোযা পালন নির্দিষ্ট হয়েছে। যার সাথে পবিত্র কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এর প্রকৃত রহস্য আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

তৎসত্ত্বেও একমাস সময় মোটামুটি দীর্ঘ হিসেবে অনেক মানুষ রোগ ও সফরের কারণে কাবু হয়ে যায়। তাই আল্লাহ্ তায়ালা পরবর্তী আয়াত শরীফে তার উত্তর দানের প্রতি ইঙ্গিত করে ইরশাদ করেন যে, এতেও এতটুকু সহজ সাধ্য করা হয়েছে যে, খুব বেশী অসুস্থতা বা সফরের কারণে রোযা পালনে অসমর্থ ব্যক্তিগণের জন্য উক্ত মাসে রোযা না রাখারও অনুমতি রয়েছে। কিন্তু রোযার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর অনাদায়ী রোযার সমপরিমাণ রোযা আদায় করা তার উপর ওয়াজিব।

দ্বিতীয় সহজ পন্থা, যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে তা হলো, রোযা পালনে সামর্থবান ব্যক্তি যদি রোযা না রাখে, তাহলে তার যিম্মায় রোযার ফিদ্ইয়া অর্থাৎ বদলা দেয়া কর্তব্য। তা হলো একজন গরীবকে খানা খাইয়ে দেওয়া বা খানা দিয়ে দেওয়া। আর স্বেচ্ছায় ফিদ্ইয়ার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা খুবই ভাল। যদিও সহজ করণার্থে উক্ত সময়ে রোযা না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু এ অবস্থায় আমাদের জন্য রোযা রাখাই সর্বোত্তম, যদি আমরা রোযার ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে পূর্ণ অবগত থাকি।

মোটকথা, বর্ণিত আয়াত শরীফ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পূর্বের নবীগণের রোযার বিধান মতেও দিনে পানাহার এবং স্ত্রীসহবাস হারাম ছিল। হযরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আ.)এর যামানা পর্যন্ত এ বিধানই জারী ছিল।

তাফ্সীরে আহ্মদী সূত্রে হযরত শাইখ আহ্মদ (রাহ.)এর বর্ণনানুসারে ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে মুসলমানদের উপর রোযা পালনের বিধানগত নিয়ম ছিল পূর্ণ বৎসরে মাত্র একদিন। অর্থাৎ- মুর্হারম মাসের দশম তারিখের রোযা রাখার বিধান ছিল। তারপর এ হুকুম রহিত করে মাসে তিনদিন অর্থাৎ- ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোযা ফরয করা হয়।

অতঃপর এই ফরযিয়্যাত রহিত হয়ে যায় এবং রমযানের রোযা ফরয হয়। কিন্তু এতেও রোযা রাখা বা না রাখার ব্যাপারে ঐচ্ছিকতা প্রদান করা হয়। তবে রোযা না রাখার কারণে প্রতি রোযার বদলা অর্ধ্ব ছা’ অর্থাৎ পৌনে দু’সের গম একজন মিস্কীনকে ফিদ্ইয়া হিসেবে দিয়ে দিতে হবে। যেমন, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আল্লাযীনা ইউতিকূনাহু ফিদ্ইয়াতু ত্বোয়াআমিন।” এরপরও রোযা রাখাকেই উত্তম বলা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালার ঘোষণা- “ওয়াআন তাছমু খাইরাল্লাকুম” অর্থাৎ যদি তোমরা রোযা পালন কর তাহলে তা তোমাদের জন্য উত্তম।

অতঃপর এই ঐচ্ছিকতাও রহিত হয়ে যায় এবং দিনের সাথে রাতেরও কিছু অংশে রোযা রাখার বিধান জারি করা হয়। ইফতারীর পর পানাহার এবং কাম-প্রবৃত্তি ও চাহিদা পূরণের সময় ছিল নিদ্রা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। নিদ্রা গেলেই দ্বিতীয় রোযা শুরু হয়ে যেতো এবং ঐ সময় থেকে পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযা পালন করতে হতো। তার কিছু দিন পর যখন “উহিল্লালাকুম লাইলাতাচ্ছিয়ামার রাফাছা ইলা নিসাঈকুম” আয়াত নাযিল হয়, তখন আলোচ্য হুকুম পুনরায় রহিত করে এতটুকু সুযোগ করে দেয়া হয় যে, ইফ্তারীর পর সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রীসহবাস সবই হালাল।

কেবল সুব্হে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে রোযার জন্যে নির্ধারণ করা হয়। আল্লাহ্ তায়ালা ফরমানঃ “ছুম্মা আতিম্মুস্ সিয়ামা ইলাল্লাইলি” অর্থাৎ সুব্হে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর।

রোযার বিধান প্রত্যেক পয়গাম্বরগণের যামানায় ভিন্ন ভিন্ন ছিল। শাইখুত্ তাফ্সীর হযরত মাওলানা আহ্মদ আলী লাহোরী (রাহ্.)এর বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আদম (আ.)এর উপর প্রত্যেক মাসের তের, চৌদ্দ ও পনের তারিখের রোযা ফরয ছিল। হযরত নহ্ (আ.) সর্বদা রোযা রাখতেন। হযরত দাঊদ (আ.) একদিন পর একদিন রোযা রাখতেন। ইহুদীদের উপর আশুরা (দশই মুহাররম) ও প্রত্যেক শনিবার ছাড়াও আরও কিছুদিনের রোযা ফরয ছিল। হযরত ঈসা (আ.) দু’দিন পর পর রোযা রাখতেন। নাসারাদের উপর বাস্তবে রমযানের রোযাই ছিল ফরয। কিন্তু যখন বেশী গরম ও ঠাণ্ডার সময় রোযা রাখা কষ্টকর হয়ে দেখা দিল, তখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, বসন্তকালে ত্রিশ রোযার স্থলে পঞ্চাশ রোযা রাখবে।

মোটকথা, রোযা যে ফরয তা নতুন কিছু নয়, বরং পূর্বেকার যুগসমূহ থেকে এর প্রচলন চলে আসছে। শেষ পর্যায়ে উম্মতে মুহাম্মদীর উপর যে রোযা ফরয হয়, তাহল রমযানের রোযা। পবিত্র কুরআনের ঘোষণাঃ “রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্যে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিকে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না- যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহ্ তাআলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৮৫)।

উপরোক্ত আয়াত থেকে রোযা ফরয হওয়া ও রমযান মাসের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হল। যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

* আল্লাহ্ তাআলা রমযানের রোযাকে ফরয করেছেন এবং আমি রমযানে রাত্রিজাগরণকে (তারাবীহ্ ও তিলাওয়াতে কুরআনের জন্য আল্লাহর হুকুমে) তোমাদের জন্য সুন্নাত করেছি (যা মুয়াক্কাদাহ্ হওয়ার কারণে পালন করা আবশ্যক)। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রমযানের রোযা রাখে এবং রাত্রি জাগরণ করে, সে ব্যক্তি ঐ দিনের ন্যায় পাপ মুক্ত হয়ে যাবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। (নাসাঈ শরীফ-১/৩০৮)।

* হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “রোযা এবং কুরআন মাজীদ উভয়ই বান্দার সুপারিশকারী অর্থাৎ গুনাহ্ মাফের সুপারিশ করবে। রোযা বলবে হে আল্লাহ্! আমি দিবাভাগে তাকে পানাহার ও স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার জন্যে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন শরীফ বলবে, আমি তাকে রাতে পূর্ণভাবে শয়ন করতে দেইনি। সুতরাং তার জন্যে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- অতঃপর উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।” (মসনদে আহমদ, তবরানী, মিশকাত শরীফ)।

* হযরত সালমান ফারসী (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, শা’বান মাসের শেষ দিন হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে ইরশাদ করেছেন যে, হে মানুষ সকল! তোমাদের সামনে একটি বরকতময় মাস অর্থাৎ রমযান মাস উপস্থিত হয়েছে, যার মধ্যে শবে-ক্বদর নামে একটি রাত রয়েছে। উক্ত রাতটিতে আল্লাহ্র দরবারে ইবাদত করার ফযীলত অন্য সময়ে এক হাজার মাস ইবাদত করার চেয়েও অধিক উত্তম।

আল্লাহ্ তায়ালা এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। রাতের বেলায় ইবাদত অর্থাৎ তারাবীহ্কে ফরযের চেয়ে কম দরজা অর্থাৎ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন। যে ব্যক্তি এ পবিত্র মাসে কোন নফল কাজ করবে এবং আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য তালাশ করবে, তাকে অন্য মাসে কৃত একটি ফরযের সমান সাওয়াব দান করা হবে।

আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে, তাকে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায়ের পরিমাণ সাওয়াব দান করা হবে।

এ মাস কাম-ক্ষুধা, জঠর জ্বালা প্রভৃতির উপর ধৈর্য ধারণের মাস। আর ধৈর্যের পুরস্কার হল বেহেশ্ত। দুঃখ, দারিদ্রক্লিষ্ট লোকদের জ্বালা-যšণা অনুভবের একটি বিশেষ মাস মাহে রমযান। এ মাসে মু’মিনদের আধ্যাত্মিক খাদ্যাভাব দর করে তার মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়। আর এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফ্তার করালো, তা তার গুনাহ্ মাফের উপায় এবং দোযখের আগুন থেকে রেহাই পাবার উসীলা হয়ে যাবে। এবং ঐ ইফ্তারকারীকে রোযাদারের সমান সাওয়াব দান করা হবে। এজন্যে ঐ রোযাদারের সাওয়াবে কোন কমতি করা হবে না।

আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের মাঝে সবাইতো রোযাদারকে তৃপ্তির সাথে ইফ্তার করাতে সক্ষম নন। হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বল্লেন, আল্লাহ্ তায়ালা উল্লিখিত পরিমাণ সাওয়াব তো ঐ ব্যক্তিকে দান করবেন, যে ব্যক্তি রোযাদারকে শুধু এক ঢোক দুধ বা পানি অথবা একটি খেজুর দ্বারা ইফ্তার করাবে।

আর যে ব্যক্তি রোযাদারকে পেট ভরে খানা খাওয়াবে, তাকে আল্লাহ্ তায়ালা আমার হাউজে কাউসার থেকে এরূপভাবে পান করাবেন যে, সে জান্নাতে প্রবেশের পূর্বমুহর্ত পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত বোধ করবে না। যে ব্যক্তি মাহে রমযানে রোযাদার চাকর-চাকরাণীদের দ্বারা কাজকর্ম করাবে না অথবা তুলনামূলক কম করাবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার গুনাহ্সমূহ মাফ্ করে দিবেন এবং দোযখ থেকে নাজাত দিবেন। (বাইহাক্বী, মিশ্কাত শরীফ-১৭৪ পৃষ্ঠা)।

* হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমানঃ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশ্তা রোযাদার ব্যক্তির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। (বাইহাক্বী শরীফ)।

* হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যে ঈমানদার ব্যক্তি মাহে রমযানের রাতে নামায পড়বে (অর্থাৎ তারাবীহ’র নামায পড়বে) আল্লাহ্ তাআলা তার প্রতিটি সিজদার বিনিময়ে দেড় হাজার নেকী প্রদান করবেন। (বাইহাক্বী শরীফ)।

* হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- অনেক রোযাদার এমন আছে, যাদের রোযা দ্বারা (রোযা অবস্থায় হারাম ভক্ষণ, হারাম কর্ম তথা গীবত ও অশ্লীল কথাবার্তা ইত্যাদির কারণে) কেবল পিপাসা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয় না এবং বহু তাহাজ্জুদ গুযারের তাহাজ্জুদ দ্বারা (রিয়া ইত্যাদির কারণে) কেবল রাত্রিজাগরণ ব্যতীত কিছুই অর্জিত হয় না। (বাইহাক্বী, দারমী, মিশ্কাত শরীফ-১৭৭ পৃঃ)।

চাঁদ দেখার শরীয়ত সম্মত বিধান

* মাহে শা’বানের চাঁদের ঊনত্রিশ তারিখে মাহে রমযানের চাঁদ অনুসন্ধান করা ওয়াজিবে কিফায়া। (হিদায়া-১/২১৩ পৃষ্ঠা)।

* আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বা ধুলিময় থাকার কারণে যদি রমযানের চাঁদ পরিদৃষ্ট না হয়, তবে এমন একজন প্রকৃত দ্বীনদার সত্যবাদী লোক এসে যদি সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আমি স্বয়ং রমযানের চাঁদ দেখেছি, তাহলে চাঁদ উদয় হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়ে যাবে। সাক্ষ্যদাতা স্ত্রীলোক হোক বা পুরুষ। (হিদায়া-১/২১৫ পৃষ্ঠা)।

* কিন্তু উপরোক্ত কারণে যদি ঈদের চাঁদ দেখা না যায়, তবে এক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না; তিনি যতই বিশ্বস্ত হোন না কেন। বরং যখন দু’জন বিশ্বস্ত এবং পরহেযগার পুরুষ অথবা একজন দ্বীনদার পুরুষ ও দু’জন দ্বীনদার মহিলা চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদান করবে, কেবল তখনই রমযানের চাঁদ উঠা প্রমাণিত হবে। (হিদায়া-১/২১৬ পৃষ্ঠা)।

* যদি আকাশ সম্পূর্ণ পরিস্কার ও মেঘমুক্ত থাকে, তখন রমযানের হোক কিংবা ঈদের, দু’চার জন ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রদানের দ্বারা চাঁদ উঠা প্রমাণিত হবে না। তবে যদি অনেক ব্যক্তি স্বচক্ষে চাঁদ দেখার কথা সাক্ষ্য দেয় এবং অন্তরও একথার সাক্ষ্য দেয় যে, এতগুলো লোক একত্রে মিথ্যা কথা রটাতে কিংবা গুজব সৃষ্টি করতে পারে না,  তখন চাঁদ উঠা প্রমাণিত হবে। (শরহেবিদায়া-১/২১৬)।

* যে ব্যক্তি শরীয়তের বিধান মত চলে না, বরং শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপে সর্বদা লিপ্ত থাকে, যেমন- মিথ্যা বলে, নামায পড়ে না, রোযা রাখে না, সুদ-ঘুষ খায় ইত্যাদি এমন লোকের কথার কোন বিশ্বস্ততা নেই। এ ধরনের লোক যদি শতবার শপথ করে চাঁদ দেখার স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে, তবুও তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। যদিও এরূপ চরিত্রের দুই বা ততোধিক ব্যক্তি হয়। (হিদায়া, বাহরুর রায়েক্ব-২/২৬৬, র্দুরে মুখ্তার-২/১২৪ পৃষ্ঠা)।

* অনেক সময় দেশব্যাপী এমনভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, গতকাল চাঁদ দেখা গিয়েছে, বহু লোক চাঁদ দেখেছে। কিন্তু তদন্ত করে এমন কাউকে পাওয়া যায় না যিনি স্বচক্ষে চাঁদ দেখেছেন। এরূপ ভিত্তিহীন খবর শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। (শামী-২/১২৯ পৃষ্ঠা)।

* অনেক এলাকায় এরূপ একটি কথার প্রচলন আছে যে, যে বারে রজবের ৪ তারিখ হবে সে বারে রমযানের প্রথম তারিখ হবে। শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই, বরং চাঁদ দেখে রোযা রাখতে হবে এবং চাঁদ দেখে ঈদ করতে হবে। (মিশ্কাত শরীফ-১৬৬)।

* চাঁদ দেখে এরূপ শংসয়মূলক কথাবার্তা বলা অনুচিত যে, চাঁদটা অনেক বড় দেখা যাচ্ছে, এটা মনে হয় গতকালের চাঁদ। এরূপ মন্তব্য করাকে হাদীস শরীফে ক্বিয়ামতের নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাঁদ ছোট বড় হওয়ায় কোন পার্থক্য নেই। অনুরূপ হিন্দু ও গণকদের হিসাব (যেমন আজ দ্বিতীয়া সুতরাং অবশ্যই চাঁদ উঠবে) এবং বৈজ্ঞানিকদের নির্ধারিত সময়ও বিধান সম্মত না হলে শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। মোট কথা, রমযানের চাঁদ ব্যতীত অন্য কোন চাঁদের ব্যাপারে আধুনিক যšপাতি যথাঃ দরবীন, তার, ওয়ারলেস, রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন ইত্যাদির খবরাখবরের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। অবশ্য রমযানের চাঁদের ক্ষেত্রেও কিছু শর্তসাপেক্ষে তা গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু সেখানেও সাবধানতা অবলম্বন শ্রেয়। (কাশ্ফুয্ যুনন-৬০)।

রোযার সংজ্ঞা, তত্ত্ব ও বিধান

* সুব্হে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়্যাতে সব ধরনের পানাহার এবং স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকাকে শরীয়তের পরিভাষায় রোযা বলে আখ্যায়িত করা হয়। (ফাত্ওয়ায়ে আলমগিরিয়্যা-১/৯৯)।

* রমযান শরীফের পুরো মাসের রোযা প্রত্যেক স্বজ্ঞান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, কৃষক-শ্রমিক নির্বিশেষে সবার উপর ফরয। শরীয়ত সম্মত কোন ওযর আপত্তি ব্যতীত রোযা পালন না করা হারাম এবং কবীরা গুনাহ্।

* যে সব দেশে রাত এবং দিন ছয় মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়, অধিকাংশ ফক্বীহ্ ও উলামায়ে কিরামের মতে সেসব দেশের অধিবাসীগণ পার্শ্ববর্তী এরূপ দেশের সাথে মিলে রোযা রাখবে এবং ইফ্তার করবে, যে সব দেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দিবারাত সংঘটিত হয়। একইভাবে প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে এবং প্রতি ওয়াক্ত নামাযের মধ্যখানে এতটুকু সময় বিরতি দিবে যতটুকু বিরতি পার্শ্ববর্তী দেশে দেওয়া হয়। এটাই ফিক্বাহ্ শা¯বিদগণের সর্বস্বীকৃত মত।

* রোযার জন্য নিয়্যাত শর্ত। নিয়্যাত ব্যতীত রোযা শুদ্ধ হবে না। নিয়্যাতের অর্থ হল, মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করা। মুখে উŽচারণ করে নিয়্যাত করা অথবা কিছু বলা জরুরী নয়। তবে অন্তরে ইচ্ছা পোষণের সাথে সাথে মুখেও যদি উŽচারণ করে নিয়্যাত করা হয়, তাহলে তাতে কোন অসুবিধা নেই বরং ভাল। আর সেই নিয়্যাত আরবীতেই হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। (ফাত্ওয়ায়ে আলমগিরিয়্যা-১/১০০)।

* রমযানের রোযার নিয়্যাত শরয়ী দিবসের অর্থাৎ সুব্হে সাদিক থেকে সূর্যা¯ের মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ দ্বিপ্রহরের পূর্বেই হতে হবে। শর্ত হল, সুব্হে সাদিক থেকে নিয়্যাত করার পূর্ব মুহর্ত পর্যন্ত কোন কিছু পানাহার করা যাবে না এবং রোযা ভঙ্গকারী কোন কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া যাবে না। দ্বিপ্রহরের পর নিয়্যাত করলে রোযা আদায় হবে না। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১১৮)।

* অনেকে মনে করেন যে, নিয়্যাত করার পরে খাওয়া দাওয়া করা যাবে না। এই ধারণা সঠিক নয়; বরং সুব্হে সাদিক না হওয়া পর্যন্ত খাওয়া দাওয়াসহ যাবতীয় হালাল কার্যাদি সম্পাদন করা দুরস্ত আছে। আগে নিয়্যাত করা হোক বা না হোক, তাতে কোন অসুবিধা নেই। (সূরা বাক্বারা- ২)।

* আমাদের দেশে যেহেতু রোযা ব্যতীত শেষ রাতে পানাহার করার প্রচলন নেই। তাই রমযানে সাহরী খাওয়াটাই নিয়্যাতের স্থলাভিষিক্ত ধরা হবে। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৩, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১১৬)।

* আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে যদি চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে দ্বিপ্রহরের এক ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত পানাহার না করে অন্য কোন স্থান থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ আসার অপেক্ষা করতে হবে। যদি নির্ভরযোগ্য কোন সংবাদ এসে যায়, তাহলে ঐ অবস্থাতেই রোযার নিয়্যাত করে নিতে হবে। তা না হলে পানাহার করে নিতে হবে। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৩, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১২১ পৃষ্ঠা)।

* কারো যদি সোম, বৃহস্পতি বা অন্য কোন নির্দিষ্ট বারে রোযা রাখার অভ্যাস থাকে এবং ঘটনাক্রমে সেই নির্দিষ্ট দিনটি ৩০ শা’বান পড়ে যায়, তাহলে সেদিন নফলের নিয়্যাতে রোযা রাখা তার জন্য উত্তম। অতঃপর যদি চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়া যায়, তাহলে সেই নফল রোযা দ্বারাই রমযানের ফরয রোযা আদায় হয়ে যাবে। (র্দুরে মুখ্তার, শামী-২/১২০, হিদায়া-১/২১৪  পৃষ্ঠা)।

সাহরীর আহ্কাম

* হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমাদের রোযা আর ইহুদী-নাসারাদের রোযার মধ্যে পার্থক্য হল সাহরী খাওয়া। (মিশকাত শরীফ-১৭৫ পৃঃ)। ইহুদী ও নাসারারা রোযা রাখার প্রাক্কালে সাহরী খায় না, অথচ আমরা খাই। এজন্যেই আমাদের রোযার ক্ষেত্রে সাহরী খাওয়া সুন্নাত।

* হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা সাহরী খাও। কেননা, সাহরী খাওয়ার মধ্যে অনেক বরকত রয়েছে। (মিশ্কাত, বুখারী, হিদায়া-১/২২৫  পৃষ্ঠা)।

* সাহরীতে উদরপূর্তি করে খাওয়া জরুরী নয়। এক দুই গ্রাস খাবার কিংবা একটি খেজুর গ্রহণ কিংবা যৎকিঞ্চিত পানি পান করলেও সাহরী খাওয়ার সাওয়াব অর্জন হয়ে যাবে। (হিদায়া, বাহরুর রায়েক্ব-২/২৯২  পৃষ্ঠা)।

* সাহরী যতদুর সম্ভব দেরী করে রাতের শেষ ভাগে অর্থাৎ সুব্হে সাদিকের কিছুক্ষণ পূর্বে খাওয়া উত্তম। তবে এত দেরীও করা যাবে না, যাতে রোযার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যায়। (তবরানী, হিদায়া-১/২২৫)।

* অনেকে মধ্যরাতেই খাওয়া দাওয়া সম্পন্ন করে থাকেন। এতে সাহরী খাওয়ার পুরো সাওয়াব পাওয়া যাবে না। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ্)।

* কখনো যদি সুবহে সাদিক হওয়ার আগেই মুয়ায্যিন সাহেব আযান দিয়ে দেন অথবা মোরগ ডেকে উঠে, তাহলে তখন সাহরী খাওয়া নিষেধ নয়। সুব্হে সাদিক না হওয়া পর্যন্ত বিনা দ্বিধায় পানাহার করা যাবে। (সূরা বাক্বারা, ফাত্ওয়ায়ে দারুল উলম)।

* কখনো যদি সুব্হে সাদিক হয়ে গেল কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে তখন সাহরী খাওয়া মাকরূহ্। তদুপরি এরূপ সন্দেহজনক অবস্থায় কেউ যদি সাহরী খেয়ে নেয় এবং পরে জানতে পারে যে, সাহরী খাওয়ার সময় সুব্হে সাদিক হয়ে গিয়েছিল, তাহলে সে ঐদিনের রোযা ভাঙতেও পারবে না এবং তার ক্বাযাও করতে হবে। কিন্তু যদি পরবর্তীতে এব্যাপারে সঠিকভাবে কিছু জানা না যায়, বরং সন্দেহই থেকে যায়, তাহলে ক্বাযা আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে সতর্কতামূলক ক্বাযা করে নেওয়া উত্তম। (হিদায়া-১/২২৫)।

ইফ্তারের আহ্কাম

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যতদিন মানুষ (সূর্যা¯ের সাথে সাথে অনতিবিলম্বে) ইফ্তার করবে, ততদিন পুণ্যের উপর স্থির থাকবে। অর্থাৎ সূর্যা¯ের সাথে সাথেই ইফ্তার করা বাঞ্ছনীয়। (বুখারী ও মুসলিম)।

* রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলাম ধর্ম ততদিন পর্যন্ত প্রবল থাকবে যতদিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফ্তার করবে। কারণ, ইহুদী-নাসারারা ইফ্তারীতে বিলম্ব করে। (আবুদাঊদ, ইব্নে মাজাহ্, মিশ্কাত শরীফ)। সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে ইফ্তার করা মুস্তাহাব, দেরী করা মাকরূহ্। (ফাত্ওয়ায়ে শামী, আলমগিরিয়্যা-১/১০২)। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে সাবধানতা বশতঃ কিছুক্ষণ বিলম্ব করা উত্তম।

* নিশ্চিতরূপে সূর্যাস্ত হওয়ার পরেও শুধুমাত্র এ কারণে বিলম্বে ইফ্তার করা যে, এখনও দিনের আলো রয়ে গেছে- অন্ধকার হয়নি বা শরীরের রোম এখনও দেখা যাচ্ছে কিংবা সাইরেন বাজেনি অথবা ক্যালেণ্ডারের সময়সূচী অনুযায়ী এখনও ইফ্তারের সময় হয়নি প্রভৃতি, তাহলে মাকরূহ্ হবে। কেননা, এতে হাদীসের দৃষ্টিতে বিধর্মী অর্থাৎ ইহুদী-নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য হয়।

ইফ্তারের দোয়া

* রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফ্তারের সময় এ দোয়াটি পড়তেনঃ “আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়াআলা রিয্ক্বিকা আফ্তারতু”।

* রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফ্তার গ্রহণান্তে এ দোয়াটি পড়তেন- “যাহাবায্ যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু ওয়াছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহু তায়ালা”।

রোযার মুস্তাহাবসমূহ

* সাহরী খাওয়া, * সাহরী রাতের শেষভাগে খাওয়া। শর্ত হচ্ছে, সুব্হে সাদিকের পূর্বেই খাওয়া শেষ করতে হবে, * সূর্যাস্ত নিশ্চিত হলে ইফ্তার করতে বিলম্ব না করা, * মিসওয়াক করা, * ইফ্তারের সময় মাসনন দোয়া পাঠ করা, * খোরমা, খেজুর, মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য অথবা শুধু পানি দিয়ে ইফ্তার করা। (ফাত্ওয়ায়ে আলমগিরিয়্যা-১/১০২, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৫৭ পৃষ্ঠা)।

রোযার মাকরূহ্সমূহ

* আঠালো বস্তু চিবানো বা কোন কিছু মুখে পুরে রাখা, * বিনা প্রয়োজনে কোন কিছু চিবানো বা কোন কিছুর স্বাদ আস্বাদন করা। তবে যদি কোন মহিলার স্বামী বদমেজাজী হয়, তবে তার কথা ভেবে তরকারীর স্বাদ বোঝার জন্য জিহ্বায় ঝোল নিয়ে পরীক্ষা করা জায়েয, * শৌচক্রিয়া সম্পাদনের সময় দুই পা অতিরিক্ত বিস্তৃত করে বসা এবং কুলি করার ও নাকে পানি দেওয়ার সময় অসতর্ক থাকা। * মুখে থুথু জমা করে গলাধঃকরণ করা, * গীবত করা, মিথ্যা বলা ও গালিগালাজ করা, * অস্থিরতা, ভীরুতা ও কাতরতা প্রকাশ করা, *  কয়লা চিবিয়ে বা যে কোন ধরনের মাজন, পেষ্ট দিয়ে দাঁত মাজা, * পানির নীচে বায়ু ত্যাগ করা, * স্ত্রীকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা, যদি বীর্যপাত বা সহবাসে লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে, * অনুরূপ স্ত্রীর সাথে উলঙ্গ অবস্থায় আলিঙ্গন করা। (ফাত্ওয়ায়ে হিন্দিয়্যা-১/১০২), * বিনা প্রয়োজনে নিজের মুখে কোন কিছু চিবিয়ে শিশুর মুখে দেওয়া। (রদ্দুল মুহ্তার)। সবিশেষ উল্লেখ্য, রোযা রেখে গুল ব্যবহার করা মাকরূহ্। গুলের কোন অংশ মুখের লালার সঙ্গে মিশে গলার ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।

যে সব কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না

* ভুলবশতঃ পানাহার এবং স্ত্রী সহবাসের দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয় না। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৩  পৃষ্ঠা)।

* কেউ যদি রোযা অবস্থায় ভুলবশতঃ পানাহার করতে থাকে এবং সে ব্যক্তি সুস্থ ও সবল হয়, তাহলে তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া আবশ্যক। আর যদি এমন দুবর্ল হয় যে, রোযা পূর্ণ করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হবে বলে মনে হয়, তাহলে স্মরণ না করিয়ে খেতে দেওয়া জায়েয। (আলমগিরি-১/১০৩)।

* অনিচ্ছাকৃতভাবে গলার মধ্যে ধুলা, ধোঁয়া বা মশামাছি ইত্যাদি প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হয় না। (র্দুরে মুখ্তার-২/১৩ পৃষ্ঠা)।

* আটা, তামাক ইত্যাদি চূর্ণ করার সময় এসবের গুঁড়া গলার ভিতর প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হয় না। (হিন্দিয়্যা-১/১০৪)।

* চোখে সুরমা, শরীর ও মাথায় তৈল ব্যবহার করলে, সুগন্ধীফুলের ঘ্রাণ নিলে, কানে পানি প্রবেশ করলে, অনিচ্ছাকৃত বমি হলে, মুখে এসে আবার নিজে নিজেই গলদেশে চলে গেলে, স্বপ্নদোষ হলে ইত্যাদি অবস্থাগুলোতে রোযা ভঙ্গ হয় না। (র্দুরে মুখ্তার, শামী-২/১৩৩, হিন্দিয়্যা-১/১০৪)।

* নাকের সর্দি জোরে উপর দিকে টানার ফলে গলদেশে চলে গেলে, অনুরূপভাবে মুখের লালা গিলে ফেল্লে রোযা ভঙ্গ হয় না। (মারাক্বিউল ফালাহ্, হিন্দিয়্যা-১/১০৪  পৃষ্ঠা)।

* মিসওয়াক করা বা অন্য কোন কারণে দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত বের হয়ে গলদেশে প্রবেশ না করলে রোযা ভঙ্গ হয় না। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৪)।

* রাতে স্বপ্নদোষ হওয়ার পর সুব্হে সাদিকের আগে গোসল না করলে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। এমনকি সারাদিন গোসল না করলেও রোযা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু এই গোসল না করার জন্যে অবশ্যই গুনাহ্গার হতে হবে। (র্দুরে মুখ্তার-২/১৩৮  পৃষ্ঠা)।

* যে কোন প্রকার ইনজেক্শন দেয়ার কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না। (কালিমাতুল ক্বওম, আলাতে জাদীদাহ্-৮৪ পৃঃ)।

* কোন মহিলাকে দেখা বা তাকে নিয়ে কুচিন্তা করার কারণে বীর্যস্খলন ঘটলে রোযা নষ্ট হয়না। (হিন্দিয়্যা-১/১০৫)।

যে সব কারণে রোযার ক্বাযা ওয়াজিব

* কেউ জবরদস্তিমূলক রোযাদারের মুখে কোন কিছু প্রবেশ করানোয় তা কণ্ঠনালী দিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং এর ক্বাযা ওয়াজিব হবে। তদ্রুপ রোযার কথা স্মরণ থাকা সত্ত্বেও গোসল অথবা কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠনালী দিয়ে পানি প্রবেশ করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১৩০  পৃষ্ঠা)।

* পাথরের টুকরো, ফলের আঁটি, মাটি বা কাগজের টুকরো ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেল্লে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১৩০ পৃষ্ঠা)।

* দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা কোন কিছু জিহ্বা দিয়ে বের করে বহির্মুখে না এনে গিলে ফেল্লে এবং তা আকারে চানাবুটের সমান বা তার চেয়ে বড় হলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি সেটাকে মুখের বাইরে এনে তারপর গিলে ফেলে, তাহলে সেটা আকারে চানাবুটের চেয়ে বড় বা ছোট হোক, রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (কাফী, হিন্দিয়্যা-১/১০৪)।

* দাঁতের গোড়া থেকে বের হওয়া রক্ত গিলে ফেল্লে এবং রক্তের পরিমাণ থুথু অপেক্ষা বেশী বা সমান হলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১০৪)।

* মুখে আসা বমি ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় গিলে ফেল্লে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১০৪  পৃষ্ঠা)।

* স্ত্রীকে চুম্বন, আলিঙ্গন, করমর্দন করার কারণে বীর্য স্খলন ঘটলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১০৫  পৃষ্ঠা)।

* ভুলবশতঃ পানাহার করার পর রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে পুনরায় কিছু পানাহার করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১০৫ পৃষ্ঠা)।

* সুব্হে সাদিক হয়নি ভেবে সাহরী খাওয়ার পর জানা গেল যে, সুব্হে সাদিক হয়ে গেছে, তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যা-১/১০৩, হিদায়া-১/২২৫)।

* আকাশ মেঘাচ্ছন্ন অথবা ধুলিময় হওয়ার কারণে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে ইফতার করার পর দেখা গেল তখনো সূর্যাস্ত হয়নি, তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (হিদায়া-১/২২৫)।

* ইচ্ছা করে আগর বাতির ধোঁয়ার ঘ্রাণ নিলে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং তার ক্বাযা করা ওয়াজিব। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৩৩)। প্রকাশ থাকে যে, রমযান মাসে ঘটনাক্রমে কারো রোযা নষ্ট হয়ে গেলেও পানাহার করা বৈধ নয়, বরং সারাদিন রোযাদারের ন্যায় উপবাস থাকা ওয়াজিব। (মারাক্বিউল ফালাহ্-৩৭০)।

যে সব কারণে রোযার ক্বাযা ও কাফফারা দু’টোই ওয়াজিব

* পবিত্র রমযানে রোযা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া দাওয়া করা অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া কিংবা কোন কিছু উপভোগ করা। যেমন, প্রেমাস্পদের মুখের লালা কোন প্রেমিকের কাছে পরম সুস্বাদু হেতু গলাধঃকরণ করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং ক্বাযা ও কাফ্ফারা দু’টোই ওয়াজিব হবে। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৫, হিদায়া-১/২২৬, শামী-২/১৪৮, হিন্দিয়্যা-১/২২৬)।

* বিড়ি-সিগারেট-তামাক প্রভৃতি সেবনে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং ক্বাযা কাফ্ফারা দু’টোই ওয়াজিব হবে। কাফ্ফারা শুধু রমযান মাসের ফরয রোযা ভঙ্গ করার কারণে ওয়াজিব হয়। অন্য কোন রোযা ভাঙ্গার কারণে কাফ্ফারা ওয়াজিব হয় না, কেবল ক্বাযা ওয়াজিব হয়। যদিও সেটা হয় রমযানেরই ক্বাযা রোযা। (ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৩৪, হিদায়া-১/২২০)।

কাফ্ফারাঃ রোযার কাফ্ফারা হল একটি রোযার পরিবর্তে একটানা দু’মাস (৬০ দিন) রোযা পালন করা। দু’মাস রোযা রাখার শারীরিক সামর্থ না থাকলে ৬০জন পূর্ণ প্রাপ্তবয়ষ্ক কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের কাছাকাছি বয়সী মিসকীনকে দু’বেলা পেট ভরে খানা খাওয়াতে হবে। অথবা ৬০ জন মিসকীনকে মাথাপিছু পৌনে দু’সের গম অথবা তার মূল্য বাবত টাকা কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের যে কোন বস্তু দিতে হবে। (হিন্দিয়্যা-১/১১০, র্দুরে মুখ্তার-২/৮০১)।

যে সব কারণে রোযা না রাখা এবং রেখে থাকলে ভঙ্গ করা জায়েয

* ফরয রোযা অসহ্য কষ্ট কিংবা বিশেষ ওজর ব্যতীত ভঙ্গ করা নাজায়েয। তবে যদি হঠাৎ এমন কোন কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যে, মুসলমান দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে রোযা না ভাঙলে প্রাণনাশের আশঙ্কা হয় বা রোগ আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়, তাহলে রোযা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয। (হিন্দিয়্যা-১/১০৬)।

* অনুরূপ দ্বীনদার অভিজ্ঞ ডাক্তার ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাধারণ মানুষের মতে গর্ভবতী মহিলার যদি এমন কোন অবস্থা দেখা দেয় যে, নিজের বা বাŽচার প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়, তাহলে রোযা ভঙ্গ করা জায়েয। (হিন্দিয়্যা-১/১০৬, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৫৯)।

* স্বীয় বাসস্থান থেকে পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে ৪৮ মাইল বা তার চেয়ে দরবর্তী স্থানে গমনকে শরীয়তের পরিভাষায় সফর বলে। এরূপ সফরকারী মুসাফিরের জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তবে সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ক্বাযা করতে হবে। (আলমগিরিয়্যা-১/১০৬, ফাত্ওয়ায়ে শামী-২/১৫৯)।

তারাবীহ্

নারী পুরুষ উভয় শ্রেণীর মুসলমানের জন্য ঈশা’র ফরয ও সুন্নাতের পর ২০ রাকাআত তারাবীহ’র নামায পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্। পুরুষদের জন্য জামাআতের সাথে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। তারাবীহ’র সময় হল ঈশা’র নামাযের পর থেকে সুব্হে সাদিক পর্যন্ত। তারাবীহ’র নামায বিতির নামাযের পূর্বে যেমন পড়া যায় পরেও পড়া যায়। দুই দুই রাকাআতে দশ সালামের সাথে পড়া উত্তম এবং প্রতি চার রাকাআত অন্তর চার রাকাআত নামায আদায় করা যায় পরিমাণ সময় অথবা কিছু কমবেশী সময় বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব, তবে জরুরী নয়। এ সময় নিজেদের ইচ্ছামত চুপ করে বসেও থাকা যেতে পারে অথবা তাসবীহ্-তাহ্লীল আদায় কিংবা কোন মাসনন দোয়াও পড়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, আমাদের দেশে এ সময়ে ব্যাপকভাবে পঠিত- “সুবহানাযিল মুলকি ওয়াল মালাকূতি…..” দোয়াটি সহীহ্ রিওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত নয়। (র্দুরে মুখ্তার, হিন্দিয়্যা-১/৬০)।

* বিনা পারিশ্রমিকে তারাবীহ্তে কোন হাফেয সাহেব যদি কুরআন শোনাতে চায়, তবে পুরো রমযানের তারাবীহ্তে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা সুন্নাত। (শামী, আলমগিরিয়্যা, দারুল উলম দেওবন্দ)।

* টাকা পয়সার লোভে যদি কোন হাফেয নামায পড়াতে চায়, তবে তদাপেক্ষা ঐ ইমাম উত্তম, যে কেবল সূরা তারাবীহ্ পড়াতে সক্ষম। পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে (মুখে নির্ধারণ করা হোক কিংবা প্রথাগতভাবে নির্ধারিত হোক) কুরআন মাজীদ শুনলে ইমাম-মুক্তাদী কারো সাওয়াব হবে না। (যাওয়ালুŽিছনাহ্-১৩ পৃঃ)।

 

লেখকঃ প্রখ্যাত ও প্রবীণ মুফতী,  ইসলামী গবেষক ও বিভাগীয় প্রধান, ফাত্্ওয়া বিভাগ, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি