ঈদের আহকাম ও মাসায়েল – মুফতী জসীমুদ্দীন

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ও মহান ইবাদতের দু’টি দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় গমন করে এখানকার লোকদেরকে দু’দিন আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠতে লক্ষ্য করেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) এ ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তারা বলেন, জাহেলী যুগে এ দু’দিন আমরা আনন্দ-উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন- আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্যে এ দু’দিনের চেয়ে উত্তম দু’টি দিন দিয়েছেন- ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এ বিষয়ে মুসনাদে আহমদ ও সুনানু আবী দাঊদে সহীহ সনদে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটির আরবী পাঠ নিম্নরূপ-

عن أنس قال قدم رسول الله صلى الله عليه وسلم المدينة ولهم يومان يلعبون فيهما فقال ما هذان اليومان قالوا كنا نلعب فيهما في الجاهلية فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله قد أبدلكم بهما خيرا منهما يوم الأضحى ويوم الفطر

‘হযরত আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা বছরে দু’টি দিন খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকেন। তিনি (সা.) জিজ্ঞেস করেন, এই দু’টি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এ দু’দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দু’ দিনের বিনিময়ে অন্য দু’টি উত্তম দিন দান করেছেন। আর তা হলো- কুরবানী ও রোযার ঈদের দিন (ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর)।’ (সুনানু আবী দাঊদ, বাবু সালাতিল ঈদাইন)।

মুসলমানগণ গোটা রমযান মাস রোযা-আত্মসংযম, ধৈর্য-সহ্য, ইবাদত-বন্দেগী এবং আত্মসংশোধনের ব্যস্ততায় অতিবাহিত করে থাকেন। তাই স্বভাবতই সবাই ঈদের চাঁদের জন্যে বেশ অধীর হয়ে থাকেন। ঊনত্রিশ তারিখের সূর্য ডোবার সাথে সাথেই সব মুসলমানের দৃষ্টি ও মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে যায় আকাশের বুকে। সব বয়সী মানুষ চাঁদের তালাশে মেতে উঠেন। চাঁদ দেখার সাথে সাথে চতুর্দিকে পড়ে যায় আনন্দের ঢেউ। একে অপরকে ঈদ মোবারক জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কাছে থাকলে সরাসরি, দূরে থাকলে মোবাইলে ফোন কল বা এসএমএস দিয়ে চলতে থাকে মোবারকবাদ।

অপরদিকে ১০ যিলহজ্ব হজ্ব পালনের মাধ্যমে ফুটে উঠে খোদাপ্রেমের এক অপূর্ব স্বর্গীয় দৃশ্য। আর কুরবানী করার মাধ্যমে প্রকাশ পায় আত্মসমর্পণ। এ দিনই হলো, ঈদুল আযহা।

ঈদের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার শর্তাবলী

আকাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে বড় একটা জামাআতের ঈদের চাঁদ দেখা শর্ত। আকাশ পরিষ্কার থাকার ক্ষেত্রে শুধু দু’জন মুসলিম পুরুষ কিংবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার খবর বা সাক্ষ্য দ্বারা চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে না। আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে ঈদের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার জন্যে কমপক্ষে দু’জন মুসলিম পুরুষ কিংবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা সাক্ষীর সাক্ষ্য আবশ্যক। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-

‘হযরত হুসাইন ইবনুল হারেস আল-জাদালী (রাহ.) বর্ণনা করেন, মক্কা শরীফের আমীর (হারেস ইবনু হাতিব রাযি.) খুতবায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে চাঁদ দেখে কুরবানী করার ওসিয়াত করেছেন। আর কারণ বশতঃ চাঁদ না দেখা গেলে এবং দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিলে, তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যেন কুরবানী করি’। (সুনানু আবী দাঊদ, হাদীস নং- ২৩৩১)।

উক্ত হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ঈদের চাঁদ স্পষ্টভাবে দেখা না গেলে দু’জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রদান আবশ্যক। শুধু তাই নয়; বরং সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্যে তাদের মাঝে নিম্নবর্ণিত গুণগুলো থাকাও আবশ্যক। যথা- ১. মুসলমান হওয়া। ২. প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়া। ৩. আক্বেল অর্থাৎ সুস্থ বিবেকসম্পন্ন হওয়া। ৪. দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন হওয়া। ৫. আদেল অর্থাৎ- ন্যায়পরায়ণ হওয়া।

এটা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যা সব ধরনের সাক্ষীর ক্ষেত্রেই বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বর্তমান যামানায় বাস্তব অর্থে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই যদি সব জায়গায় আদেল হওয়ার শর্ত লাগানো হয়, তাহলে মানুষের দৈনন্দিন অনেক সমস্যার সমাধান দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। এজন্যে প্রয়োজনের তাগিদে বিচারক ফাসেককে নির্ভরযোগ্য মনে করলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করে ফায়সালা দিতে পারেন। তবে এরূপ করা বিচারকের জন্যে আবশ্যক নয়। ৬. তার কথার মাঝে ‘সাক্ষ্য দিচ্ছি’ শব্দ বিদ্যমান থাকা। ৭. স্বচক্ষে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দেয়া। শুধুমাত্র শোনা খবরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ৮. সাক্ষ্যদাতা বিচারক বা কাযী কিংবা গ্রহণযোগ্য হেলাল কমিটি অথবা বিজ্ঞ কোনো মুফতী-আলিমের দরবারে হাজির হওয়া, অন্যথায় সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ, ৩/৪৭১-৪৭৪, মাকতাবা দারুল উলূম করাচী, পাকিস্তান)।

কোনো দেশে শরয়ী বিচারক না থাকলে বিচারকের বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞ মুফতী ও মুহাক্কীক আলিম উলামাসহ ন্যায়পরায়ণ মুসলমানদের অংশগ্রহণে একটি হেলাল কমিটি গঠন করা যেতে পারে। অথবা ওই এলাকার গ্রহণযোগ্য মুফতীর নিকট পত্র প্রেরণ করবে, যাতে নির্ভরযোগ্য আলেম ওলামা থাকবেন। আর সাক্ষীগণ তাদের সামনে সাক্ষ্য দিলে নিজ এলাকার জন্যে চাঁদ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ- ৩/৪৭৫, মাকতাবা দারুল উলূম করাচী, পাকিস্তান)।

ঈদের রাত্রের ফযীলত

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত- ঈদুল ফিতরের রাত আগমন করলে আসমানে তার নাম লাইলাতুল জায়েযা অর্থাৎ- পুরষ্কারের রাত বলে ঘোষণা করা হয়। ঈদের দিন সকালে আল্লাহ তাআলা  ফেরেশতাগণকে প্রতিটি শহরে প্রেরণ করেন। তারা যমীনে অবতরণ করে সমস্ত অলি-গলি ও রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে জীন ও ইনসান ব্যতীত সমস্ত মাখলুক  শুনতে পায় এমন আওয়াজে ঘোষণা করতে থাকেন যে- হে মুহাম্মদ (সা.)এর উম্মত! ওই দয়ালু রবের দরবারের দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যিনি অনেক বেশি দানকারী এবং অনেক বড় বড় অন্যায় ক্ষমাকারী।

অতঃপর লোকেরা যখন ঈদগাহের দিকে রওয়ানা হয়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাগণকে জিজ্ঞেস করেন, যে মজদুর নিজের দায়িত্ব পরিপূর্ণরূপে আদায় করেছে তার প্রতিদান কি হতে পারে? ফেরেশতাগণ আরয করেন, হে আমাদের মাবুদ এবং আমাদের মালিক! তার কর্মের যথাযথ ও পুরো পারিশ্রমিক দান করাই হলো তার প্রতিদান। তখন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, হে ফেরেশতাগণ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাদেরকে রমযানের রোযা ও তারাবীর বিনিময়ে আমার সন্তুষ্টি ও মাগফেরাত দান করলাম।

্আল্লাহ বান্দাগণকে  সম্বোধন করে ইরশাদ করতে থাকেন, হে আমার বান্দাগণ! আমার নিকট চাও, আমার ইজ্জতের কসম, আমার মর্যাদার কসম, অদ্যকার এই সমাবেশে আখিরাতের ব্যাপারে আমার নিকট যা কিছু চাইবে তাই দান করবো। আর দুনিয়ার বিষয়ে যা সাওয়াল করবে তাতে তোমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখবো। আমার ইজ্জতের কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমার খেয়াল রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের অন্যায়সমূহকে গোপন রাখব। আমার ইজ্জত ও মর্যাদার কসম তোমাদেরকে (কাফিরগণের) সম্মুখেও অপদস্ত করবো না। এখন তোমরা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ অবস্থায় গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। তোমরা আমাকে রাজি করেছ। আমিও তোমাদের প্রতি রাযি হয়ে গেলাম।

অতএব, ফেরেশতাগণ ইফতারের দিনগুলিতে (রমযানে) এই উম্মতের যে আরজ ও সাওয়াব লাভ হয়, তা দেখে খুশি ও আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে।

ইসলামে দুই ঈদের রাত সেসব রাতসমূহের মধ্যে পরিগণিত, যেসব রাতে বিশেষভাবে ইবাদতের জন্যে জাগ্রত থাকার উৎসাহ দেয়া হয়েছে। হুযূর (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে ইবাদতের মাধ্যমে জাগ্রত থাকবে, তার ক্বলব সেদিনও মরবে না যেদিন অন্যান্য সকলের ক্বলব মরে যাবে। অর্থাৎ- কিয়ামতের দিন যখন সকল মানব ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় মুহ্যমান হয়ে পড়বে, তখন ওই ব্যক্তির কোনো অস্থিরতা থাকবে না। কাজেই দুই ঈদের মর্যাদাপূর্ণ রাতটির প্রতি আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত।

ঈদের আহকাম

মাসআলা : মুসলমান প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর ঈদের নামায ওয়াজিব।

মাসআলা : জুমআর নামাযের জন্যে যেসব শর্ত আবশ্যক, দুই ঈদের নামাযের জন্যেও তা জরুরী। (১) মুসলমান, প্রাপ্তবয়স্ক, পুরুষ ও স্থানীয় বাসিন্দা হওয়া। (২) শহর বা শহরতলী বা বড় গ্রাম হওয়া। (৩) খুত্বা পড়া। (৪) বাদশাহ বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকা। (বর্তমানে ওলামায়ে কেরাম তার স্থলাভিষিক্ত হবেন)। (৫) জামাতে নামায আদায় করা। (৬) সর্বস্তরের লোক জামাতে শরীক হওয়ার অনুমতি থাকা। (৭) নির্ধারিত সময়ে নামায আদায় করা।

কিন্তু জুমআর নামাযের খুত্বা ওয়াজিব, আর দুই ঈদের নামাযের খুত্বা সুন্নাত। জুমআর খুত্বার মতো দুই ঈদের খুত্বা শোনা ওয়াজিব। খুত্বা চুপ করে মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে। খুত্বা চলাকালীন কথাবার্তা বলা, চলা-ফেরা করা, নামায পড়া বা দোয়া করা সবই হারাম। জুমআর খুত্বা নামাযের পূর্বে আর ঈদের খুত্বা নামাযের পরে।

ঈদের নামাযের সময় : সূর্য আনুমানিক এক খুঁটি পরিমাণ উঁচু হওয়া থেকে সূর্য ঢলার পূর্ব পর্যন্ত। এরপর ঈদের নামায শুদ্ধ হবে না। অর্থাৎ সকালে সূর্য উদয় হওয়ার ১৫/২০ মিনিট পর থেকে সূর্য স্থির হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১১, মাকতাবাতুল ইত্তেহাদ)।

ঈদের দিনের কয়েকটি আমল

(১) শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে যথাসাধ্য সুসজ্জিত হওয়া এবং খুশি প্রকাশ করা; (২) গোসল করা; (৩) মিসওয়াক করা; (৪) যথাসম্ভব উত্তম কাপড় পরিধান করা। চাই তা নতুন হোক বা পরিষ্কার করার মাধ্যমে হোক; (৫) খোশবু লাগানো; (৬) অতি সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া; (৭) ফজরের নামাযের পরই অতি ভোরে ঈদগাহে যাওয়া; (৮) ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে খোরমা অথবা অন্য কোনো মিষ্টি দ্রব্য খাওয়া। কোরবানীর ঈদে না খেয়ে যাওয়া; (৯) ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সদকায়ে ফিত্রা আদায় করা; (১০) ঈদের নামায মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে গিয়ে পড়া। অর্থাৎ- বিনা ওযরে শহরের মসজিদে না পড়া; (১১) ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা; (১২) ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া; (১৩) ঈদগাহে যাওয়া-আসার সময় আস্তে আস্তে তাকবীর বলতে বলতে যাওয়া। কিন্তু কোরবানীর ঈদে উচ্চস্বরে বলা। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১০-২১১, মাকতাবায়ে ইত্তেহাদ)।

ঈদের তাকবীর : “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ”। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১৩, মাকতাবায়ে ইত্তেহাদ)।

ঈদের নামায আদায় করার নিয়ম

প্রথমে মনে মনে বা মুখ দ্বারা এ নিয়ত করবে যে- অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সঙ্গে ইমামের পিছনে ঈদের ওয়াজিব দু’রাকাত নামায আদায় করছি, কিংবা ঈদের নামায পড়ছি। তারপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ইমাম ও মুক্তাদীকে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে নাভীর নিচে হাত বাঁধতে হবে এবং ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা’ তথা ছানা পড়বে। এরপর ‘আউযুবিল্লাহ’ না পড়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীর দিয়ে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিবে এবং চতুর্থ তাকবীর দিয়ে হাত বেঁধে নিবে। তারপর ‘আউযুবিল্লাহ’ ও ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে সূরা ফাতেহা ও অন্য আরেকটি সূরা পড়ে অন্যান্য নামাযের মতো রুকু সিজদা করবে। তথা অন্যান্য নামায যেভাবে আদায় করতে হয় অনুরূপ আদায় করতে হবে।

প্রত্যেক তাকবীরের পর ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা যায় পরিমাণ সময় চুপ থাকতে হবে। দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কিরাতের পর ইমাম সাহেব যখন তাকবীর বলবেন তখন ইমামের সাথে সাথে তাকবীর বলে ১ম, ২য় ও ৩য় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। চতুর্থ তাকবীরে হাত না উঠিয়ে রুকুতে চলে যেতে হবে। বাকি নামায স্বাভাবিকভাবে আদায় করতে হবে। এরপর খুত্বা শ্রবণের পর বিদায় নিতে হবে। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ২/৮৬)।

মাসআলা- প্রকাশ থাকে যে, পবিত্র মক্কা মুয়াযযামায় আমাদের দেশ থেকে দুু’এক দিন পূর্বেই চাঁদ উদিত হয়। সুতরাং কেউ যদি রমযান মাসে মক্কা শরীফ থেকে আমাদের দেশে আগমন করে এবং আমাদের দেশে ঊনত্রিশ তারিখ সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে আগত ব্যক্তিকে অন্যান্য লোকদের সঙ্গে রোযা রেখে একত্রিশতম রোযা পূর্ণ করতে হবে। এমনিভাবে কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের দেশ থেকে মক্কা শরীফ গমন করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তির আঠাশ রোযা পূর্ণ হয়ে গেলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী মক্কার লোকদের সঙ্গে ঈদের নামায আদায় করতে হবে। তবে একটি রোযা ক্বাযা করতে হবে। (ফাতাওয়া শামী- ২/৩৮৪; আহসানুল ফাতওয়া- ৪/৪২৩)।

মাসআলা : ঈদের নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা ও কোলাকুলি করা সঠিক নয়। অবশ্য হঠাৎ কারো সঙ্গে সফর বা অন্য কোনো কারণে অনেক দিন পর দেখা হলে তার সঙ্গে মুআনাকা করা বিদআত হবে না। আর ঈদের দিন কবর যিয়ারতকে জরুরী মনে করে জামাত বন্দী হয়ে কবর যিয়ারত করা বিদআত। তবে অতি জরুরী মনে না করে কবর যিয়ারত করা ভালো। ঈদের দিন ফজরের নামায ব্যতীত ঈদের নামাযের পূর্বে আর কোন নফল নামায নাই। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২১৪)।

ঈদুল আযহার নামাযের তরীকাও একইরূপ। তাতেও সেসব কাজ সুন্নাত যেসব কাজ ঈদুল ফিতরে সুন্নাত। শুধু মাত্র পার্থক্য এই যে, নিয়তের ক্ষেত্রে ঈদুল ফিতরের স্থলে ঈদুল আযহা বলতে হবে। ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া সুন্নাত এবং ঈদুল আযহায় ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কিছু না খাওয়া উত্তম। ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীর চুপে চুপে পড়া সুন্নাত, কিন্তু ঈদুল আযহায় উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত। ঈদুল আযহার নামায যথাসম্ভব সকালে পড়া সুন্নাত। ঈদুল আযহায় সাদকায়ে ফিতর নেই; বরং সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর নামাযের পর কুরবানী করা ওয়াজিব। তবে ঈদের দিন সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা সুন্নাত। (নূরুল ঈযাহ)।

প্রাসঙ্গিক কয়েকটি মাসআলা

মাসআলা- কোনো ঈদের নামাযের জন্যেই আযান ও ইকামত নেই। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ১/৩৯৯)।

মাসআলা- যে স্থানে ঈদের নামায পড়া হয়, সেখানে ঐদিন ঈদের নামাযের আগে এবং পরে অন্য কোনো নফল নামায পড়া মাকরূহ। তবে ঈদের নামাযের পর বাড়িতে ফিরে এসে নফল নামায পড়া মাকরূহ নয়। কিন্তু তার পূর্বে বাড়িতেও পড়া মাকরূহ। (ফাতাওয়া তাতারখানীয়া- ২/৬)।

মাসআলা- মহিলাগণ এবং যে সকল পুরুষ ওযরের কারণে  ঈদের নামায পড়তে পারেনি, তাদের জন্যেও ঈদের নামাযের পূর্বে নফল নামায পড়া মাকরূহ।

মাসআলা- কেউ যদি ঈদের নামায জামাতে পড়তে না পারে, তাহলে সে ব্যক্তি একাকী ঈদের নামায আদায় করতে পারবে না। কেননা ঈদের নামায আদায় সহীহ হওয়ার জন্যে জামাত শর্ত। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি যদি ঈদের নামাযে শরীক হয়ে কোনো কারণ বশত সে নামায ছেড়ে দেয় এবং পুনরায় আর শরীক না হয়, তাহলে তাকেও এর ক্বাযা আদায় করতে হবে না। কেননা ওই ব্যক্তির ওপর এমতাবস্থায় তা ওয়াজিব নয়। তবে যদি এরূপ নামায পড়তে না পারা আরও কয়েকজন একত্রিত হয়ে যায়, তাহলে তাদের ওপর তা আদায় করা ওয়াজিব। (ফাতাওয়া আলমগীরী- ১/১৫০)।

মাসআলা- কেউ যদি ঈদের জামাতে এমন সময় এসে হাজির হয় যে, ইমাম সাহেব তাকবীর শেষ করে ফেলেছেন, তাহলে সে ব্যক্তি নিয়ত বাঁধার পর তাড়াতাড়ি তাকবীর আদায় করে নিবেন, যদিও ইমাম সাহেব কেরাত আরম্ভ করে দিয়ে থাকেন।

আর যদি রুকু অবস্থায় শরীক হয়ে থাকেন, তাহলে যদি প্রবল ধারণা থাকে যে, তাকবীর শেষ করে ইমাম সাহেবের সঙ্গে রুকু পাবেন না, তাহলে তাকবীর বাদ দিয়ে রুকুতে শরীক হয়ে যাবেন এবং রুকুতে তাকবীর বলার সময় হাত উঠাবেন না। আর যদি তাকবীর পূর্ণ করার পূর্বেই ইমাম সাহেব রুকু থেকে উঠে যান তবে তিনিও উঠে যাবেন এবং তাকবীর বাকি থেকে গেলে তা মাফ হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া শামী- ১/৫৫৬, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ২/৯২)।

মাসআলা- যদি কারো এক রাকাত ছুটে যায়, তবে সে যখন উক্ত রাকাত আদায় করবে তখন প্রথমে কিরাআত পড়বে পরে তাকবীর বলবে যদিও নিয়মানুযায়ী প্রথমেই তাকবীর বলা উচিৎ ছিলো। (ফাতাওয়া শামী- ১/১১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২১৫)

মাসআলা- অনেক স্থানে ঈদের দিন সেমাই পাকানোকে অত্যন্ত জরুরি মনে করা হয়, এটা সঠিক নয়। সেমাই রান্না করতেও পারে, আবার ইচ্ছা হলে রান্না না করতে পারে। শরীয়তে একে খাছ করে নেয়ার কোনো ভিত্তি নেই। অর্থাৎ- অনেকে ঈদের দিন সেমাই রান্না করা ও তা খাওয়া সুন্নাত মনে করেন, অথচ কথাটি ভুল। ঈদের দিন বিশেষ কোনো খাবার পাকানো বা খাওয়ার বাধ্য বাধকতা নেই। (ফাতাওয়া শামী- ২/১৬৮ পৃষ্ঠা)।

মাসআলা- ঈদের দিন পোষাকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে, এমনকি অনেকে ধার-কর্য করে হলেও নতুন কাপড় তৈরি করেন। আবার অনেকে ধার করা কাপড় পরিধান করে ঈদ উদযাপন করেন। পোষাকের ওপর এমন গুরুত্ব দেয়ারও কোনো ভিত্তি নেই; বরং সুন্নাত হলো যার কাছে যে কাপড় আছে সেগুলোর মধ্যে যা উত্তম তা পরিধান করা। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ- ১৮ পৃষ্ঠা)।

মাসআলা- যদি কোনো কারণ বশতঃ এলাকাবাসী সবাই প্রথম দিন ঈদের নামায আদায় করতে না পারেন, তাহলে পরের দিন আদায় করবেন। (ফাতাওয়া কাযীখান- ১/৮৯)।

মাসআলা- যদি কোনো এলাকার লোক সংখ্যা এত বেশি হয় যে, একসঙ্গে একই ঈদগাহে নামায পড়তে না পারে এবং ঈদের নামায আদায় করার জন্যে অন্য কোনো জায়গা বা নিকটবর্তী কোনো ঈদগাহও না থাকে, তাহলে দ্বিতীয়বার ওই ঈদগাহে জামাআত করতে পারবে। আর দলাদলী করে একই ঈদগাহে দুইবার জামাআত করা মাকরূহ।

শাওয়ালের ছয় রোযার আহকাম

শাওয়ালের ছয় রোযার ফযীলত সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে-

‘হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে রমযানের রোযা রাখে এবং পরে শাওয়ালে ছয় দিন রোযা রাখে, তা তার পূর্ণ বছরের রোযার সমান হবে’। (সহীহ মুসলিম, বাবু ইসতেহবাবি সাওমি সিত্তাতি আইয়ামিন মিন শাওয়াল, মিশ্কাত-১৭৯ পৃঃ)।

ছয় রোযার আহ্কাম

* রমযানের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোযা রাখার অনেক ফযীলত রয়েছে। এটাকে আমাদের পরিভাষায় ছয় রোযা বলা হয়। এ ছয় রোযা রাখার ব্যাপারে অনেকে এরূপ মনে করেন যে, ঈদের পরের দিন হতেই এই ছয় রোযা রাখা আরম্ভ করলে প্রতিশ্রুত সাওয়াব পাওয়া যায়, নতুবা নয়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং পুরো শাওয়াল মাসের মধ্যে যে কোন সময় আদায় করতে পারলেই সে সাওয়াব পাওয়া যাবে। ঈদের পরের দিন থেকেই আরম্ভ করুক বা কয়েক দিন পরে আরম্ভ করুক। পরপর রাখুক অথবা ভিন্ন ভিন্ন যেভাবেই রাখুক পূর্ণ সাওয়াব পাওয়া যাবে। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ্)।

* অনেক লোক মনে করে যে, ছয় রোযা খুবই গরম। এ ধারণাও ভুল ও অর্থহীন। শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই।

* অনেকে এই ছয় রোযার মধ্যে নিজের আগের ক্বাযা রোযারও হিসেব করে। মনে করে- ছয় রোযাও আদায় হয়ে যাবে, ক্বাযাও হয়ে যাবে। এই ধারণাটিও সঠিক নয়। যদি ক্বাযার নিয়্যাত করে, তাহলে ছয় রোযার ফযীলত অর্জিত হবে না। সুতরাং এই দুই ক্ষেত্রের জন্যে পৃথক পৃথক রোযা রাখতে হবে। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ্)।

* ছয় রোযা ঈদের কয়েকদিন পরে আরম্ভ করা উত্তম। কারণ এতে নাসারাদের রোযার সাথে সাদৃশ্যতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। (শাইখ আব্দুল হক্ মুহাদ্দিসে দেহ্লভী [রাহ্.] রচিত ‘লুম্আত’)।

যিলহজ্বের নফল রোযার ফযীলত

হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) বলেন, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- যেসব দিনগুলোতে আল্লাহ্র ইবাদত করা হয়, তন্মধ্যে আল্লাহ্র নিকট জিলহজ্বের প্রথম দশ দিন হতে উত্তম কোন দিন নেই। কেননা, উক্ত দিনসমূহে প্রত্যেক দিনের রোযার সাওয়াব পূর্ণ এক বছর রোযা রাখার সাওয়াবের সমতুল্য এবং প্রত্যেক রাতের ইবাদতের সাওয়াব শবে-ক্বদরের ইবাদতের সমতুল্য। (তিরমিযী, ইব্নে মাজাহ্, মিশ্কাত শরীফ-১২৮ পৃঃ)।

অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- জিলহজ্বের নবম তারিখের রোযা অতীত এবং ভবিষ্যতের দুই বছরের গুনাহ্ বিদূরিত করে দেয়। (মিশ্কাত শরীফ-১৭৯)।

আশূরার রোযার ফযীলত

হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- রমযান মাসের রোযার পরে অধিকতর ফযীলতের রোযা হল মুহাররম মাসের আশুরার রোযা। (মুসলিম, মিশ্কাত শরীফ-১৭৮ পৃঃ)।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আশূরার দিনের রোযা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ্ দূর করে দেয়। (মুসলিম, মিশ্কাত শরীফ-১৭৯ পৃঃ)।

উল্লেখ্য, শুধুমাত্র আশূরার দিন রোযা রাখা মাকরূহ্। অতএব, কেবল আশূরা অর্থাৎ- ১০ মুহাররম রোযা না রেখে বরং তার সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখের আরও একটি রোযা বাড়িয়ে দু’টি রোযা রাখা উচিত। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ্)।

আইয়্যামে বীযের রোযা

হযরত ইব্নে আব্বাস (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়্যামে বীযের রোযা কখনই ছাড়তেন না। তা মুসাফিরী অবস্থায় হোক কিংবা স্ব-গৃহে অবস্থানরত অবস্থায় হোক। ‘আইয়্যামে বীয’ অর্থ প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। (নাসাঈ, মিশ্কাত)।

অন্য এক রিওয়ায়াতে হযরত ইব্নে আমর (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- রমযান মাসের রোযাসহ প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখার সাওয়াব ‘সাওমে দাহ্র’ অর্থাৎ সারা বছর রোযা রাখার সমান। (বুখারী, মুসলিম, মিশ্কাত শরীফ)।

———————————

লেখক- মুফতী ও মুহাদ্দিস, আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি