মাহে শা’বান ও শবে বারাতের করণীয় ও বর্জনীয়

 আল্লামা মুফতী নূর আহমদ (দা.বা.)

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্য এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর মনোনীত বান্দা তথা আম্বিয়ায়ে কিরামের উপর। প্রকাশ থাকে যে, সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা পরওয়ারদিগারে আলম। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সৃষ্টি করেন। অতঃপর এ সকল সৃষ্ট বস্তুর মধ্য হতে যেগুলোকে তিনি ইচ্ছা করেন মনোনীত ও নির্বাচিত করেন। যেমন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ফেরেশতাকুলকে সৃষ্টি করে তন্মধ্যে হযরত জিব্রাঈল (আ.), হযরত ইস্রাফিল (আ.), হযরত মিকাঈল (আ.), হযরত আজরাঈল (আ.)কে বিশেষভাবে মনোনীত ও নির্বাচিত করেছেন। একইভাবে মানুষ জাতির মধ্যে হতে আম্বিয়ায়ে কিরামকে বিশেষ করে হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত মূসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.) এবং নবীকুলের শিরোমণি খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ আরবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ মর্যাদা ও পরিপূর্ণতা দানের মাধ্যমে মনোনীত ও নির্বাচিত করেন।

তদ্রুপ আল্লাহ্ তাআলা আপন সৃষ্টি বস্তু পর্বতসমূহের মধ্যে হতে তুরে সিনা ও জাবালে হেরাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এমনিভাবে নগরসমূহের মধ্যে হারামাইন শরীফাইন অর্থাৎ মক্কা নগরী ও মদীনা নগরীকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। এমনিভাবে দিবসসমূহের মধ্যে হতে আরাফাহ্র দিবস ও আশুরার দিবসকে বিশেষ মহত্ত্ব দান করেছেন। তদ্রুপ চান্দ্রমাসসমূহের মধ্যে হতে রমযানুল মুবারক ও শা’বানুল মুয়াজ্জামকে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছেন। একইভাবে রাত্রসমূহের মধ্যে হতে শবে ক্বদর ও শবে বারাতের রাত্রিকে বিশেষ মর্যাদা ও বরকতময় করেছেন।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহে শা’বানে এত বেশী পরিমাণ রোযা রাখতেন, যা রমযান ব্যতীত অন্য কোন মাসে রাখতেন না। একারণেই মাহে শা’বানকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের দিকে এবং মাহে রমযানকে আল্লাহর দিকে সংযোগ করেছেন।

যেমন- হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, শা’বান আমার মাস (অর্থাৎ- শা’বানের রোযাকে আমার পক্ষ হতে সুন্নাত হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে)। আর রমযান আল্লাহর মাস (কেননা, রমযানের রোযা আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ হতে ফরয করা হয়েছে)। আর এই শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী বেশী রোযা রাখতেন। বিশেষ করে শবে বারাত অর্থাৎ শা’বানের পনের তারিখের দিনে রোযা রাখতেন এবং রাতে ইবাদতের জন্য খুব বেশী উৎসাহ প্রদান করতেন। যেমন- ইবনে মাজা শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যা মিশকাত শরীফে উল্লেখ রয়েছে। হযরত আলী (রাযি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন শা’বানের পনের তারিখ (শবে বারাত) আগমন করে, সে দিন তোমরা রোযা পালন কর এবং রজনীতে আল্লাহ্র উপাসনায় দন্ডায়মান থাক। কেননা, উক্ত দিবসে সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং জগদ্বাসীকে ডেকে ডেকে বলেন, হে মানব জাতি! আছ কি কেউ তোমাদের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। ওহে আছ কি তোমাদের কেউ অভাবী? আমি তার অভাব পূরণ করব। আছ কি কেউ বিপদগ্রস্থ? আমি তোমাদের বিপদ মুক্ত করব। আছ কি কেউ এই সমস্যায়? অর্থাৎ এমনিভাবে আল্লাহ্ তাআলা প্রত্যেক প্রয়োজনীয় বিষয় ও প্রত্যেক সমস্যার নাম ধরে ধরে বলতে থাকেন, ডাকতে থাকেন। যেমন বলেন, আছ কি কোন ভিখারী? আমি তাকে দান করব। আছ কি কোন বিষণ্নতায় ভুক্তভোগী, আমি তাকে আনন্দিত ও আহলাদিত করব ইত্যাদি। এমনিভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত ডাকতে থাকবেন। (ইবনে মাজা শরীফ, মিশকাত- ১১৫ পৃষ্ঠা)।

২। বাইহাকী শরীফের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আল্লাহ্ তাআলা শা’বানের পনের তারিখ রাতে বিশেষভাবে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসা বিদ্বেষকারী ব্যতীত সকল গুনাহগারকে ক্ষমা করে দেন।

৩। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ তাআলা শা’বানের পনের তারিখ অর্থাৎ শবে বারাতের রজনীতে দুনিয়াবাসীর প্রতি রহমতের দৃষ্টি ফেলেন এবং মুশরিক ও হিংসা বিদ্বেষকারী ব্যতীত সকল মাখলুকের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। অন্য রেওয়ায়াতে আছে, হিংসা বিদ্বেষকারী এবং অন্যায়ভাবে হত্যাকারী ব্যতীত সমস্ত মাখলুককে ক্ষমা করে দেন।

৪। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাযি.) বলেন, একবার আমি রাতের বেলায় (যেদিন হুযূর আমার ঘরেই ছিলেন) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বিছানায় তালাশের পর হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকী নামক কবরস্থানে অবস্থান করছেন। আমাকে দেখেই তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে তোমার উপর কোন জুলুমের আশংকা করছ? আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার কোন বিবির ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ্ তাআলা পনেরই শা’বানের রজনীতে দুনিয়ার আসমানে অর্থাৎ প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বনী ক্বালব নামক গোত্রের বকরীসমূহের পশমের চাইতেও বেশী সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্)। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, যাদের প্রত্যেকের উপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গিয়েছিল এমন মানুষদেরকে ক্ষমা করে দেন। (মিশকাত- ১১৫ পৃষ্ঠা)।

৫। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কি জান যে এ রাত অর্থাৎ পনের শা’বানের রাতটি কি? আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার তো এসব সম্পর্কে জানা নেই। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিই বলুন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আদম সন্তান যারা এই বছরে জন্ম লাভ করবে তাদের ব্যাপারে এই রাতে লিখা হয়ে যাবে এবং যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদের কথাও এ রাত্রিতেই লিখা হয়ে যাবে। এ রাতেই বান্দার আমল আল্লাহ্র দরবারে পৌঁছে এবং এই রাতেই তাদের রিযিক দুনিয়াতে অবতরণ করা হয়। (মিশকাত- ১১৫ পৃষ্ঠা)।

উলামায়ে কিরাম লিখেন, পূর্ণ এক বছরে বনি আদমের যা কিছু সংঘটিত হবে যেমন- তার মৃত্যু, তার রিযিক, তার জন্ম ইত্যাদিসহ সকল বিষয়াবলী বিস্তারিতভাবে এ রাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। এবং প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্বশীল ফেরেশতাগণের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়।

যেমন- হযরত আ’তা ইবনে ইয়াসার (রাযি.) বর্ণনা করেন যে, যখন শবে বারাতের রজনী আগমন করে তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে একটা তালিকা মালাকুল মাউত হযরত আজরাঈল (আ.)কে প্রদান করা হয় এবং তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, এ তালিকার মধ্যে যাদের নাম রয়েছে, তাদের রূহ্ যেন এ বছরে কবজ করা হয়। আর মানুষ বৃক্ষ রোপণ করে, বিবাহ্-শাদী করে, বড় বড় সুন্দর সুরম্য আট্রালিকা তৈরী করতে থাকে, অথচ তার নাম মৃত্যুবরণকারীদের তালিকায় ওঠে গেছে।

শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ.) বলেন, পৃথিবীতে মুসলমানদের জন্য দু’টি ঈদের দিবস রয়েছে, একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, অপরটি হচ্ছে ঈদুল আয্হা। এমনিভাবে আকাশ বাসী ফেরেশ্তাকুলের জন্য দু’টি ঈদের রজনী রয়েছে। একটি হচ্ছে ক্বদরের রজনী অপরটি হচ্ছে বারাতের রজনী। মু’মিনের জন্য ঈদের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দিনে, আর ফেরেশতাদের জন্য করা হয়েছে রাতে। কারণ মানুষ রাতে নিদ্রা যায় আর ফেরেশতাগণ কখনো নিদ্রা যায় না।

উল্লিখিত হাদীসসমূহের মধ্যে কিছু হাদীস যদিও সনদের দিক দিয়ে দুর্বল, কিন্তু মাওজু তথা বানোয়াট ও মনগড়া মোটেই নয়। আর ফযীলতের বেলায় দুর্বল হাদীসও উলামায়ে কিরামের ঐক্যমতে গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়তঃ কুরআনের আয়াত এবং বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারাও শবে বারাতের সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন- আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সূরায়ে দোখানে ইরশাদ করেন, “হা-মীম, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়”। (সূরায়ে দোখান- ১-৪ আয়াত)।

উল্লিখিত আয়াতের বরকতময় রাত সম্পর্কে মুফাসসীরগণের এক জামাআত বলেন যে, এখানে বরকতময় রাত দ্বারা শবে বারাত বুঝানো হয়েছে। তাই উল্লিখিত আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী যেমন- এই রাতে সিদ্ধান্ত করা হয়, তদ্রুপ কুরআন অবতীর্ণ করার সিদ্ধান্তটিও এই রাতে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং শবে ক্বদরের রাত্রিতে তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তাই ক্বদরের রজনীতে কুরআন অবতীর্ণ করার ও শবে বারাতে তার ফায়সালা হওয়া উভয়ের মধ্যে আর কোন বিরোধ নেই। অতএব, যে রজনী সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন যে, এ রাতটি বরকতময় এবং সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উক্ত রজনীতে ইবাদত ও দিবসে রোযা পলনের উৎসাহ প্রদান করেন, তাই রাতটি উত্তম ও বরকতময় হওয়ার মধ্যে সন্দেহ্ কোথায়? আল্লামা ইবনুল জাওযী (রাহ্.) হাদীসের ব্যাপারে অধিক কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। যার কারণে তিনি সিহাহ্ সিত্তার অনেক বিশুদ্ধ হাদীসকেও মাওজু তথা বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসের ব্যাপারে আল্লামা ইবনুল জাওযী (রাহ্.)এর তাহ্কীক ও অনুসন্ধান জমহুর উলামায়ে কিরাম বিশেষ করে হানাফী মাযহাবের উলামায়ে কিরামের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন- হযরত শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবী (রাহ্.) শরহে সীরাতের ভূমিকার মধ্যে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

অতএব, কুরআনে কারীমের আয়াত ও উল্লিখিত হাদীসসমূহের দ্বারা শবে বারাতের ফযীলত, মর্যাদা ও বরকতময় হওয়াটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তবে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, শবে বারাতে নফল ইবাদত-বন্দেগী শরীয়ত সম্মতভাবে পালন করতে হবে এবং শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ হতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় পুণ্যের পরিবর্তে গুনাহ্ই হবে।

শবে বারাতে আল্লাহ্ তাআলা সকল গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করে দিবেন কিন্তু কিছু সংখ্যক ব্যক্তি উক্ত পুণ্যময় রজনীতেও ক্ষমা পাবে না তারা হচ্ছে-
(১) মুশরিক অর্থাৎ যে আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপন করে। (২) হিংসা-বিদ্বেষকারী। (৩) পিতা-মাতার নাফরমান তথা অবাধ্য সন্তান। (৪) টাখনুর নীচে পায়জামা-লুঙ্গি পরিধানকারী। (৫) মদ খোর। (৬) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী। যদি তা দ্বীনের জন্য না হয়। (৭) যাদুকর। (৮) গণক, যারা ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে থাকে। (৯) অন্যায়ভাবে টেক্স আদায়কারী। (১০) হস্তরেখা দেখার মাধ্যমে অদৃশ্যের খবর প্রদানকারী। (১১) অত্যাচারী সিপাহী। (১২) ঢোল-তবলা-হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের বাদক। (১৩) তাস খেলোয়াড়। (১৪) বিদআতী।

এ সকল লোকদের গুনাহ্ শবে বারাতেও ক্ষমা হয় না। হ্যাঁ, তারা যদি খাঁটি অন্তরে তাওবা করে নেয় অর্থাৎ উক্ত অন্যায় কাজ যদি সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যাগ করে তার উপর লজ্জিত হয় এবং ভবিষ্যতে উক্ত কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করে নেয়। এরপর কখনো যদি হঠাৎ করেই ফেলে, তবে সাথে সাথে পুনরায় তাওবা করে নেয়। এমনিভাবে খাঁটি অন্তরে তাওবা করার দ্বারা তাদের গুনাহ্ মাফ হওয়ার আশা করা যায়।

মাহে শা’বানের সুন্নাত আমলসমূহ

শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী বেশী রোযা রাখতেন। যেমন- হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান এবং শা’বান ব্যতীত অন্য কোন মাসে ক্রমান্বয়ে দুই মাস রোযা রাখতে দেখিনি। (মিশকাত)।

অন্য হাদীসে হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাযি.) বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এটি খুব পছন্দনীয় ছিল যে, তিনি শা’বানের রোযা রাখতে রাখতে রমযানের সাথে সংযোগ করে দিতেন। তবে একথা স্মরণ যোগ্য যে, মাহে শা’বানে অধিক পরিমাণ রোযা রাখাটা এক প্রকারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব ছিল। অন্য সবার জন্য ধারাবাহিকভাবে দু’মাস রোযা রাখা সম্ভব নয়।

তার পরেও কেউ সক্ষম হলে এবং রমযানের রোযার মধ্যে কোন প্রকার ব্যাঘাত হওয়ার আশংকা না থাকে, তাহলে তার জন্য যথাসাধ্য রোযা রাখা জায়েয আছে। প্রত্যেক চান্দ্রমাসের ১৩/১৪/১৫ তারিখ, অর্থাৎ আইয়্যামে বিজের রোযাতো মুস্তাহাব আছেই। যদি সব ক’টি রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে কমপক্ষে ১৫ তারিখের রোযা হলেও রাখা উচিৎ, যাতে এ মাসের বরকত হতে বঞ্চিত না হয়।

শবে বারাতের সুন্নাত আমলসমূহ

হাদীসসমূহের ভাষ্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এ রাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিনটি আমলের প্রমাণ পাওয়া যায়।
১। পনেরই শা’বান রাতে কবরস্থানে গমন করা এবং কোন প্রকার আবশ্যকতা ও গুরুত্ব দেওয়া ব্যতীত দলবদ্ধ না হয়ে সেখানে গিয়ে কবর যিয়ারত করা ও মুর্দাদের জন্য দোয়া ইস্তিগফার করা।

২। উক্ত রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহ্ পাকের ইবাদত করবে এবং অধিক পরিমাণে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করবে এবং বেশী বেশী দরূদ শরীফ পাঠ করবে এবং যথা সম্ভব নফল নামায আদায় করবে। কিন্তু কোন প্রকার জামাআত ও রাকাআত এবং সূরা নির্দিষ্ট করা ব্যতীত একাকীভাবে পড়বে এবং নিজের জন্য ও সমস্ত মুসলিম জাতির জন্য মহান আল্লাহ্ তাআলার দরবারে দোয়া করবে। এবং নিজের গুনাহের জন্য তাওবা ইস্তিগফার করবে।

বিশেষ করে ঐসকল গুনাহ হতে তাওবা করবে যেগুলো বিদ্যমান থাকার কারণে এই বরকত ও পুণ্যময় রাতে দোয়া কবুল হয় না। আর যে ব্যক্তি দীর্ঘ লম্বা নামায পড়তে ইচ্ছুক, সে যেন সালাতুত্ তাস্বীহ পড়ে। এবং আল্লাহর ভয় ও ক্রন্দন করবে, স্বীয় পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতির জন্য দোয়া করবে এবং সাথে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য আল্লাহ্ পাকের শাহী দরবারে দোয়া প্রার্থনা করবে।

৩। শবে বারাতের পরের দিন অর্থাৎ পনের তারিখে নফল রোযা রাখবে।
শবে বারাতসহ অন্যান্য বরকতময় রজনীসমূহে পূর্ণ রাত জেগে থাকবে। যদি কষ্টকর হয় তাহলে যতটুক সম্ভব জেগে থেকে ইবাদত করবে। ঈশা ও ফজরের নামায জামাআতের সাথে পড়বে, তাহলে পূর্ণ রাত ইবাদতের সাওয়াব লাভ করবে। (ফাতওয়ায়ে শামী)।
ইমাম শা’রানী (রাহ.) বলেন, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতে মুহাম্মদী হতে অঙ্গীকার নিয়েছেন তারা যেন শবে বারাত, শবে ক্বদর ইত্যাদি পুণ্যময় রাতসমূহে ক্ষুধার্ত থাকাকে অবলম্বন করে ইবাদতে মশগুল থাকে।

শবে বারাতের কুসংস্কার ও বজর্নীয় কর্মসমূহঃ

অনেক স্থানে দেখা যায় শবে বারাতের রাত্রি জাগরণের জন্য ফরয ইবাদতসমূহের চাইতেও বেশী সংখ্যক মানুষকে একত্রিত করার জন্য ডাকা-ডাকির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। নফল ইবাদতের জন্য এরূপ গুরুত্ব ও আবশ্যকতা দেখানো ও গুরুত্বের সাথে একত্রিত করা ও ডাকা-ডাকি করা জায়েয নেই, বরং এটা বিদআতে ছাইয়্যেয়া হিসেবে গণ্য হবে। এমনিভাবে এ ধরনের নফল ইবাদতের জন্য মসজিদে সমবেত হওয়া ও রাত জাগা বর্তমানে একটা রেওয়াজ ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। অথচ এটা অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম মাকরূহ লিখেছেন। সালফে সালেহীন হতে এর কোন প্রমাণ নেই। বরং দুররে মুখতারে লিখিত আছে যে, বরকতময় রজনীগুলোতে একা একা ইবাদত করা ও জাগ্রত থাকা মুস্তাহাব।
এমনিভাবে ডাকাডাকি ছাড়া নফল নামাযসমূহ জামাআতের সাথে পড়া মাকরূহে তাহরীমি হবে যদি চারজন হতে অধিক মানুষের জামাআত হয়। আর যদি ডাকাডাকি করে একজনও হয়, তাহলে এক ব্যক্তিকে নিয়েও জামাআতে শামিল হওয়া মাকরূহ হবে। নফল নামাযের কোন নির্ধারিত পরিমাণ নেই। পরিমাণ নির্ধারণ করা মাকরূহ হবে।
যখন উক্ত রজনীতে জাগ্রত থেকে ইবাদতের জন্য হুকুম করা হয়েছে, তাই শুধুমাত্র ওয়ায-নসীহত করে রাত কাটালে মাকরূহ হবে। সালফে সালেহীনগণ হতে এ রাত্রে ওয়ায-নসীহতের মাধ্যমে রাত কাটানোর কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

যেহেতু এই রাতে বেশী হতে বেশী পরিমাণ ইবাদত করা উচিৎ, তাই হালকা পাতলা থাকা চাই। উদর পূর্ণ করে খানাপিনা দ্বারা অলসতা ও দুর্বলতা আসে। এজন্য এ রাতে ভাল ভাল খানাপিনা তৈরী করা ও উদর পূর্ণ করে খাওয়া-দাওয়া করা এবং অন্যদেরকে এভাবে খাওয়ানো মাকরূহ হবে।
এই রাতে হালুয়া-রুটি তৈরী করা, মোরগ-গরু-মহিষ জবাই করা ইত্যাদি সবকিছু সুন্নাতের পরিপন্থী। আর এই হালুয়া-রুটির কুপ্রথা আমাদের সমাজে শিয়াদের থেকে এসেছে। আর এই কুপ্রথা অনেক এলাকায় এমন বাধ্য-বাধকতার সাথে করা হয় যে, যদি ঐদিন হালুয়া-রুটি তৈরী করা না হয়, তাহলে তাদের শবে বারাত যেন হয় না। যার কারণে অনেক স্থানে শা’বান মাসকে রুটির মাস বলা হয়। উপরোক্ত আক্বীদা নিয়ে হালুয়া-রুটি তৈরী করা বিদআত এবং মাকরূহ্ হবে।

বিশেষ বরকতময় রজনীসমূহ্ যেমন শবে বারাত, শবে ক্বদর, খতমে কুরআন ইত্যাদি অধিক বাতি জ্বালানো আলোক সজ্জা করা সম্পূর্ণ বিদ’আত ও শরীয়ত পরিপন্থী। কেননা, এরূপ আলোকসজ্জা ও বাতি জ্বালানোর মধ্যে অগ্নি পূজার সাথে এবং হিন্দুদের লক্ষী পূজার মধ্যে যে দীপাধার জ্বালানো হয় সেগুলোর সাথে সাদৃশ্য হয়ে থাকে। আর হাদীসের মধ্যে কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য করা সম্পর্কে অনেক হুঁশিয়ারী ও ধমকী এসেছে। এবং মসজিদকে এরূপ আলোকসজ্জা করার দ্বারা মসজিদ খেল-তামাশা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপের স্থানে পরিণত হয়। এবং এতে ছোট ছোট বাচ্চারা এবং অনুপযুক্ত মানুষগণ মসজিদে হৈ-চৈ শোর-গোল করতে যাবে।

বর্তমানে প্রচলিত এ সকল প্রথা, যা পবিত্র ও বরকতময় রজনীসমূহে হয়ে থাকে। যেমন মসজিদে ফিরনি মিষ্টি বণ্টন করা এগুলো সম্পূর্ণ কু-প্রথা; যা অবশ্যই বর্জনীয়। অনেক স্থানে দেখা যায়, শবে বারাত ও শবে ক্বদরসহ অন্যান্য রজনীসমূহে আতশবাজি করা হয়, অথচ এগুলো মাকরূহ্ তথা হারাম কাজ।
অনেক স্থানে এ প্রথাটিও রয়েছে যে, শবে বারাত, শবে ক্বদর ইত্যাদি উপলক্ষ্যে মুসলমান নারীগণ তাদের ঘর মেরামত করে, ঘর লেপন করে এবং রঙ-বেরঙের নকশা অঙ্কনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। এবং প্রত্যেক বছরের এ সময়ে ঘরকে সজ্জিত করা এসব কিছু সম্পূর্ণ হিন্দুদের রীতি-নীতি, যা বর্জন করা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য।

অনেকে এই আক্বীদা পোষণ করে যে, শবে বারাতের রজনীতে মুর্দাদের রূহ্সমূহ ঘরে আগমন করে। অথচ কুরআন-হাদীসে এ সকল প্রথা ও আক্বীদার কোন ভিত্তিই নেই এবং কোথাও এসবের সামান্যতম প্রমাণও নেই। আর মু’মিন তো প্রত্যেক আমলের মধ্যে স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও রীতি-নীতি এবং তরীক্বাকে সামনে রেখে চলবে এবং সেটাকে তার আমলের বিষয়-বস্তু বানাবে। কেননা, এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের উভয় জগতের সফলতা ও কামিয়াবী। যেমন কবি বলেছেন-

নবী পথের বিপরীত চলিবে যেজন,
মঞ্জিলে মাকসুদে কভু পৌঁছিবে না সে জন।।

লেখকঃ মুহাদ্দিস ও বিভাগীয় প্রধান, ফতোয়া বিভাগ, দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি