তাফসীরে কালামুল্লাহ -হযরত মাওলানা মুফতী জসিমুদ্দীন

সূরা- বনী ইসরাঈল

سبحان الذی اسری بعبدہ لیلا من المسجد الحرام الی المسجد الاقصی الذی بارکنا حولہ لنریہ من آیاتنا انہ ہو السمیع البصیرډ

তরজমাঃ

পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বন্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারপাশকে করেছি আমি বরকতময়- যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চই তিনিই পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। (সূরা- বনী ইসরাঈল, আয়াত- ১)।

শানে নুযূলঃ

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রাহ.) তাফসীরে কাবীরে উল্লেখ করেছেন যে, হুযূরে আকরাম (সা.) মিরাজের রাতে সাত আসমান এবং সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে যখন মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে হাজির হলেন, তখন আল্লাহ পাক তাঁকে সম্বোধন করে ইরশাদ করলেন- হে মুহাম্মাদ! আমি কোন শব্দ দিয়ে আপনাকে সম্বোধন করবো? তখন হুযূর (সা.) বললেন যে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আপনার আবদ্’ (দাস) বলে সম্বোধন করুন। অর্থাৎ- আমি আপনার বান্দা, এই ঘোষণা দিন। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করলেন।

ব্যখ্যাঃ

আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের হাবীব (সা.)এর জন্য ‘আবদ্’ শব্দ ব্যবহার করে আপন মাহবুবের উচ্চ সম্মানের অধিকারী হওয়াকে প্রকাশ করেছেন। কেননা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যদি এ কথা বলেন যে, এটা আমার বন্দা, তাহলে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের আর কী আছে? যেমনটি অন্য এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- وعباد الرحمان الذین یمشون۔۔۔

যাতে আল্লাহ তায়া’লা নিজের প্রিয় মাকবুল বান্দাদের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। সুতরাং এতে এ কথাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ও কামিয়াবী হল যে, সে পরিপূর্ণরূপে আল্লাহ তায়া’লার বান্দা (দাস) হতে পারা। কেননা বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হুযূরের অন্নান্য সব গুণাবলীর মধ্যে হতে উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের গুণকে বাছাই করেছেন।

عبد  ব্যবহারের আরেকটি বিশেষ কারণ হলো- মি’রাজের এই বিস্ময়কর সফরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা স্বাভাবিক নিয়ম-পরিস্থিতির বিপরীত। সুতরাং কেউ যেন এতে ধোঁকায় পড়ে নবীকে প্রভু মনে না করে। যেমনটি হযরত ঈসা (আ.)এর ক্ষেত্রে হয়েছে তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর। তাই عبد শব্দ এনে এ কথা স্পষ্ট করে দেওয়া হল যে- এত সব অলৌকিকত্ব-মু’জিযাতের পরেও মুহাম্মাদ (সা.) বান্দাই আছেন, আল্লাহর গোলাম হিসেবেই আছেন, আল্লাহর মাকামে পৌঁছে যাননি।

সুতরাং আয়াত দ্বারা ঐ সমস্ত বাতেল ও ভ্রান্ত মতালম্বীদেরও খন্ডন হয়ে যায়, যারা নবী (সা.)কে বাশারিয়্যাত (মানুষ) থেকে মালাকিয়্যাতে (ফেরেশতা) পৌঁছিয়ে দেয়। আর বলে যে, নবী নূরের তৈরী, মাটির নয়। সাথে সাথে যারা বলে যে- নবীর মি’রাজ স্ব-শরীরে হয়নি বরং স্বপ্নযোগে রুহানীভাবে হয়েছে, তাদেরও খন্ডন এই আয়াত দ্বারা হয়ে গেছে। কেননা ‘আবদ্’ বান্দা- কেবল রুহের নাম নয়। বরং রুহ এবং শরীর উভয়ের সমষ্টির নাম হল ‘আবদ’ তথা বান্দা।

আয়াতের মধ্যে ‘লাইলান’কে আরবী গ্রামার মতে নাকেরা এনে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইসরা এবং মি’রাজের পূর্ণ ঘটনা সম্পূর্ণ রাতে নয়, বরং ঘটনাটি রাতের অল্প কিছু সময়ের মধ্যে ঘটেছে। উল্লেখ্য, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফরকে ইসরা এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত সফরকে মি’রাজ বলা হয়। তবে কারো কারো নিকট দুটোকেই ইসরা এবং মি’রাজ বলে।

আর ‘বা-রাকনা হাওলাহু’, অর্থাৎ- আমি তার চারপাশকে করেছি বরকতময়। এখানে ‘হাওলাহু’ তথা চারপাশ দ্বারা পুরো সিরিয়াকে (বর্তমান ফিলিস্তিন) বুঝানো হয়েছে। এর বরকত সমূহ নানাবিধ- ধর্মীয় দিক দিয়েও এবং পার্থিব দিক দিয়েও। ধর্মীয় বরকত হল-আল্লাহ তায়া’লা অনেক নবী রাসূলকে এই শহরে প্রেরণ করেছিলেন। এখানে অনেক আম্বিয়ায়ে কেরামের কবর রয়েছে। আর পার্থিব বরকত হল- এর উর্বর জমি, অসংখ্য ঝর্ণা ও বহমান নদী এবং অসংখ্য সুমিষ্ট ফল-ফলাদির বাগান। তাই এই অঞ্চলটি নানান প্রকারের উৎকৃষ্ট ফল-ফলাদি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অতুলনীয়।

মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা

মি’রাজের সফরের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ মক্কার মসজিদে হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদে আকসা পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপ মসজিদে আকসা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত। এবং তৃতীয় ধাপ সেখান থেকে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একান্ত সান্নিধ্যে। হুযূর (সা.) প্রসিদ্ধ বর্ণনা মতে হযরত উম্মে হানী (রাযি.)এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) তাশরীফ আনেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জাগ্রত করে প্রথমে সাক্কে  ছদর অর্থাৎ- বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে অন্তর মোবারক যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন।

অতঃপর বোরাক যোগে মদীনা, তারপর মসজিদে আকসা গমন করেন। সেখানে তিনি সকল নবীকে নিয়ে দু’রাকাত নামায আদায় করেন। যদিও কোন কোন রেওয়ায়াতে আসার পথে নামায পড়ার কথা রয়েছে, তবে প্রথম মতটিই অগ্রগণ্য। পথিমধ্যে আপন রবের অনেক কুদরত ও নিদর্শন অবলোকন করেন। অতঃপর আসমান থেকে একটি সিঁড়ি আনা হয়। এ সিঁড়িটি কী এবং এর বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল তা আল্লাহ তায়া’লাই ভাল জানেন। যাতে নিচ থেকে উপরে উঠার জন্য ধাপ ধাপ বানানো ছিল এবং  রাসূলুল্লাহ (সা.) ঐ সিঁড়ির মাধ্যমে আসমানের দিকে অগ্রসর হন। কতেক রেওয়াতের মধ্যে আছে যে- বোরাকের উপর সাওয়ার হয়ে উক্ত সিঁড়ির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে প্রথম আসমানে, তারপর পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট আসমানে তাশরীফ নিয়ে যান।

প্রত্যেক আসমানে নিযুক্ত ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে স্বাগতম ও মুবারকবাদ জানান। প্রত্যেক আসমানে ঐ সমস্ত নবী-রাসূলদের সাথেও মুলাকাত হয় যাঁরা নির্দিষ্ট কোন আসমানে রয়েছেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.)এর সাথে, দ্বিতীয় আসমানে হযরত ইয়াহয়া ও হযরত ঈসা (আ.)এর সাথে, তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.)এর সাথে, চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরিস (আ.)এর সাথে, পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.)এর সাথে, ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ.)এর সাথে এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহীম (আ.)এর সাথে মুলাকাত করেন।

অতঃপর এমন এক ময়দানে পৌঁছলেন যেখানে তাক্বদীর লিপিবদ্ধকারী কলমের লেখার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ দেখেন, যেখানে আল্লাহ তাআলার হুকুমে বিভিন্ন রঙের এবং স্বর্ণের প্রজাপতি এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা ঐ স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত জিবরাঈল (আ.)কে স্বরূপে দেখতে পান। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি ‘রফরফ’ (সবুজ রঙের গদি বিশিষ্ট পালকী) দেখতে পান, যা দিগন্ত ব্যাপী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বাইতুল মা’মূরকেও দেখেন, যেটা বাইতুল্লাহ (কা’বা ঘর)এর বরাবর উপরে সপ্তম আসমানে অবস্থিত। যার দেওয়ালের সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.) হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বাইতুল মা’মূরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। যারা একবার প্রবেশ করেছে, তাদের কেয়ামত পর্যন্ত পুনরায় প্রবেশের পালা আসবে না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মি’রাজের সেই ঐতিহাসিক সফরে আপন প্রভুর জান্নাত দেখেন, যা আপন রবের নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং জাহান্নাম দেখেন, যেখানে বিভিন্ন প্রকারের আজাব ও শাস্তিতে ভরপুর ছিল। সিদরাতুল-মুনতাহা থেকে উপরে উঠে দরবারে ইলাহিতে হাজির হন, যে সম্পর্কে পবিত্র কালামে পাকে মহান রব্বুল আলামীনের ইরশাদ হয়েছে- فکان قاب  قوسین او ادنی এবং স্বীয় মহবুবের সাথে সরাসরি কোন মাধ্যম ছাড়াই কথা বলেন।

মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে স্বীয় উম্মতের জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের তোহফা নিয়ে আসেন। তারপর হযরত মূসা (আ.)এর পরামর্শে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবার থেকে কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্ত পর্যন্ত নামিয়ে আনেন। সেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়ে আসার সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, যারা এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিকভাবে আদায় করবে তাদেরকে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সাওয়াব দেওয়া হবে। অতঃপর বুরাকের উপর আরোহণ করে রাতের অন্ধকারেই মক্কা মুকাররামায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ হল মি’রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা।

এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষনীয়ঃ

মহানবী (সা.) রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্য থেকে আমাদের জন্য কী এনেছেন এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর হাবীবকে মি’রাজে নিয়ে তাঁর উম্মতের জন্য কী উপহার দিয়েছেন? মুসলিম শরীফের এক হাদীসে মি’রাজে  আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য তিনটি জিনিষের কথা বর্ণিত হয়েছে। ১. পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, ৩. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করলে গুনাহ মাফ হওয়ার ঘোষণা। তবে নামাযের বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পায়। সুতরাং নামাযকে গুরুত্ব ও পাবন্দির সাথে আদায় করা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে কাউকে শরীক না করা একজন মুসলমানের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

আরও শিক্ষনীয় বিষয় হল, নবীর মি’রাজের ঘটনা সত্য এবং তা রূহানী ছিল না, বরং তা স্ব-শরীরে হয়েছে। অসংখ্য সহীহ এবং মুতাওয়াতের হাদীস দ্বারা এবং উম্মতের ইজমার দ্বারা এসব কিছু প্রমাণিত। আর নবীও অন্যদের মত মাটির তৈরী মানুষ, নূরের তৈরী ফেরেশতা নয়। কেননা উক্ত আয়াত দ্বারা এটা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। সুতরাং নবীর বর্ণনা করা খবরকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মেনে নিতে হবে। তবেই তো হওয়া যাবে প্রকৃত নবী প্রেমি আশেক। চাই তা যত অবাস্তবই মনে হোক না কেন। আর তখনই হওয়া যাবে ‘সিদ্দীক’, যেমনটি হতে পেরেছিলেন খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর (রাযি.)।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আল্লাহর বাণী ও নবী (সা.)এর ফরমানকে পরিপূর্ণ বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে ঈমানকে মুকাম্মাল করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥

 

লেখকঃ  উস্তাযুল ফিক্বহ ওয়াল হাদীস এবং বিভাগীয় পরিচালক- উচ্চতর তাফসীর ও কুরআন গবেষণা বিভাগ, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি