কওমী সনদের স্বীকৃতি প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মুহাম্মদ আমিনুর রশিদ (গোয়াইনঘাটী) :

সম্প্রতি কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে দেশের কওমী অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন ব্লগে, আলোচনার টেবিলে, বক্তৃতার মঞ্চে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। সবাই নিজ নিজ দৃষ্টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন। ইতিবাচক নেতিবাচক নানান দিক নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে একই প্লাট ফরমে আনার চেষ্টা করছেন। তাদের প্রচেষ্টা যেন সফল হয়, এটাই কমনা করি। সুতরাং সনদের স্বীকৃতি এবং এর প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা খুবই দরকার। মূল আলোচনায় যাবার আগে কওমী মদ্রাসার ওপর একটা অভিযোগের জবাব দেয়া খুবই প্রয়োজন মনে করি।

সম্প্রতি আমাদের দেশে বিভিন্ন মহল থেকে এ মর্মে অভিযোগ করা হয় যে, কওমী মাদ্রাসাগুলোতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান পড়ানো হয় না। শুধু পুরাতন নিয়মে উর্দু আরবী শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। যা থেকে শুধু মোল্লা মৌলভী সৃষ্টি হচ্ছেন। যারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান না জানার কারণে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কোনো খেদমত করতে পারছেন না। তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এসব মাদ্রাসায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হোক।

এর জবাবে বলা যায় যে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার্জনের জন্যে দেশে বহু স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি আছে। সেখানে গিয়ে শেখা যেতে পারে, তাতে কেউ বাধা দেবে না। মাদরাসাগুলো এ জন্যে নয়। কেননা, কওমী মাদরাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো এমন একদল মানুষ সৃষ্টি করা, যারা কুরআন-হাদীস তথা ইসলামী জ্ঞানে জ্ঞানী, চারিত্রিক ও নৈতিক বলে বলীয়ান হবেন। দ্বীন ইসলামের হেফাজত ও সংরক্ষনে সচেষ্ট থাকাকে যারা তাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মনে করবেন। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবেন। ন্যায়ের প্রচার ও অন্যায়ের প্রতিকার করবেন। মানবীয় বৈশিষ্ট ও গুণাবলীর বিকাশ সাধন করবেন। সত্যিকার মানবতার উৎকর্ষ ও প্রকৃত মনুষ্যত্বের উন্নতি সাধন করবেন। তারা হবেন খাঁটি আল্লাহ ওয়ালা একদল মানুষ। আর একমাত্র ইসলামী শিক্ষাই সত্যিকার আল্লাহ ওয়ালা বানানোর ধারক ও বাহক।

প্রশ্ন ওঠতে পারে, ইসলামী শিক্ষার সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান লাগালে অসুবিধেটা কি? এতে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া গেল, আবার আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানও অর্জন করা গেল। জবাবে বলা যায়, কওমী মাদরাসাগুলোতে ইসলামী শিক্ষার সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ঢুকালে কওমী মাদ্রাসার ঐতিহ্য আর স্বকীয়তা বহাল থাকবে না। কওমী মাদ্রসার রুহানিয়্যাত বা আধ্যাত্মিক শক্তি খতম হতে থাকবে। একথা পরীক্ষিত, যার গায়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে গেছে, তার কাছ থেকে রুহানী শক্তি বিদায় নিতে থাকে। আস্তে আস্তে দ্বীনদারী খতম হতে থাকে। বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করে বুঝতে হলে আমাদেরকে অতীত ইতিহাসের দিকে একবার তাকাতে হবে।

ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে রাজা-বাদশাহ ও আমীর ওমারাদের শিক্ষানুরাগ ও বদান্যতার ওপর ইসলামী শিক্ষা নির্ভর ছিল। প্রত্যেক শহরে ও গ্রামে অসংখ্য মক্তব মাদরাসা বিদ্যমান ছিল। যার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার নবাব ও আমীর ওমারাগণ বহন করতেন। এছাড়াও ওলামায়ে কেরাম ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ পরিসরে শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা জারী রেখেছিলেন। শাহী খাজানা থেকে তাদের জন্য বড় অংকের ভাতার ব্যবস্থা ছিল। তদানিন্তন শিক্ষা কারিকুলামে নাহু ছরফ (আরবী গ্রামার), বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র), ফিক্বাহ (ইসলামী আইন শাস্ত্র), উসূলে ফিক্বাহ (ইসলামী মূল নীতি শাস্ত্র), মানতিক (যুক্তি বিদ্যা), আক্বাইদ, হাদীস, তাফসীর প্রভৃতি বিষয় ছিল। ১৮৫৭ইং মুসলমানদের এ শিক্ষার ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৮৫৭ ইং যখন ভারতের শাসন ক্ষমতা মুসলমানদের হাত থেকে ইংরেজ সরকার কেড়ে নেয়, তখন বর্বর ইংরেজ সরকার মুসলমানদের এ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। ইসলামী শিক্ষার পরিবর্তে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। যার সম্পর্কে তাদের মন্তব্য হলো, এ শিক্ষার ফলে এমন একদল লোক তৈরি হবে, যারা রং ও চামড়ার দিক থেকে থাকবে ভারতীয়, কিন্তু মন-মস্তিষ্কের দিক দিয়ে হবে খাঁটি বিলেতী।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের আত্মরক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ এর উন্নতি ও অগ্রগতির উপায় কি হতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন মুসলিম মনীষীগণ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক দলের অভিমত হলো, মুসলমানদের এ অবনতির একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে ইসলামী শিক্ষার সাথে সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করা। মুসলমানদেরকে ইসলামী শিক্ষার সাথে সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপূর্ণ হতে হবে। যাতে মুসলমানেরা ইংরেজ জাতি হতে কোনো দিকে পিছিয়ে থাকবে না। বরং ইংরেজদের সাথে পাল্লা দিয়ে একদিকে পার্থিব উন্নতি করতে পারবে, অন্যদিকে ইসলামী শিক্ষা থাকার কারণে দ্বীন ধর্মের হেফাজত ও খেদমত করতে পারবে। এ মতাদর্শের অগ্রপথিক হলেন স্যার সৈয়দ আহমদ। আর তাঁর এ চিন্তাধারার বিকাশ ক্ষেত্র হল. আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়।

স্যার সৈয়দ আহমদ বলতেন, ফালছাফা আমাদের ডান হাতে থাকবে এবং ন্যাচারাল সাইন্স আমাদের বাম হাতে থাকবে। আর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” আমাদের মাথার তাজ হিসেবে থাকবে। তিনি আরো বলেন যে, আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হল, মুসলমানদের মাঝে ইসলামী শিক্ষার সাথে সাথে ইউরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতা প্রচার করে এমন এক সমাজ সৃষ্টি করা, যারা ধর্ম হিসেবে হবে মুসলমান, বর্ণ হিসেবে হবে ভারতীয় এবং পার্থিব জ্ঞান ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজদের সমতুল্য।

পক্ষান্তরে অন্যদলের চিন্তাধারা হলো যে, পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতা গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্যে আরো মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। কেননা, এতে সর্বাগ্রেই মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা, আখলাক-চরিত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনা বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই মুসলমানদের শোচনীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো, পুরনো নিয়মের খাঁটি ও নিরংকুশভাবে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা জারী করা। এ দলের অগ্রপথিক হলেন মাওলানা ক্বাসিম নানুতুভী (রাহ.)। আর উক্ত চিন্তাধারার বিকাশ ক্ষেত্র হল, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দ।

উল্লেখ্য, প্রথম দল মুসলমানদের পার্থিব উন্নতিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দল মুসলমানদের ধর্মীয় আদর্শ ও চারিত্রিক উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এখন দেখা যাক কোন আন্দোলন মুসলমানদের মাঝে কল্যাণ বয়ে এনেছে। দেওবন্দ আন্দোলন, না আলীগড় আন্দোলন।

ইতিহাস সাক্ষী, আলীগড় আন্দোলন সফল হয়নি। আলীগড় আন্দোলনের বলিষ্ঠ এজেন্ট এবং স্যার সৈয়দ আহমদের কট্টর অনুসারী শেখ মুহাম্মদ একরাম নিজেই এ সত্যি উদঘাটন করে বলেছেন, স্যার সৈয়দ আহমদ পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সাথে ঈমানে কামিল ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণকে জরুরী মনে করতেন। কিন্তু তিনি এতে সফল হতে পারেননি। (মাওজে কাওসার- ১৪৬)।

শেখ একরাম আরো বলেন, “মসজিদের চাটাইয়ের ওপর বসে যারা শিক্ষা লাভ করেছেন, যারা পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারে কাছেও যাননি, তাদের মধ্যে বড় বড় ইসলামী চিন্তাবিদ ও বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছেন। পরন্তু যারা কলেজের আকাশচুম্বি প্রাসাদের ভেতরে বসে শিক্ষা লাভ করেছেন, যারা পাশ্চাত্যের বড় বড় শিক্ষকদের কাছ থেকে জ্ঞান ও শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছেন, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীনতা এবং চারিত্রিক দীনতার কারণে বড় জোর কোনো দফতরের কেরানী হয়েছেন মাত্র”। (মাওজে কাওসার- ১৪৮)।

মোট কথা, দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আলীগড় থেকে এমন কোন খ্যাতিমান ইসলামী ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হননি, যারা দ্বীন ধর্মের খেদমত বা দেশ ও জাতির সেবায় উল্লিখযোগ্য কোন অবদান রেখেছেন।

অপরদিকে দেওবন্দ থেকে এমন হাজার হাজার ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে যে, সমস্ত পৃথিবী যাদের যোগ্যতা ও প্রতিভার সাক্ষ্য প্রদান করেছে। যারা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বলে বলীয়ান হবার কারণে শুধু ভারত নয়, সমস্ত পৃথিবীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (রাহ.)এর মত মহামনীষী। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী (রাহ.)এর মত রাজনীতিবিদ, মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রাহ.)এর মত হাদীস বিশারদ, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রাহ.)এর মত মুজাদ্দিদ, মাওলানা কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রাহ.)এর মত মুফতী, মাওলানা সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.)এর মত মুহাদ্দিস ও রাজনীতিবিদ, মাওলানা মুফতী মাহমুদ (রাহ.)এর মত সিংহ পুরুষ, মাওলানা ক্বারী তায়্যিব (রাহ.)এর মত হাকিমুল ইসলাম, মাওলানা মুহাম্মদ মিয়া (রাহ.)এর মত ঐতিহাসিক, মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রাহ.)এর মত মুফাসসির, মাওলানা ইলিয়াস (রাহ.)এর মত দাঈ মুবাল্লিগ একমাত্র দেওবন্দই জাতিকে উপহার দিয়েছে। কিন্তু আলীগড় এর শত ভাগের এক ভাগও দিতে পারেনি।

এবার আসা যাক, সনদের ব্যাপারে। সরকার কর্তৃক সনদ প্রদান, না সনদের মান প্রদানঃ যারা সনদের ব্যাপারে সরব তাদের উদ্দেশ্য কোনটা?

যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে কওমী মাদ্রাসায় লেখা-পড়া করে দাওরায়ে হাদীস পাস করার পরে সরকার ছাত্র-ছাত্রীদের এমএ পাস করার সার্টিফিকেট দেবে, (যেমনটা অনেকে বলে থাকেন, ক্বওমী মাদরাসায় পড়ে লাভ কি? সরকারী সার্টিফিকেট মিলে না, চাকুরিও পাওয়া যায় না) তাহলে এমন সার্টিফিকেটের পক্ষে আমি নই।

প্রথমতঃ কওমী মাদ্রাসায় লেখা-পড়া করার উদ্দেশ্য এক দল সার্টিফিকেটধারী মানুষ তৈরি করা নয় বা চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করা নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারীকায় জীবন পরিচালনা করা। নিজের আত্মাকে বিশুদ্ধ করতঃ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা অন্যকেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের হুকুমের প্রতি আহ্বান করা। আর এসব করতে সরকারী সার্টিফিকেটের কোন প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয়তঃ দ্বীনি শিক্ষার্থীদের জন্যে সরকারী সনদ গর্বের বিষয় নয়, আমি বলব লজ্জার বিষয়। কেননা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিচারের যোগ্যতা সম্পন্ন অভিজ্ঞ ব্যক্তির দেয়া সনদেরই মূল্য থাকতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি যে বিষয়ে অক্ষরজ্ঞান পর্যন্ত রাখেন না, সে বিষয়ে ওই ব্যক্তির দেয়া সনদ, সনদ বাহকের জন্য আনন্দের বিষয় হতে পারে না। বরং কলংকের। ইঞ্জিনিয়ার যদি ডাক্তারী সার্টিফিকেট দেন, কিংবা ডাক্তার যদি ব্যারিস্টারী সনদ দান করেন, তাহলে ডাক্তার, ব্যারিস্টার কি তা নিয়ে গর্ববোধ করতে পারবেন?

তদ্রুপ দ্বীনের সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে যাদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিচারের ক্ষমতাতো দূরের কথা, দূর সম্পর্কও নেই। তারা সরকার হোন বা অন্য কেউ তাদের কাছ থেকে সনদ নিতে যে কোন সত্যিকার দ্বীনি শিক্ষার্থী আত্মপ্রসাদ নয় বরং সংকট বোধ করবে। কওমী সনদের স্বীকৃতিঃ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে যারা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য যদি হয় যে, কওমী (বেসরকারী) মাদরাসায় লেখা-পড়া করে দাওরা হাদীস পাস করার পর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কওমী মাদরাসার ওলামায়ে কিরাম সনদ প্রদান করবেন আর সরকার শুধু ওই সনদ খানাকে স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন করবে, তাহলে দু শর্তের ভিত্তিতে এ মূল্যায়নে রাজী হওয়া যেতে পারে।

সরকার যদি নিজে উদ্যোগী হয়ে কওমি সনদের মান দিতে চায় এবং সনদের স্বীকৃতির নামে কওমী মাদরাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার হীন উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে, তাহলে নিঃশর্তভাবে হলে মানগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম শর্ত আরোপ করা যাবে না। তবে আমাদের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ২টা শর্ত অবশ্যই থাকতে হবে। যথা- (১) একাডেমিক স্বাধীনতা (২) প্রশাসনিক স্বাধীনতা। একাডেমিক স্বাধীনতাঃ মাদরাসা শিক্ষার কারিকুলামে কোন রকমের পরিবর্তন আনতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা যাবে না। এ ব্যাপারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার কারিকুলামে (দরসে নেজামীতে) পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা হলে, কওমী মাদ্রাসার ঐতিহ্য, স্বকীয়তা, রুহানিয়্যাত বা আধ্যত্মিক শক্তি বহাল থাকবে না। কওমী মাদ্রাসা তার অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য হারাবে। কওমী মাদ্রাসা সমূহ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কওমী মাদরাসাগুলোকে আমাদের আলীয়া মাদ্রাসাগুলোর ন্যায় করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রশাসনিক স্বাধীনতাঃ কওমী মাদরাসাগুলোর প্রশাসনিক ডিপার্টমেন্টেও কোনো রকমের হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এ ব্যাপারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পুর্নস্বাধীনতা থাকতে হবে।

সত্যি বলতে কি, কওমী মাদ্রাসা হচ্ছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে নেই কোনো সন্ত্রাস, নেই কোনো রাজনীতি, নেই কোনোগুলির আতঙ্ক আর হল দখলের মহড়া। বাস্তব সত্যি হলো, কওমী মাদরাসা কোনো মায়ের বুক খালি করে না, বরং মায়ের অতি আদরের ছোট শিশুটিকেও যোগ্য মানুষ বানিয়ে পুুনরায় মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়। কওমী মাদরাসার প্রশাসনিক বিভাগে সরকার হস্তক্ষেপ করলে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির ন্যায় কওমী মাদ্রাসাগুলোতেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-কলহ, মারামারি, খুন-খারাবি, অস্ত্রের ঝন-ঝনানি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, বিক্ষোভ, ঘেরাও, সংঘর্ষ, ধর্মঘট ইত্যাদি অহরহ চলবে; এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবুও মনের ভিতরে একটা কিন্তু জমা পড়ে আছে। সরকার আজ নিঃশর্ত স্বীকৃতি দিলেও, কিন্তু পরবর্তীতে সরকারের মনোভাব যে এমন থাকবে, তার গ্যারান্টিই বা কোথায়? তাছাড়া সরকার পরিবর্তনের ব্যাপার তো আছেই। নতুন সরকার কি নতুন উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু বিবেচনা করবে না? একবার সরকারী স্বীকৃতি বা সনদের মান গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ঢুকে গেলে, পরবর্তীতে যদি সরকার কওমী লক্ষ্য উদ্দেশ্যের প্রতিকূলে কোন কিছু চাপিয়ে দিতে চায়, তখন এই প্রক্রিয়া থেকে সকল কওমি মাদ্রাসাকে বের করা যাবে তো? এসব দিকও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

সরকারী স্বীকৃতির নামে কওমী মাদরাসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে না তো? কওমী মাদরাসা কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে না তো? এসব নিয়ে আজ দেশের দূরদর্শী ওলামায়ে কিরাম বেশ চিন্তিত। সিলেটের ওলামায়ে কেরাম বিশেষ করে ‘পূর্ব সিলেট ‘আযাদ দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ এর ওলামায়ে কিরাম বেশ চিন্তিত। তারা তো স্বীকৃতির একেবারেই বিপক্ষে।

আমার তো মনে হয়, স্বীকৃতি দিলেও আমাদের তেমন একটা লাভ হবে না। বরং ক্ষতির আশংকাটাই বেশি। সরকার যদি স্বীকৃতি দিয়ে চাকুরি দিতে এতটাই আন্তরিক হয়, তাহলে যাদের সরকারী সনদ আছে তারা সরকারের উপর লেভেলে চাকুরি পাচ্ছেন না কেন? সরকারী সনদ প্রাপ্তরা মসজিদের ইমাম ও কাজীগিরি ছাড়া উচ্চ লেভেলের চাকরিতে ঢুকতে পারছেন না কেন? কেন সরকারী সনদ ওয়ালারা এখনও কলেজ ভার্সিটিতে ভর্তি হতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন? এমনকি কোন প্রাইমারী স্কুলেও সরকারী মাদ্রাসার কোন সনদধারী আলেমকে দেখা যায় না কেন?

ধরে নিলাম, সরকারী স্বীকৃতি নিয়ে কওমী ওয়ালারা সরকারের উচ্চ পদে চাকুরি পেলেন, লম্বা লম্বা বেতন ভাতাও পেলেন। কিন্তু যদি সরকার অন্যায় কোনো কাজ বা শরীয়ত পরিপন্থী কোনো কাজ করে বসে, তখন কি সরকারের বেতনভোগী ওলামায়ে কিরাম তার প্রতিবাদ করতে পারবেন? পারবেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে? সত্যি কথা সরকারের সামনে তুলে ধরতে পারবেন? তখন কি চাকুরি হারানোর ভয় থাকবে না? তখন অনেকেই চাকুরি হারানোর ভয়ে সরকারের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকবেন। আর এটাই স্বাভাবিক। ‘নুন খাইলে গুণ গাইতে হয়’ এটা স্বাভাবিক। তখন ঈমান-আক্বীদার আন্দোলনের কী হবে?

তখন আমাদরে মাঝে ফাটল সৃষ্টি হবে। আমরা আমাদের একদল ভাইকে হাত ছাড়া করব। একদল অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, আর অপর দল চাকুরি হারানোর ভয়ে সরকারের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকবে। অথচ কওমী মাদরাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশের মধ্যে অন্যতম হল, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ। এ বিষয়গুলো ও আমাদের মাথায় রাখা দরকার।

পরিশেষে বলছি, কওমী মাদ্রাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একদল সনদধারী মানুষ তৈরি করা নয়। আর চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করাও নয়। তবুও যদি সরকার নিঃশর্তভাবে স্বীকৃতি দিতে চায়, তাহলে আমরা গ্রহণ করব। তবে স্বীকৃতি হতে হবে দারুল উলূম দেওবন্দের আদলে। যেভাবে হাটহাজারীর মুহতামিম সাহেব (দা.বা.) বলেছেন, সেভাবেই দিতে হবে। আর আমাদেরকেও খুব সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে কওমী মাদ্রাসার স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য কেউ নষ্ট করতে না পারে। আমরা যেন কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে না পড়ি। আমরা যেন আমাদের আকাবিরদের রেখে যাওয়া আমানত সঠিকভাবে হেফাজত করতে পারি।

আল্লাহ তাআলা যেন দ্বীনের ধারক ও বাহক কওমী মাদরাসা সমূহকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের ভয়াল থাবা থেকে হেফাজতে রাখেন। আমীন॥


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি