দেখি যে শত্রু ঘরে -মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

ছেলেবেলায় স্কুলের পাঠ্যবইয়ে একটি কবিতা পড়েছিলাম। কবিতার দু’টি ছত্র আজও মনে আছে। কবিতাটি অই ছত্রেরই কিনা, কিংবা আরো কয়েক ছিল, এ সব আর মনে নেই। মনে নেই কবির নামও। ছত্র দু’টি নিম্নে উদ্ধৃত হলো-

শত্রু খুঁজিতে বাহির হইয়া

          পাই না কোথাও তারে,

তারপর খুঁজি আপন হৃদয়,

          দেখি যে শত্রু ঘরে

সেকালের বয়সে এই কবিতার ভাবার্থ বুঝবার কথা নয়। শিক্ষক যে অর্থ করে বুঝিয়েছিলেন, তাতে সেকালে এর গুঢ় তত্ত্ব নিশ্চয় বোধগম্য হয়নি। তবু সেকালে, পাঠ্য পুস্তকের কবিতায়, গল্পে উপদেশ, নীতিবাক্য এসব থাকতোই। বর্তমান যুগে তো ‘ইতল বিতল গাছের পাতা’ দিয়ে লেখা পড়া শুরু আর ঘোড়ার ডিম দিয়ে শেষ। আজকের আলোচ্য বিষয় লেখা পড়া নয়। তাই যথাপ্রসঙ্গের দিকে যাচ্ছি।

আল্লাহ প্রেরিত শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশের লোকে তো বটেই, তাছাড়াও মক্কার অন্যান্য বংশের লোকেরাও তাঁকে ভালবাসতো, বিশ্বাস করতো। তাঁকে একজন সচ্চরিত্র ব্যক্তি ভাবতে কারো দ্বিধা ছিল না।

৬১০ ঈসায়ী সালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়্যাত প্রাপ্ত হন আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিলের মাধ্যমে। আরব দেশের লোকেরা ইতঃপূর্বে পথভ্রষ্ট ছিল। শয়তানের দাগাবাজিতে তারা আল্লাহর ইবাদত না করে মক্কার কাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে সেগুলির ইবাদত করতো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে নিরাকার আল্লাহর একত্ববাদের কথা বললেন। বললেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই; মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল’। তিনি মক্কাবাসীকে আল্লাহর দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন।

হযরত আবু বকর (রাযি.), বিবি খাদিজা (রাযি.), হযরত আলী (রাযি.), হযরত ওসমান (রাযি.) প্রমুখ কয়েকজন বিনা দ্বিধায় দ্বীন ইসলাম কবুল করলেন। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশের কতিপয় ব্যক্তি তাঁর ইসলাম প্রচারের পর থেকে শত্রুতে পরিণত হলো। এই গৃহ শত্রুরা ছিল আবার নেতৃস্থানীয়। ঘরের শত্রুদের সঙ্গে কালক্রমে ইহুদী নাসারাও জোটবদ্ধ হলো।

শত্রুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন ৬২২ ঈসায়ী সালে। এই সময় থেকে যে সাল গণনা করা হয় তার নাম হিজরী সাল। ইসলাম ধর্ম অনুসারী মুসলমানদের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ হিজরী সাল অনুসারে হয়ে থাকে। দ্বীনি ব্যাপারেও হিজরী সালের হিসাব, যেমন শবে-বরাত, রমযানের রোযা (সিয়াম), শবে-ক্বদর, ঈদুল ফিতর, হজ্জ্ব, ঈদুল আযহা, শবে-মিরাজ ইত্যাদি সবই হিজরী সালের হিসাবে নির্ণয় করা হয়। তথাপি অধূনা কোনো কোনো মুসলিম দেশেও ঈসায়ী সাল হিসাব-নিকাশে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইসলামের দ্বীনি ব্যাপারে তা কার্যকর করা কারো পক্ষে এ যাবৎ সম্ভবপর হয়নি। তুরস্কে সরকারীভাবে মোস্তফা কামাল পাশা ইসলাম উৎখাত করতে পারলেও কাউকে তুর্কী ভাষায় নামায পড়াতে পারেননি।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীরাও মাদীনায় গিয়ে সমবেত হলেন। মদীনার কতিপয় লোক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর অনুসারীদের আশ্রয় দিলেন, তাঁর প্রচারিত দ্বীন কবুল করলেন। এভাবেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলামী হুকুমত। মক্কার কাফিররা নওমুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধিতে শংকিত হলো। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান চালালেন।

প্রথম যুদ্ধটি বদরযুদ্ধ নামে খ্যাত। এ সময়ে মুসলমানের সংখ্যা অতি আল্প ছিল। মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান এই যুদ্ধে অগ্রসর হন। কাফিরদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। তবু আল্লাহর মর্জি এবং গায়েবী মদদে তিন গুণ কাফিরের উপর মুসলমানের বিজয় অবশ্যই অভাবনীয়। তবু তা’ সম্ভব হয়েছিল।

আর, আজ বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা মার খাচ্ছে। চীনের জিনজিয়াং এ মার খাচ্ছে। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে (সাবেক আরাকান) মুসলমান অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। কাশ্মীরের (ভারত অধিকৃত) স্বাীধনতাকামী মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে ভারতীয় বাহিনী হত্যা করে চলেছে। ফিলিস্তিন অবশ্যই মুসলমানের দেশ। সেখানে ইহুদীরা ছিল পরগাছা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়া আমেরিকা ব্রিটেনের মদদ পেয়ে পরগাছা ইহুদীরা ফিলিস্তিনের কিয়দংশ দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু দেশটির জন্মগত অধিবাসী মুসলমানরা সেই অবধি মার খেয়ে চলেছে, নিজ গৃহে পরবাসী হয়ে রয়েছে। কসাই ইহুদীদের নিষ্ঠুর নির্যাতনে তারা আজ বাড়ি ছাড়া, দিশেহারা। তাদের পাশে দাঁড়াবার মতো মুসলমান আজ বিশ্বের কোথায়ও নেই। থাকবে কী করে? কবি নজরুল খেদ প্রকাশ করেছেন তার কবিতায়-

আল্লাহতে যাঁর পূর্ণ ঈমান

কোথা সে মুসলমান,

কোথা সে আরিফ আবেদ যাঁহার

জীবন মৃত্যু জ্ঞান।।

যার মুখে শুনি তৌহিদের কালাম

ভয়ে মৃত্যুও করিত সালাম

যাঁহার দ্বীন- দ্বীন রবে কাঁপিত দুনিয়া

জীন পরী ইনসান।।

স্ত্রী-পুত্র আল্লাহরে সঁপি

জেহাদে যে নির্ভীক

সে হে কোরবানী দিত প্রাণ হায়,

আজ তারা মাগে ভিখ।

কোথা সে শিক্ষা আল্লাহ ছাড়া

ত্রিভূবনে ভয় করিত না যারা

আজাদ করিতে এসেছিল যাঁরা

সাথে লয়ে কুরআন।।

কবি নজরুলের খেদোক্তি অহেতুক নয়। বিশ্ব মুসলিমের দিকে দৃকপাত করলেই তার প্রমাণ মিলে যাবে। আল্লাহতে পূর্ণ ঈমান, আস্থা, ভরসা না থাকার কারণে নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য কোনো গায়েবী মদদও আসে না। মুসলমানে মুসলমানে আজ বিশ্ব ব্যাপী গৃহ কোন্দল, বিশেষতঃ মুসলিম দেশে। যেখানে কেউ আল্লাহর সাহায্য কামনা করে না। তারা হাত পাতে রাশিয়া, আমেরিকা কিংবা এরূপ কোনো বৃহৎ শক্তির কাছে।

আর তারা তো বানরের পিঠা ভাগের মতো কায়দা করে মুসলিম দেশের সম্পদ ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। সাহায্যের হাত কি অমনিতেই বাড়ায়? অধুনা স্বার্থ ছাড়া কোনো বুদ্ধিমান কাজ করে না। যারা তা’ করে তারা একবারেই নির্বোধ।

কুরআন পাকে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘ইহুদী এবং মুশরিকদেরকে তোমরা ঈমানদারদের প্রধান দুশমনরূপে দেখতে পাবে’। (সূরা মায়েদা-৮২)।

কুরআন পাকে আরো ইরশাদ এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীস্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ কর না। তারা পরস্পরের বন্ধু। এবং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, সে তাদেরই একজন হয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারীদের হিদায়াত করেন না’। (মায়েদা- ৫১)।

কুরআন পাকের এই নির্দেশনা মহানবী (সা.)এর সময়ে যেমন সত্য ছিল, তেমনি আছে আজও। তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে কাশ্মীরে, গুজরাটে, অযোধ্যায়, চীনের জিনজিয়াং এ, মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এবং বিশ্বের আরো বহুদেশে।

আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ঘোষণায় আমেরিকা থেকে মুসলমান উচ্ছেদের ওয়াদা ছিল। ওয়াদা না থাকলেও, আমেরিকার খ্রীস্টানরা মুসলমানদের মিত্র কোনো দিনই হয়নি। তাই মুসলমান উৎখাত প্রচষ্টা থাকবেই ধরে নিতে পারি। মুসলিম সিরিয়ায় বেশ কিছুকাল ধরে মুসলিম নিধনযজ্ঞ চলছে কোন কায়দায়, এটা ভেবে দেখা আবশ্যক। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। আর বিদ্রোহী গ্রুপ সহায়তা পাচ্ছে আমেরিকার। কুরআন ঘোষিত দুশমনরা সিরিয়ার দুই দলে বিভক্ত মুসলমানদের সহায়তা দিচ্ছে। আসলে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু।

বাশার জিতলে তাকে চলতে হবে রাশিয়ার অঙ্গুলি হেলনে। আর, বিদ্রোহী গ্রুপ জিতলে তাকে চলতে হবে আমেরিকার অঙ্গুলি হেলনে। নতজানু হয়ে কারো কাছে যে স্বাধীনতা ভোগ করা, তাকে স্বাধীনতা বলে না। তাকে অবশ্যই গোলামী বলা সমীচীন। যেমন স্বাধীনতা ভোগ করছে ইরাক, আফগানীস্তান বিদেশী খ্রীস্টান সেনাবাহিনীর প্রহরায়। যারা আল্লাহর নির্দেশ না মেনে দাবীর মুসলমান, তাদের অবস্থা এরূপই হওয়া স্বাভাবিক।

যারা মুসলমানদের ঘোষিত শত্রু তারাই আসে বানরের পিঠা ভাগ করে দিতে। কিন্তু যে মুসলমান পরস্পর পরস্পরের ভাই হবার কথা, তারা কিন্তু মুসলমান দেশের কোথাও মুসলমানদের মধ্যে গৃহকোন্দল এবং খুনোখুনি লাগলে নির্বিকার হয়ে তামাশা দেখে। দরকার হলে, বরং মুসলমানের সর্বনাশ ঘটতে থাকলে, যারা ঘটায়, তাদেরই সহায়ক হয়, অন্ততঃ ট্রানজিট দিয়ে হলেও। ইরাক, আফগান দখলের সময় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানে না, কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা উপেক্ষা করে, তারা ঈমান হারা।

আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকে ইরশাদ করেন, ‘আমি অবশ্যই শয়তানদেরকে বেঈমানদের বন্ধু করেছি’। (সূরা আরাফ-২৭)। অতএব, শয়তানের বন্ধুদের দ্বারাও মুসলমানদের কোনো উপকার পাওয়ার আশা নেই। আল্লাহ তো তাঁর কিতাবে সাবধান করে দিতে ইরশাদ করেন, “হে বনি আদম, শয়তান যেন  তোমাদেরকে বিপদে না ফেলে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে বের করেছিল বেহেস্ত হতে -নামিয়ে নিয়েছিল তাদের পোষাক, তাদেরকে গোপন অঙ্গ দেখানোর জন্য। সে এবং তার দল যেভাবে তোমরা তাদেরকে দেখতে না পাও, সেই ভাবে তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকে। আমি অবশ্যই শয়তানদেরকে বেঈমানদের বন্ধু করেছি”। (সূরা আরাফ- ২৭)।

শয়তান দৈনন্দিন তার দল ভারী করে চলছে। যারাই শয়তানের কুমন্ত্রণায় ভুলে আল্লাহর কুরআনের নির্দেশ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়া আইনের বরখেলাফ করে চলে, তখন সে বেঈমান হয়ে যায়। আর, তখনই সে শয়তানের ভাই। সে তখন আর মুমিন মুসলমানের ভাইও নয়, বন্ধুও নয়। অতএব, তাকে তখন ইহুদী-নাসারা মুশরিকের পাশে দেখা যাবে, মুসলমানের পাশে নয়। কেননা, সে তখন আর মুসলমানদের হিত কামনা করে না। বরং সেও চায় মুসলমান ধ্বংস হোক। তখনও যদি সে নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়, তবে তাকে বলবো আত্মঘাতী মুসলমান।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর ইসলামী হুকুমতের দায়িত্বে আসেন তাঁর অন্যতম সাহাবী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.)। তিনি ইসলামী হুকুমতের প্রথম খলিফা। তিনি দায়ীত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম ভাষণে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন- ‘আমি যতক্ষণ আপনাদেরকে আল্লাহর কুরআন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস মোতাবেক কোনো নির্দেশ দেবো, আপনারা তা মেনে নিবেন। কিন্তু যদি আমি তার বাইরে গিয়ে কোনো নির্দেশ দেই, আপনারা তা মানবেন না’। এই হলো ইসলামী হুকুমতের নমুনা। এই হলো আসল গণতান্ত্রিক অধিকার।

এখানে স্বৈরাচারিতার কোনো সুযোগ নেই। এখানে শাসন কর্তৃত্ব পেয়ে কেউ মনগড়া আইনে দেশ শাসন করার সুযোগ পায় না। হযরত আলী (রাযি.) ছিলেন ইসলামী হুকুমতের চতুর্থ খলিফা। প্রথম চার খলিফাকে বলা হয় খোলাফায়ে রাশিদীন। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.)র পরবর্তী তিন খলিফাই আততায়ী কর্তৃক নিহত হন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাযি.)র হত্যাকারী ছিল একজন পার্শিক। তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান গনী (রাযি.)এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মিসরীয়রা। তাদের বক্তব্য ছিল প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগে খলিফা স্বীয় আত্মীয়বর্গের প্রতি পক্ষপাত করেন। এই অজুহাতে দুই সশস্ত্র মিসরীয় খলিফাকে হত্যা করে।

হযরত আলী (রাযি.) মদীনা থেকে ইসলামী খেলাফতের রাজধানী কূফায় স্থানান্তর করেন। সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়া খলিফার বশ্যতা স্বীকার করেননি, বরং মিসরের শাসন কর্তৃত্বও দখল করে নেন। খেলাফতের ঐক্যে ভাঙন এখান থেকেই শুরু। হযরত আলী (রাযি.)এর ইন্তিকালের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান (রাযি.) খেলাফত প্রাপ্ত হন। হযরত মুয়াবিয়া তখনো অবাধ্য। হযরত হাসান (রাযি.) ছিলেন অত্যন্ত নিরীহ মানুষ। তিনি নির্বিরোধ জীবন যাত্রার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি খেলাফতের দায়িত্ব হযরত মুয়াবিয়াকে ছেড়ে দিয়ে মদীনায় ফিরে যান এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন থাকেন। হযরত মুয়াবিয়া বিদ্রোহী খলিফা ছিলেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বে তৎপুত্র ইয়াজিদকে খলীফা মনোনীত করে যান। এখান থেকেই খেলাফত রাজতন্ত্রের পরিণত হয়।

খোলাফায়ে রাশিদীনের শাসন আমল পুরোপুরি কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ছিল। তার পর থেকেই ভেজাল শুরু হয়ে যায়। খোলাফায়ে রাশিদীনের শাসনামলে খেলাফত ১০টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। হযরত মুয়াবিয়া কেন্দ্রীয় শাসন না মানলেও, খেলাফত দ্বিধাবিভক্ত হয়নি। বিভক্তি এসেছে আরো পরে। প্রায় অর্ধ্ব জগৎ ছিল খেলাফতের শাসনাধীন। রাজতন্ত্র আর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব থেকে মুসলমান শাসকবর্গ ক্রমে ক্রমে কুরআনী আইনের সঙ্গে তাদের মনগড়া আইন যুক্ত করে খিচুড়ী পাকাতে শুরু করে।

সেকালের ইসলাম বেত্তা খ্যাতিমান আলেম-ওলামাগণ শাসকদের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরোধিতা করেছেন। ফলতঃ সেকালেও তারা নির্যাতিত হয়েছেন শাসকবর্গের হাতে। তবু সমর্থন করেননি শাসকবর্গের অনৈসলামিক কর্মকান্ড। আল্লাহর ভয়, পরকালের বিশ্বাস যাদের থাকে, তারা দুনিয়ার কোনো ব্যক্তির আদেশে অনৈসলামিক কর্মকান্ডকে সমর্থন জানাবে না।

হযরত আলী (রাযি.)এর খেলাফতের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধাচারণ যারা করতো, তারা খারেজী নামে পরিচিত হয়। তাঁর ইন্তিকালের পরে তাঁর পরমভক্তের উদ্ভব হয়; তারা শিয়া নামে কথিত। শিয়াদের কোন কোন গোত্রকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত মুসলমানই স্বীকার করেন না। কারণ, মুসলমান হওয়ার প্রথম শর্ত ঈমান। ঈমান শুধু মুখে বলার বিষয় নয়। মুখে যা বলা হবে, তার প্রতি মনে মনে একনিষ্ঠ থাকা এবং সেমতে আমল করা। ঈমানের প্রথম সবক, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ’। শিয়া সম্প্রদায় বিসমিল্লাহতেই গলদ করে ফেলেছে। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)এর চাইতে হযরত আলী (রাযি.)কে অধিক গুরুত্ব এবং মর্যাদা দিয়ে থাকে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলবার অবকাশ ছিল। আমি সেদিকে যাচ্ছি না।

তবে সহজ বোধগম্য যে ব্যাপারটা শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা ১০ই মহরম যা ঘটাচ্ছে, তা ইসলামের বিধান বহির্ভুত। মহরাম মাসের ১০ তারিখে হযরত আলী (রাযি.)এর পুত্র হযরত ইমাম হোসেন এবং তাঁর পরিবারের পুরুষ সদস্যগণ ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে কারবালা ময়দানে নির্মমভাবে শহীদ হন। এটা অবশ্যই সকল মুসলমানদের কাছে বেদনার বিষয়। সেই শোক পালনে তাযিয়া (মূর্তিতূল্য)সহ মিছিল করে মর্সিয়া গাওয়া মুসলমানের কুরআন-হাদিসের বিধান বহির্ভুত। একান্ত আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতেও বুক চাপড়িয়ে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এই দিনটিকে আশূরা বলা হয়। এ দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

এই দিনে আসমান, জমিন, লওহ ,কলম সৃষ্টি হয়। এই দিনে হযরত আদম (আ.) দুনিয়ায় অবতরণ করেন। হযরত নূহ (আ.)এর যামানায় মহাপ্লাবনের পর এই দিনে তিনি কিশতি থেকে পৃথিবীতে পদার্পন করেন। এই দিনে হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই দিনে হযরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং এই দিনেই আল্লাহ তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন। এধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আরো অনেক আছে। হযরত ইমাম হোসেন (রাযি.) এই দিনে কারবালায় শহীদ হন ৬১ হিজরী সালে। অর্থাৎ আজ থেকে ১৩৭৬ বছর আগে। এদিনে মুসলমানদের মাতম করার আবশ্যক নেই। এদিনে নফল রোযা রাখলে সওয়াব পাওয়া যায়। তাযিয়ার মাতলামী করায় গুনাহ্র খাতাই ভারী হয়। কবি নজরুল ইসলাম তাঁর ‘মোহররম’ কবিতার উপসংহারে লিখেছেন,

‘ফিরে এলো পুনঃসেই মোহররম মাহিনা,

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না’।

বলা-ই যেতে পারে যে, শিয়াদের আশূরার দিনে তাযিয়া মিছিল পৌত্তলিকতার সামিল। ইসলাম তৌহিদী ধর্ম, এখানে মুর্তি বা প্রতীকের স্থান নেই। বাহাইয়া নামে আরেকটি সম্প্রদায় নিজেদের মুসলমান বলে দাবী করে। কিন্তু আল্লাহর কুরআন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের বিধি-বিধান অনুসরণ করে না।

আহমদীয়া নামে আরেকটি সম্প্রদায় নিজেদের মুসলমান বলে দাবী করে। এরা খতমে নবুয়ত মানে না। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী, এ কথা তারা স্বীকার করে না। তাদের নবী গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। (নাউযুবিল্লাহ)। তার জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবে, কাদিয়ান নামক স্থানে। তাই এদেরকে কাদিয়ানীও বলা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে গোলাম আহমদ নিজেকে নবী বলে দাবী করে। বিভ্রান্ত কিছু লোক তাকে সমর্থন করে। খ্রীস্টানদের রাজত্বে অনায়াসে তার নবী হওয়া সম্ভবপর হয়েছিল। ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসানের পর আহমদীয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবী ওঠে। কিন্তু সে দাবী টেকানো যায়নি। কারণ, শাসন ক্ষমতায় যারা ছিলেন তাদের মধ্যে দ্বীনদার মুসলমান থাকলে তো দাবীটি বিবেচনায় আসবে। পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্র মন্ত্রী চৌধুরী জাফরুল্লাহ ছিলেন আহমদীয়া সম্প্রদায় ভুক্ত। আর, গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ খুব পরহেযগার মুসলমান ছিলেন, এমন খবরও জানা যায় না। অতএব, আহমদীয়াদের মুসলমান পরিচয়কে ঠেকায় কে?

মুসলিম সাম্রাজ্যে ভেজাল শুরু হয়ে গেছে খোলাফায়ে রাশিদীনের শাসনামলের পর থেকেই। তারপর খেলাফতী সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হতে হতে মুসলিম শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। খ্রীস্টানদের সাম্রাজ্য ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়। ইউরোপের স্পেন থেকে মুসলিম শাসনের উৎখাত হয় ২০০ বছর ব্যাপী ক্রুসেডের মাধ্যমে। খেলাফত সংকুচিত হতে হতে একমাত্র তুরস্কে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

প্রথম মহাযুদ্ধের পর তুরস্কের সুলতানকে পদচ্যুত করেন সেনানায়াক মোস্তাফা কামল পাশা। তিনি গণতন্ত্র ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, দেশ থেকে ইসলাম এবং আরবী ভাষাকে বিদায় দেবার আয়োজনেও লেগে গেলেন। বলতে গেলে, ১০০% মুসলমানের দেশ তুরস্কে মুসলমানদের অবস্থা বড়ই সঙ্গীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে এরদোগানের শাসনে তুরস্কে ক্রামান্বয়ে ইতিবাচক পরবর্তন লক্ষ্যনীয়। খেলাফত ভুক্ত আরেকটি মুসলিম দেশ মিসরে এখন সেনা শাসনে ইসলামের নিভু নিভু অবস্থা। ইন্দোনিশিয়া বৃহত্তম মুসলিম দেশ হলেও সেখানে মুসলমান আছে।

ইসলাম যেমন মহানবী (সা.) প্রচার করেছিলেন, তেমনটি আর নেই। যামানা এমন হয়েছে, সবাই কুরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ কর্মানুষ্ঠান চালিয়ে মুসলমান থাকতে চায়। আল্লাহর নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষয়কে আমরা সভ্যতা ও প্রগতি হিসেবে দেখতে পাই।

দ্বীনদারী পরহেযগারী মুসলমানদের এখন ব্যক্তিগত এবং ঘরোয়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কোনো পরিবর্তন সাধন মানুষের পক্ষে অসাধ্য। যদি আল্লাহ তাআলার মর্জিতে কিছু হয়, সেই ভরসাতে থাকা ছাড়া দৃশ্যমান রাহা নেই।

নিজ দেশে পরবাসী নির্যাতিত আটলাখ রোহিঙ্গা মুসলমানদের সীমাহীন দুঃখ দুর্দশা সহ্য করবার নয়। তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের বাড়ী ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের দোকানপাট লুঠ করা হচ্ছে। তাদের নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। দেশ ত্যাগ করে সমুদ্রে ভাসছে; কোনো দেশ স্থান দিতে রাজি না। বাংলাদেশে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান শরণার্থী মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

একটা দেশে হাজার হাজার বছর বসবাস করেও রোহিঙ্গা মুসলমান সেই দেশের নাগরিক হতে পারেনি। কী সীমাহীন অত্যাচার, অবিচার, পাশবিক নির্যাতন মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর। অথচ এই কসাই রাষ্ট্রের নেত্রী অংসান সূচী পেয়েছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। চমৎকার! ইসরাইলের আইজাক রবীনও ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চালাবার পরও পেয়ে যায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। মনে হচ্ছে মুসলমান হত্যায় রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারলেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে আর কোনো বাঁধা নেই।

পরিশেষে সকল দেশের মুসলমানদের বলছি, গৃহযুদ্ধ, গৃহকোন্দল পরিহার করো। স্বজাতির সর্বনাশ করতে বাইরের শত্রুকে মিত্র ভেবে ঘরে ডেকে এনো না। নিজেদের কোন্দল নিজেরা ফয়সালা করো। #

 

[কৌরিখাড়া, নছারাবাদ, পিরোজপুর থেকে]


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি