জিজ্ঞাসা-সমাধান

Giggasa-Somadhanজিজ্ঞাসা-সমাধান

ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ

আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

কুরবানী প্রসঙ্গে

(৭৮২০) মুহাম্মদ আব্দুল আলিম, গাইবান্ধা

জিজ্ঞাসাঃ (ক) কোনো ব্যক্তির ৪/৫টি গরু আছে। তার মধ্যে ২টি গরু হাল চাষের কাজে আসে, বাকীগুলো কাজে আসে না। আর এ গরুগুলো ছাড়া তার কাছে ক্যাশ কোনো টাকা নাই। আমার প্রশ্নো হলো, বাকী গরুগুলো থাকা অবস্থায় তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে কি না?

(খ) কোন ব্যক্তির ১০ বা ১২ বিগা জমি আছে। ৫ বা ৬ বিগা জমির ফসল দিয়ে পুরা বছরের খরচ চলে যায়। বাকী জমি থাকা অবস্থায় তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে কি-না?

(গ) কোন ব্যক্তির একটা দোকান আছে। যদি দোকানের মাল হিসাব করে, তাহলে নিসাব পরিমাণ হয়। কিন্তু তার কাছে ক্যাশ টাকা নেই। এই অবস্থায় তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে কি-না?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে, (ক) হাল চাষের গরু দুটি ছাড়া বাকী দুটি বা তিনটি গরুর মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা, অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের সমপরিমাণ হয়, তাহলে তাঁর উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।

আর গরুর মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ না হয়, কিন্তু ঐ ব্যক্তির নিকট যদি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়াও অতিরিক্ত কোনো জিনিসপত্র থাকে, যার মূল্যের সাথে গরুর মূল্য মিলালে উভয়ের মূল্য নিসাব পরিমান হয়ে যায়, তাহলেও তাঁর উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। আর যদি ঐ ব্যক্তির নিকট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া অন্য কোনো অতিরিক্ত জিনিসপত্র না থাকে এবং গরুর দামও নিসাব পরিমাণ না হয়, তাহলে তাঁর উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে না।

(খ) বাকী জমির মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তাঁর উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।

(গ) ক্যাশ টাকা না থাকা সত্ত্বেও যেহেতু ব্যবসার মাল নিসাব পরিমান হচ্ছে, তাই তাঁর উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। (ফাতাওয়ায়ে বাযযাযিয়া- ৩/১৫৫, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/১৯২, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ১৭/৪০৫ ও ৪০৬, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৯/৫২০, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া- ১০/৩৫, ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া- ৫৫৩, কিতাবুল ফাতাওয়া- ৪/১৩১)।

 

নামাযের দাঁড়ানো প্রসঙ্গে

(৭৮২১) মুহাম্মদ আল-আমীন, ময়মনসিংহ

জিজ্ঞাসাঃ নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় দুই পায়ের মাঝখানে কতটুকু পরিমাণ ফাঁকা রাখবে? কাতারে পরস্পর পা লাগিয়ে দাঁড়াবে কি-না, দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ কুরআন-হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে, দুই পায়ের মাঝখানে ফাঁকা রাখা সুন্নাত। যে পরিমাণ ফাঁকা রেখে দাঁড়ালে খুশুখুজুর সাথে নামায আদায় করা যায়, সেভাবে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। সাধারণতঃ হাতের মিলিত চার আঙ্গুলের পরিমাণ ফাঁকা রেখে দাঁড়ালে খুশুখুজুর সাথে নামায আদায় করা যায়। এ কারণে হানাফি ফক্বিহগণ বলেছেন, দু’পায়ের মাঝে চার আঙ্গুল পরিমাণ ফাঁকা রাখা মুস্তাহাব।

হাদিসের যে অংশে পরস্পর পা লাগিয়ে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ রয়েছে, তা রাবী নিজে থেকে অতিরিক্ত বলেছেন। রাবীর উদ্দেশ্য হলো, কাতারের মাঝে ফাঁকা না রেখে কাতার সোজা রেখে দাঁড়ানো। কাতার সোজা রাখার কথা একাধিক হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। যদি রাবী’র কথা অনুযায়ী আমল করা হয়, তাহলে হাদিসের অপর অংশ কাঁধে কাঁধ মিলানোর উপর আমল করা কষ্টকর হয়ে যাবে এবং এতে খুশুখুজুও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তার উপর আমল না করে যেভাবে দাঁড়ালে কাতার সোজা থাকে এবং খালি জায়গা না থাকে, খুশুখুজু ঠিক থাকে, সেভাবে দাঁড়ানো উচিত। (সূরা বাক্বারা- ২৩৮, তাফসীরে মাযহারী- ১/৩৩৭, নাসায়ী শরীফ- ১/১০৩, ফাতহুল বারী- ২/২৭৪, ফয়জুল বারী- ২/৩০২, বজলুল মাজহুদ- ১/৩৫৮, মাআরিফুস সুনান- ২/২৯৮, উমদাতুল ক্বারী- ৪/৩৬০, রদ্দুল মুহতার- ২/১৬৩, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল- ৩/৩৫২, ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া- ৩০৫, খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/৫৪)।

 

জমি বন্ধক দেওয়া প্রসঙ্গে

(৭৮২২) মাওলানা আল-আমিন, নেত্রকোনা

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তি থেকে টাকা নিয়ে তার কাছে একটি জমি বন্ধক রাখে। শর্ত থাকে, জমি ওয়ালা যতদিন এই টাকা ফেরত দিতে না পারবে, ততদিন টাকাওয়ালা জমি ভোগ করবে। এর বিনিময়ে কোনো টাকা কর্তন করা হবে না। এখন আমার জানার বিষয় হল-

(ক) উক্ত প্রচলনটি শরীয়ত সম্মত কি-না?

(খ) আর যদি শরীয়ত সম্মত না হয়, তাহলে জায়েয হওয়ার মতো ভিন্ন কোন পদ্ধতি আছে কি-না, জানালে উপকৃত হব।

সমাধানঃ হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে- (ক) আপনাদের এলাকার প্রচলিত জমি বন্ধকের প্রথাটি শরীয়তে নাজায়েয। এটি মূলতঃ সুদভিত্তিক ঋণ প্রদানেরই একটি প্রকারভেদ।

(খ) শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি হচ্ছে, বন্ধকি চুক্তি না করে ভাড়া চুক্তি করবে। যেমন- কারো যদি ২০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়, আর এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া হয় দুই হাজার টাকা, তবে তিনি ১০ বছরের জন্য জমিটি নিয়ে নিবেন। তারপর যত বছর অর্থদাতা জমি ভোগ করবেন তত বছরের ভাড়া ঐ ২০ হাজার টাকা থেকে কর্তিত হবে। অথবা বাইয়ে বিল ওয়াফা করবেন। (ই’লাউস সুনান- ১৮/৭৩ ও ৭৪, ফাতাওয়ায়ে শামী- ১০/৮৬, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৫/৩৮৭ ও ২৫/৩৭৭ পৃষ্ঠা)।

 

ঈদের দিন কবর যিয়ারত প্রসঙ্গে

(৭৮২৩) মুহাম্মদ আমিনুল হক সরকার, নেত্রকোনা

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের এলাকার লোকজন প্রতি দুই ঈদের নামায আদায় করার পর ডাকাডাকি করে সবাই মিলে কবর যিয়ারত করে থাকেন। কিন্তু তাদেরকে এই দুই ঈদ ছাড়া অন্য কোনো সময় এভাবে কবর যিয়ারত করতে দেখা যায় না। এখন আমার জানার বিষয় হল, এভাবে ডাকাডাকি করে কবর যিয়ারত করা কতটা শরীয়ত সম্মত হচ্ছে, দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে একথা প্রমাণিত হয় যে, কবর যিয়ারত করা শরীয়ত অনুমোদিত একটি আমল। কিন্তু কবর যিয়ারত করার জন্যে শরীয়তে বিশেষভাবে কোনো দিন বা তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়নি। সুতরাং কবর যিয়ারত করার জন্যে কোনো দিন বা তারিখকে খাস করে নেওয়া এবং ঐ দিনকে জরুরী মনে করে ডাকাডাকি করা বিদআত। তবে বিশেষ গুরুত্ব ও জরুরী মনে না করে যিয়ারত করলে অসুবিধা নেই। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/৪০৫, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ৫/৫৫৬, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া- ২/১৯৯, দুররে মুখতার- ২/১২০ পৃষ্ঠা)।

 

সুদের টাকা দিয়ে বিদেশে যাওয়া প্রসঙ্গে

(৭৮২৪) নাম-ঠিকানা বিহীন

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আমার জানার বিষয় হল, আমার বড় ভাই বিদেশে যেতে চাচ্ছে। এই টাকা যোগান দিতে গিয়ে কয়েকজন থেকে টাকার ব্যবস্থা করা হয়। মোট টাকা লাগবে তিন লক্ষ। এখন সেই টাকার মধ্যে একজন থেকে ১৫,০০০ টাকা সুদের উপর নেয়া হয়; যার পরিমাণ এক বৎসর পর ২২,০০০ হাজার টাকা দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হল- (ক) তার কিছু টাকার কারণে সব টাকা কি সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে?

(খ) তার সে টাকা দিয়ে বিদেশ গিয়ে যে অর্থ কামায় করবে, তা কি হালাল উপার্জন হিসেবে গণ্য হবে? উত্তর জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ (ক) ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে, বৈধ টাকার সাথে সুদের টাকা মিশ্রণ হওয়ার কারণে তার সব টাকা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

(খ) সুদের ভিত্তিতে টাকা আনার কারণে সে গুনাহগার হবে। কিন্তু ঐ টাকা দিয়ে বিদেশ গিয়ে যে অর্থ কামায় করবে, তা হালাল উপার্জন হিসাবে গণ্য হবে। তবে সুদের টাকা পরিশোধ করা পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা কামায় করবে, ঐ টাকাকে তার হালাল টাকা এবং সুদের টাকার মাঝে ভাগ করে সুদি টাকার লভ্যাংশকে সদকা করে দিবে।

উল্লেখ্য, সুদের উপর টাকা নেয়ার গুনাহের জন্য তার তওবা ইস্তিগফার করা ওয়াজিব। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ৩/২১১, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৩/২৫৯ ও ৭/৪৯০, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৯/৪০৯, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৪/৪০৬, ৪৪৫ পৃষ্ঠা)।

 

ওয়াজের মাঝে চিৎকার করা এবং লাফালাফি করা প্রসঙ্গে

(৭৮২৫) মুহাম্মদ শিহাব উদ্দীন, ছাত্র- দারুল উলূম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ ওয়াজের মধ্যে কিংবা কুরআন তিলাওয়াত বা হামদ/না’তের মধ্যে জোশের মধ্যে উঠে হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করা, লাফালাফি করা ‘খাইরুল কুরুন’ থেকে প্রচলিত ছিল কি-না? এ সম্পর্কে শরীয়তের বিধান জানতে ইচ্ছুক।

সমাধানঃ হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ওয়াজের মধ্যে কিংবা কুরআন তিলাওয়াত বা হামদ না’তের মধ্যে চিৎকার বা লাফালাফি করা ‘খাইরুল কুরুন’ থেকে প্রমাণিত নয়। তবে দিলে দিলে আল্লাহর কালাম সত্যায়ন করা এবং তাকবীর বলার অবকাশ রয়েছে। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ৯/৫৭০, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/৩৬৭, জাওয়াহেরুল ফাতাওয়া- ৪/১৯৩ পৃষ্ঠা)।

 

যাকাত প্রসঙ্গে

(৭৮২৬) মুহাম্মদ আসজাদ হাসান রিফাত, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ (ক) আমরা জানি শরীয়তের মধ্যে স্বর্ণ ও রূপার পৃথক পৃথক নিসাব নির্ধারণ করা আছে। যদি কারো নিসাব পরিপূর্ণ হয়ে এক বৎসর অতিবাহিত হয়, তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে। কিন্তু আমার কাছে এক বৎসর যাবত ৩ ভরি ৪ আনা স্বর্ণ এবং সাথে ৩০ হাজার টাকা জমা আছে। এখন জানার বিষয় হলো, আমার উপর যাকাত ফরয হয়েছে কি-না? আর না হলে তা কেন?

(খ) আমার কাছে আগেকার কিছু পয়সা আছে, যেগুলো চাঁদির পয়সা বলে প্রচলিত। কিন্তু বর্তমানে ঐ পয়সাগুলো চলে না। আমার জানার বিষয় হচ্ছে, আমি নেসাব পরিমাণ মালের মালিক। আমার যাকাত দেওয়ার সময় ঐ পয়সাসমূহ হিসাব করে যাকাত দিতে হবে কি?

সমাধানঃ (ক) ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী শরীয়তে যাকাতের ক্ষেত্রে সোনা রূপার পৃথক পৃথক নিসাব নির্ধারণ করা আছে। তবে যদি কারো কাছে কিছু সোনা কিছু রূপা এবং কিছু টাকা থাকে, যেগুলোর কোনটাই পৃথক পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ নয়। কিন্তু সবগুলোর মূল্য একত্রিত করলে নিসাব (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্য) সমপরিমাণ হয়ে বছর অতিবাহিত হয়। তখন এর উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। সুতরাং আপনার কাছে যেহেতু তিন তোলা চার আনা স্বার্ণালংকার আছে, যা স্বর্ণের নিসাব পরিমাণ নয়। তবে ত্রিশ হাজার টাকার সাথে মূল্য নির্ধারণ করে একত্রিত করলে রূপার নিসাব পরিমাণ হয়। সে হিসেবে আপনার উপর যাকাত ওয়াজিব।

(খ) আপনার কাছে আগেকার যেসব চাঁদির পয়সা আছে, সেগুলো যদি গলিয়ে রূপার কোনো জিনিষ বানানো যায়, তাহলে নিসাবের সাথে হিসাব করে যাকাত আদায় করতে হবে। আর যদি গলিয়ে ফেললে রূপা না থাকে, তাহলে যাকাত আদায়ের সময় নিসাবের সাথে মিলাতে হবে না। যাকাতও দিতে হবে না। (দুররে মুখতার মাআ শামী- ৩/২৭১, হিদায়া- ১/১৯৬, বাদায়েউস সানায়ে- ২/১০৬ ও ২/১০১, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যা- ১/২৪১, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়্যা- ৩/১৫৮ ও ৩/১৫৪)।

 

ওয়াকফ করা জমি প্রসঙ্গে

(৭৮২৭) মুহাম্মদ আবছার, মোহাম্মদপুর, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের বাড়ির সামনে একটি খালি জায়গা আছে। আমার মরহুম আব্বাজান উক্ত জায়গাতে কোনো নিয়্যাত ছাড়াই কবর দেওয়া শুরু করে দিল এবং কিছু দিন পর ঐ কবরগুলোর জায়গাসহ উক্ত জায়গা মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ করে দিলেন এবং কবরস্থানের পাশে একটি জায়গা নির্ধারণ করে একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। আমার জানার বিষয় হল, কবরস্থানসহ ঐ জায়গাটা ওয়াকফ করা সহীহ হয়েছে কি-না? বর্তমান যে জায়গাতে কবরস্থান আছে ওখানে অন্য কোনো মুর্দাকে দাফন করতে পারবে কি-না?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের কিতাবাদি অধ্যয়নে এই বিষয়টি প্রমাণিত হয় যে, আপনার মরহুম আব্বাজানের উক্ত জায়গা মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ করা সহীহ হয়েছে। অতঃপর ঐ কবর স্থানের লাশগুলো পুরাতন হওয়ার পাশাপাশি যদি মাটির সাথে মিশে গেছে বলে প্রতিয়মান হয়, তাহলে উক্ত জায়গাও মসজিদের কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং সেই জায়গাতে আর অন্য কোনো লাশ দাফন করা সহীহ হবে না। কেননা, ওয়াকফ করার পর উক্ত জায়গা মসজিদের জায়গার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আর মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গা মসজিদ সংক্রান্ত কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার আলা দুররিল মুখতার, কিফায়াতুল মুফতী- ৭/৪০, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৮/১৬৩)।

 

পাগল অবস্থায় তালাক দেয়া প্রসঙ্গে

(৭৮২৮) রুকনু উদ্দীন, ফুলপুর, ময়মনসিংহ

জিজ্ঞাসাঃ মেয়েটির নাম মুসাম্মত আম্বিয়া খাতুন। গ্রাম ও পোস্ট বওলা, থানা ফুলপুর, জেলা ময়মনসিংহ। বিয়ে হয়েছে পাশ্ববর্তী গ্রাম কাইছাপুর হাফেয রুকন উদ্দীন সাহেবের সাথে। দু’ সন্তানের জনক-জননী তারা। তাদের দাম্পত্য জীবন প্রায় দশ বছর চলছে।

বিয়ের পর দু’বার স্বামী রুকন উদ্দীনের মস্তিষ্ক বিকৃত তথা পাগল হয়েছেন। আর তার এই পাগলামিটা শীত মৌসুমেই সাধারণত দেখা দিয়েছে এবং সুচিকিৎসার দ্বারা আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছেন।

কিন্তু এবার, অর্থাৎ- ২০১৬ এর শীত মৌসুমে তিনি যখন পাগল হন, তখন ইতঃপূর্বের সকল সীমা ছাড়িয়ে ফেলেছেন। গভীর রাতে ক্ষেতে খামারে কাজ করতে যাওয়া, দিনভর গাছের গোড়া পরিষ্কার করা, অনর্থক মাটি খনন করাসহ পাগলামীর যাবতীয় কান্ড তার থেকে প্রকাশ পেয়েছে। তবে অন্যের (পরিবার ছাড়া) তেমন ক্ষতি করেননি।

এমনি একরাতে (আনুমানিক ১২টায়) তিনি ক্ষেতে কাজ করতে গেলে তার বড় ভাই সেখান থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেনন। তখনো স্ত্রী আম্বিয়া ঘরের আলো জ্বেলে উদ্বিগ্নাবস্থায় অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ঘরে প্রবেশ করার পর, বড় ভাই তাকে ঘরের আলো (বিদ্যুতের লাইট) নিভিয়ে শোয়ার কথা বলেন। বেশ কবার তাগাদা দিয়ে বড় ভাই নিজ ঘরে চলে গেলে স্ত্রী আম্বিয়াও তাকে লাইট বন্ধ করে শোয়ার কথা বলেন। ব্যাস, ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা স্বামী (হয়তো তার কাজ করা থেকে ফিরিয়ে আনায়) স্ত্রী আম্বিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন, তোর এত বড় সাহস, আমাকে আদেশ দিচ্ছিস (লাইট অফ করতে), দাঁড়া তোর পাওয়ার বন্ধ করে দিচ্ছি। (দুঃখিত হুবহু শব্দগুলো এখানে লিখতে পারছি না আঞ্চলিকতার জন্য)। তারপর বললেন, যা তোকে এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, বাঈন তালাক দিলাম।

একথা বলে নিজ ঘরেরই ভিন্ন বিছানায় শয্যা গ্রহণ করলে, স্ত্রী এই ঘর ত্যাগ করে তার ভাসুরের (স্বামীর বড় ভাই) ঘরের এক কামরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন স্বামী বাড়ির ওঠোনে দাঁড়িয়ে বেশ ক’বার উচ্চ স্বরে উক্ত কথাগুলো পুনরায় উচ্চারণ করেন। যা প্রায় বাড়ির সব মানুষই শুনতে পায় এবং তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। কিন্তু বড় ভাইয়ের আশ্রিত কক্ষ থেকে স্ত্রী বের না হওয়ায় দরজায় লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এ ঘটনার পর প্রায় বিশ দিন লুকিয়ে (স্বামীর বড় ভাইয়ের ঘরের এক কামরায়) ঐ বাড়িতেই থাকেন স্ত্রী আম্বিয়া।

রুকন উদ্দীনের বড় ভাবি অসুস্থ হলে, ভাতিজিকে ঢেকে বলেন, তার স্ত্রী আম্বিয়া যেন এসে রোগী দেখে যায়। ভাতিজি তাকে তালাকের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন আমার সামনে আসার জন্য তো বলিনি। ভাবিকে দেখে চলে যাবে। এটা তালাকের প্রায় এক সপ্তাহ পর।

তালাকের ঘটনার পর স্ত্রী আম্বিয়া তার এক ভাই ও দেবরকে নিয়ে উত্তর ময়মনসিংহের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ জামিয়া আরাবিয় আশরাফুল উলূম বালিয়া মাদ্রাসায় এ বিষয়ে ফাতওয়া জানতে চাইলে এগুলোর লিখিত বর্ণনা দিতে বলেন। সেই সাথে এ কথাগুলো তার স্মরণে আছে কিনা তাও জিজ্ঞাসা করতে বলেন এবং পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় মাদ্রাসায় যেতে বলেন।

বাড়ি এসে রুকন উদ্দীনের ছোট ভাই কথাগুলো (তালাকের) স্মরণে আছে কিনা জানতে চাইলে সে বলল, তালাক তো দিয়েছি, তাতে কি হয়েছে। উল্লেখ্য, এটা তালাকের প্রায় ১৫ দিন পরের ঘটনা।

যে বিষয়গুলোতে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে, যে রাতে সে স্ত্রীকে তালাক দেন, সে রাতেই আবার নিজের পরিচিত এক মুফতি সাহেবের কাছে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন যে, কোনো ব্যক্তি পাগল অবস্থায় যদি তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলে কি তালাক হবে কি-না?

প্রশ্ন জাগে পাগলই যদি হবেন, তবে এটা কেমন আচরণ?

পাগল হলেও তিনি সকল আত্মীয় স্বজনকেই চিনেন, টাকা এবং খাবার সবই চিনেন। এখন তিনি সুস্থ। তিনি বলছেন, ইতিপূর্বে স্ত্রীকে বলা (তালাক সম্পর্কীয়) কোনো কথাই তার স্মরণ নেই।

উল্লেখ্য, এটা কি কারো শিখিয়ে দেয়ায় বলছেন, নাকি নিজ থেকেই বলছেন, আমাদের জানা নেই।

পূর্বের বলা কথানুযায়ী স্বামী-স্ত্রী ও উভয় পক্ষের দু’জন করে সাক্ষীসহ বালিয়া মাদরাসায় গিয়ে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলে, বিষয়টি জটিল হওয়ায় আপনাদের নিকট বিস্তারিত বর্ণনাসহ লিখে পাঠানোর পরামর্শ দেন। তাই আমাদের এ প্রয়াস।

প্রশ্ন হচ্ছে, উপরে উল্লিখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী শরীয়তের বিধানানুযায়ী তালাক হবে কি-না? কুরাআন-হাদীসের আলোকে বিষয়টি জানিয়ে আমাদের উপকৃত করবেন।

সমাধানঃ কুরআন-হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, যখন কোনো ব্যক্তির এমন রোগ হয়, যা আক্বল বা বুদ্ধিকে ভারসাম্যহীন করে দেয়, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির কথা-বার্তা এবং কাজ-কর্ম এলোমেলো অথবা ব্যবস্থাপনা বা পদক্ষেপ বিকৃত এবং বুদ্ধি হ্রাস পায়, তখন হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের পরিভাষায় তাকে (বিকৃত মস্তিষ্ক) বলা হয়। আর (বিকৃত মস্তিষ্ক) ব্যক্তির বিধান পাগল এবং শিশুর ন্যায়। অর্থাৎ- শিশু এবং পাগলের কথা এবং কর্মের উপর ভিত্তি করে যেমন তাদের উপর শরীয়তের কোনো বিধান আরোপিত হয় না, তেমনি (বিকৃত মস্তিষ্ক) ব্যক্তির কথা এবং কর্মের উপর ভিত্তি করেও শরীয়তের কোনো বিধান আরোপিত হবে না। হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রত্যেক তালাক জায়েয (কার্যকর), তবে বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তির তালাক (কার্যকর হবে না)। (তিরমিযী শরীফ- ১/২২৬)।

অতএব, প্রশ্নে বর্ণিত হাফেয রুকন উদ্দীন সাহেবের অবস্থা যদি বাস্তবিকই এমন হয় (অর্থাৎ- শীত মৌসুমেই সাধারাণত তার পাগলামিটা দেখা দেয় এবং পাগলামির দিনগুলোর মাঝে কখনো সম্পূর্ণ ভালো অবস্থা যায় না। ঘটনার সময় ইতিপূর্বের সকল সীমা ছাড়িয়ে ফেলে এবং পাগলামীর যাবতীয় কান্ড তার থেকে প্রকাশ পেয়ে থাকে। এর পূর্বে একবার সুচিকিৎসার দ্বারা আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে থাকেন, এ সমস্ত ব্যাপারে সাক্ষীও থেকে থাকে), তাহলে রুকন উদ্দীন সাহেবের স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়নি। সে তার স্ত্রীকে নিয়ে ঘর সংসার করতে পারবে।

উল্লেখ্য, বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তির অনুভূতি এবং পার্থক্য ক্ষমতাও বিদ্যমান থাকতে পারে। সুতরাং আত্মীয়-স্বজন, টাকা-পয়সা এবং খাবার চিনলেও তার কথা কার্যকর হবে না। কেননা তালাক পতিত হওয়ার জন্য তালাকদাতার পরিপূর্ণ জ্ঞান বিদ্যমান থাকতে হয়। আর উল্লিখিত রুকন উদ্দীন সাহেবের জ্ঞান যেহেতু ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে, তাই তার কথা কার্যকর হবে না। (ইবনে মাজাহ- ১৪৮, তিরমিযী- ১/২২৬, লিসানুল আরব- ৪/২৫৫, উসুলে ফিক্বাহ-১০৪, তাবয়ীনুল হাকায়েক- ৩/৩৪, ফাতহুল ক্বাদীর- ৩/৪৬৮, রদ্দুল মুহতার- ৩/২৪৪, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৪/৩৯২, মুহিতে বুরহানী- ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৬৯)।

 

কাবিননামার অধিকার বলে স্ত্রী কর্তৃক বিয়ে বিচ্ছেদ সংঘটন প্রসঙ্গে

(৭৮২৯) মুহাম্মদ গোলামুর রহমান, রমনা আ/এ, রামপুরা, হালিশহর, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ বাংলাদেশ সরকার বিয়ের কাবিননামায় (আইয়ুব খানের শাসন আমল হইতে) মেয়েরা স্বামীকে তালাক দিতে পারবে বা তালাক গ্রহণ করতে পারবে বলে একটি আইন বর্তমান সময় পর্যন্ত চালু আছে এবং বিয়ের সময় স্বামী-স্ত্রীর স্বাক্ষরিত ঐ কাবিননামা দিয়ে পরবর্তীতে সংসারিক অশান্তিসহ নানা কারণে অনেক স্ত্রী বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন। অথচ কোনো বিয়ের সময়ই স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার দেয়া হয়েছে মর্মে স্পষ্ট আলোচনা শোনা যায় না। শুধুমাত্র সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার বলে এভাবে দেশে শত শত বিয়ে বিচ্ছেদ সংঘটিত হচ্ছে। আমার প্রশ্ন, শুধু সরকারী নিয়মের বলে (যেটা অনেক স্বামী জানত না) অনেক স্ত্রী সংসার ভেঙে দিচ্ছেন। এটা কতটা শরীয়ত সম্মত হচ্ছে, দলীলসহ জানালে উপকৃত হব। এধরনের বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয হচ্ছে কি-না?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়ন করে প্রমাণিত হয় যে,স্বীয় স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে বা শর্তসাপেক্ষে তালাকের অধিকার প্রদান করা ইসলামী শরীয়তের পরীপন্থী নয়। সুতরাং আমাদের দেশের প্রচলিত কাবিননামায় কেউ যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের অধিকার দিয়ে থাকে, তাহলে স্বামীপ্রদত্ত অধিকার বলে স্ত্রী নিজের নফসের উপর তালাক প্রদান করতে পারবেন।

স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের বিষয়টি বিয়ের সময় আলোচিত হোক বা না হোক, স্বামী যদি কাবিননামায় স্বাক্ষর করে থাকেন এবং কাজী সাহেব প্রচলিত শর্তসহ তালাকের ক্ষমতা অর্পণের কথা কাবিননামায় লিখে দেন, তাহলে স্বামী তা মেনে নিয়েছে মর্মে ধর্তব্য হবে। কারণ, বর্তমান সমাজের প্রচলন হলো, বিবাহ রেজিস্টারদের নিষেধ করা না হলে, তারা ১৮ নং ধারায় স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেয়ার কথা লিখে দিয়ে থাকেন। তাই স্বামী নিষেধ না করে কাবিননামায় ঘরগুলো খালি রেখে দস্তখত করলে সাব্যস্ত হবে যে, সে প্রচলন অনুযায়ী তালাক গ্রহণের অধিকার স্ত্রীকে প্রদান করেছেন। সুতরাং শর্ত ভঙ্গ করলে বা বনিবনা না হলে স্ত্রী কাবিননামায় প্রদত্ত অধিকার বলে নিজের নফসের উপর তালাক নিতে এবং ইদ্দত শেষে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন। (হাশিয়ায়ে রদ্দুল মুহতার- ৩/২৪৬, ৩/১৪০, ৩/১৪৪, হিদায়া- ৩/৮০, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ১/৩৮৫, ১/৪২০, কিফায়াতুল মুফতী- ৮/৩১৪, জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ৪/৩৭৩, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ- ১০/৩৩, ফাতাওয়ায়ে কাযি খান- ১/৩২৯, বাহরুর রায়েক- ৩/৫৫২, মুহিতে বুরহানী- ৪/৪৩৯)।

 

মুরতাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া প্রসঙ্গে

(৭৮৩০) মিরাজ উদ্দীন, ভোলা

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের দেশে মুরতাদদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যাবে কি-না?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, যারা মুরতাদ বলে সাব্যস্ত হবে, তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া ওয়াজিব। তবে তা বাস্তবায়নের আয়োজন করবে রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রের তরফ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক। তারা প্রথমে মুরতাদদের সামনে ইসলাম পেশ করবে। ইসলামের কোন বিষয়ে তাদের সন্দেহ থাকলে, তার সঠিক ব্যাখ্যা তাদের সামনে তুলে ধরবে। এপর তাদেরকে ইসলামে ফিরে আসার জন্যে তিন দিন আটক রেখে চিন্তা করার সুযোগ দিবে। তারপরও যদি তারা ইসলামে ফিরে না আসে, তবে তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানের কর্তব্য হল, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ মিটিং মিছিলের মাধ্যমে সরকারের প্রতি ইসলামের বিধান প্রয়োগের জন্যে জোরালো দাবী বা আহ্বান জানাবে, যাতে সরকার এসব নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং দন্ডবিধি বাস্তবায়ন করে। (ফাতহুল কাদীর- ২/৪৬, বাহরুর রায়েক- ৫/২১০, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ২/২৪৭, বাদায়েউস সানায়ে- ৬/১১৮, ফাতাওয়া সিরাজিয়া- ২৯৮, কাযিখান- ৪/৪৭১)।

 

যাকাত প্রসঙ্গে

(৭৮৩১) আব্দুস সালাম, রংপুর

জিজ্ঞাসাঃ এক ব্যক্তির ৪ ভরি স্বর্ণ ও ২৫ হাজার নগদ টাকা আছে। এই ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয হবে কি-না, জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ হ্যাঁ, উক্ত ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয হবে। কারণ, ৪ ভরি স্বর্ণ যদিও নেসাবের পরিমাণ থেকে কম, কিন্তু ২৫ হাজার টাকার সাথে ৪ ভরি স্বর্ণের মূল্য একত্রিত করলে সেটা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্য থেকেও অনেক বেশি হয়। তাই উক্ত ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয হবে। (বাহরুর রায়েক- ২/২৪৭, জাওহারাতুন নাইয়ারা- ১/১২৮, হিদায়া- ১/১৭৮, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/১৫৯)।

 

ঈদের নামাযের মাঠ প্রসঙ্গে

(৭৮৩২) দক্ষিণ গোদার পাড়া জামে মসজিদ কমিটি, সদর, বগুড়া

জিজ্ঞাসাঃ আমরা বগুড়া জেলার সদর থানার পৌর সভার ১৫নং ওয়ার্ডের বৃহত্তর গোদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় ৫টি মসজিদ আছে। আমাদের এই ৫টি মসজিদে প্রায় ৬/৭ হাজার মানুষের বসবাস। আমাদের এলাকায় ঈদের নামায পড়ার জন্য কোনো ঈদগাহ মাঠ নেই। আমাদের এলাকায় একটি মহিলা কলেজ আছে। কলেজের ভিতরে একটি মাঠ আছে, সেখানে নিয়মিত মহিলাদের নবীন বরণ, বিভিন্ন গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক সভা-সমিতির অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যেহেতু আমাদের ৫ মহল্লার কোনো মহল্লাতেই ঈদগাহ মাঠ নেই, সেই জন্য ঐ মহিলা কলেজের মাঠে আমরা দীর্ঘ কয়েক বৎসর যাবৎ ঈদের নামায পড়ে আসছিলাম। এখন জানার বিষয় হচ্ছে, এই স্থানে নামায পড়া নিয়ে আমাদের মুসল্লিদের ভিতর মতভেদ দেখা দিয়েছে। যার কারণে অনেকে দূরে অন্য মহল্লায় নামায আদায় করে থাকে। এ নিয়ে এলাকায় মতবিরোধ ও বিবেদের সৃষ্টি হয়েছে।

তাই আমরা জানতে চাচ্ছি, উক্ত মহিলা কলেজ মাঠে ঈদের নামায পড়া যাবে কি-না, মেহেরবানী করে শরীয়ত সম্মত দলীলসহকারে এর উত্তর জানালে ভালো হয়।

সমাধানঃ কুরআন-হাদিস এবং ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়ন করার পর প্রমাণিত হয় যে, ঈদের নামায ঈদগাহের মাঠে আদায় করা সুন্নাত। কেননা, হাদিস দ্বারা এই কথাটি প্রমাণ হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম ঈদের নামায ঈদগাহের মাঠে আদায় করেছিলেন। কিন্তু আপনাদের এলাকাবাসিদের এখনো যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ঈদগাহের মাঠ নেই এবং আপনারা বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ উক্ত মহিলা কলেজের মাঠে ঈদের নামায পড়ে আসছেন, কলেজ কমিটির পক্ষ থেকে কোনো প্রকারের বাঁধা নিষেধ ছাড়া এবং এখনোও কোনো প্রকারের বাধা-নিষেধের আশংকা নেই। তাই উক্ত মহিলা কলেজ মাঠে ঈদের নামায আদায়ের উপর শরীয়তের কোনো বাধা-নিষেধ নেই। কিন্তু উক্ত কলেজের মাঠটি যেহেতু প্রকৃতভাবে ঈদগাহের মাঠ নয় এবং আপনাদের লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী যেহেতু উক্ত মাঠে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ হয়, তাই উক্ত মাঠকে ঈদগাহ না বানিয়ে আপনাদের কোন একজন বা সম্মিলিতভাবে এলাকাবাসির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে ঈদগাহের জন্যে পৃথক একটা মাঠ নির্ধারণ করা হলে, যেখানে এলাকাবাসী সবাই মিলে ঈদের নামায আদায় করতে পারবেন, এটা অনেক উত্তম কাজ হয়। (সহীহ বুখারী- ১/১৩১, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা- ৩/৬২৭, আদ-দুররুল মুখতার আলা-শামী- ১/৫৫৭, মাহমুদিয়া- ১২/৪৮৪ ও ১২/৪৮০, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/২১১ ও ১/১৬৮ পৃষ্ঠা)।

 

সালাতুত তাসবীহ জামাতে আদায় করা প্রসঙ্গে

(৭৮৩৩) শামীমুল ইসলাম, গোপালপুর, টাঙ্গাইল

জিজ্ঞাসাঃ মহিলারা সালাতুত তাসবীহ জামাতে আদায় করতে পারবে কি-না? জনৈক ব্যক্তি বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাযি.) ও হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) সালাতুত তাসবীহ জামাতে আদায় করেছেন। কথাটি কতটুকু সঠিক । দলীল সহকারে জানালে উপকৃত হব।

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, মহিলারা ফরয নামায জামাতে আদায় করা মাকরূহে তাহরীমী। আর সালাতুত তাসবীহ হল, নফল নামায। সুতরাং মহিলাদের জন্য সালাতুত তাসবীহ তথা নফল নামায জামাতে আদায় করা নিঃসন্দেহে মাকরূহে তাহরীমী হবে। প্রকাশ থাকে যে, প্রশ্নে বর্ণিত উক্ত ব্যক্তির কথা সঠিক নয়। (ফাতহুল ক্বদীর- ১/৩৬৩, বাহরুর রায়েক- ১/৬১৫, আদ্দুররুল মুখতার মাআ রদ্দিল মুহতার- ১/৫৬৫, মারাক্বিউল ফালাহ- ৩৮৬ পৃষ্ঠা)।

 

বেপর্দা অবস্থায় তদবীর করা ইমামের ইক্তিদা প্রসঙ্গে

(৭৮৩৪) মুহাম্মদ হামীদ খান, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব তদবীরখানায় নিজের সম্মুখে প্রকাশ্যে মুসলিম, হিন্দু বিভিন্ন বয়সের মহিলা পুরুষ একত্রে বসিয়ে তদবীর করেন। অনেক সময় কেবল মাত্র মহিলারা বসে থাকেন, ইমাম সাহেব ঝাড়-ফুঁক করেন। এমতাবস্থায় আমার প্রশ্ন হচ্ছে- (১) এভাবে মহিলাদেরকে সামনে বসিয়ে রেখে তদবীর করা জায়েয কি-না?

(২) উক্ত ইমাম সাহেবের ইমামতিতে সালাত আদায় করা যাবে কি-না?

সমাধানঃ কুরআন-হাদীস ও ফিক্বাহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, আলোচিত ইমাম সাহেব শরয়ী পর্দা লঙ্ঘন করে যে তাদবীর করেন, তা জায়েয নয়। বরং তিনি কবিরা গুনাহে লিপ্ত বলে বিবেচিত। এরূপ অবস্থায় তার ইমামতিতে নামায পড়া মাকরূহ হবে। হ্যাঁ, এখন যদি তিনি আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করেন এবং পর্দাসহ যেসকল বিধি-বিধান লঙ্ঘন করেছেন তা থেকে ফিরে এসে শরয়ী বিধি-নিষেধ মেনে চলেন, তাহলে তাঁর পেছনে ইক্তিদা করা সহীহ হবে। (সূরা নূর ও সূরা আহযাব, তিরমীযী শরীফ, রদ্দুল মুহতার- ১০/১৮৯)।

 

কুড়িয়ে পাওয়া মাল সম্পর্কে

(৭৮৩৫) ঠিকানা বিহীন

জিজ্ঞাসাঃ মাদ্রাসার বার্ষিক পরিক্ষার পর ছাত্ররা অনেক বস্তু হেফাজতবিহীন রেখে বাড়িতে চলে যায়। ঐ সমস্ত বস্তু কুড়িয়ে ব্যবহার করা বৈধ হবে কি?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, যে সমস্ত বস্তু কুড়িয়ে পাওয়া যায় তা দুই ধরণের হয়। প্রথম প্রকার কুড়ানো বস্তুটি এমন, যা সাধারণত মানুষ তালাশ করে না। এটার হুকুম হলো, কুড়ানেওয়ালা ব্যবহার করতে পারবে। দ্বিতীয় প্রকার কুড়ানো বস্তুটি এমন, যা সাধারণত মানুষ তালাশ করে। এই প্রকারের হুকুম হলো কুড়ানেওয়ালা তা সংরক্ষণ করে এ পরিমাণ সময় পর্যন্ত এলান করতে হবে যে, এরপর মালিককে পাওয়ার আশা থাকে না। যদি মালিককে না পাওয়া যায় এবং কুড়ানেওয়ালা নিজে মুহতাজ হয়, তাহলে সে নিজে ব্যবহার করতে পারবে। আর কুড়ানেওয়ালা ধনী হলে, মালিকের নামে সদকা করে দিতে হবে এবং পরতবর্তীতে মালিক এসে দাবি করলে তাকে উক্ত বস্তু ফেরত দিতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ২/২৯৯-৩০০, আল-মুহিতে বুরহানী- ৮/৮৬৬, ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া- ২৪১)।

 

কুরবানী প্রসঙ্গে

(৭৮৩৬) আব্দুর রাকিব, বগুড়া

জিজ্ঞাসাঃ কুরবানী ফরয নাকি ওয়াজিব? ফরয ও ওয়াজিবের মাঝে পার্থক্য কি? যদি কোনো ব্যক্তি না জানার কারণে বা কোনো ওযরের কারণে কুরবানী করতে না পারে, তাহলে তার ক্বাযা করার নিয়ম কি, জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ কুরআন-হাদীস ও ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী ওয়াজিব। ফরয বলা হয় এমন হুকুমকে, যা অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। ওয়াজিব বলে যে হুকুম “ক্বতঈ সবুত যান্নী দলীল অথবা যান্নী সবুত ক্বতঈ দলীল” দ্বারা প্রমাণিত। অর্থাৎ- যে হুকুমটি প্রমাণের ক্ষেত্রে অকাট্য, কিন্তু অর্থ বুঝানোর ক্ষেত্রে অকাট্য নয়, অথবা প্রমাণের ক্ষেত্রে অকাট্য নয়, কিন্তু অর্থ বুঝানোর ক্ষেত্রে অকাট্য; এভাবে প্রমাণিত। প্রশ্নোল্লিখিত মাসআলায় ঐ ব্যক্তির উপর একটা করে প্রত্যেক বছরের জন্য মধ্যম রূপের ছাগলের মূল্য সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার আলা-দুররিল মুখতার- ১/৯৫, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ৫/৩৩৯, ফাতাওয়ায়ে কাযিখান- ৩/২৪৩, দুররে মুখতার- ৯/৫২১)।

 

সদকায়ে ফিতর আদায় করা প্রসঙ্গে

(৭৮৩৭) নাম-ঠিকানা বিহীন

জিজ্ঞাসাঃ কোনো ব্যক্তি আরব দেশে থাকে। যদি তার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কেউ যাকাত অথবা সদকায়ে ফিত্র আদায় করে, তখন কোন জায়গার মূল্যমান হিসাব করা হবে।

সমাধানঃ উল্লিখিত প্রশ্ন অনুযায়ী উক্ত ব্যক্তির যে টাকা বা সম্পদের উপর যাকাত ফরয হয়েছে, সেটা যদি বাংলাদেশে থাকে তাহলে বাংলাদেশের মূল্যমান অনুযায়ী যাকাত আদায় করবে। আর যদি সেই টাকা বা সম্পদ সৌদিতে থাকে, তাহলে সৌদি টাকা অনুযায়ী যাকাত আদায় করবে। আর সদকায়ে ফিত্র আদায় করবেন তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সে দেশের মূল্যমান অনুযায়ী। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ৩/২৫১, আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/৩৬৮, বাদায়েউস সানায়ে- ২/২০৮, আলমগীরী- ১/২৪১ ও ১/২৫২ পৃষ্ঠা)।

 

চাঁদ দেখা প্রসঙ্গে

(৭৮৩৮) মিরাজ উদ্দীন, ভোলা

জিজ্ঞাসাঃ আমার জানার বিষয় হলো যে, একই ঈদের চাঁদ বাংলাদেশের কয়েকটি বিভাগে এক সাথে দেখা গেছে। যেমন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী। কিন্তু আমাদের ভোলায় ঐ ঈদের চাঁদ দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় আমাদের আত্মীয় স্বজন যারা ঐসব জেলায় থাকেন, তাদের থেকে মোবাইল, টেলিফোনে কিংবা রেডিওর মাধ্যমে খবর নিয়ে ভোলাবাসীদের জন্য ঈদ করা বৈধ হবে কি-না?

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চল নিকটবর্তী হলে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য কার্যকর হবে। পক্ষান্তরে উভয় অঞ্চল দূরবর্তী হলে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য ধর্তব্য হবে না। এই দূরত্ব এতটুকু থাকে যে, উভয় অঞ্চলের উদয়স্থল এক ও অভিন্ন। তাহলে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য অপর অঞ্চলের চাঁদের হুকুম অপরিহার্যভাবে প্রযোজ্য হবে। পক্ষান্তরে উভয় অঞ্চলের উদয়স্থল ভিন্ন হলে এক অঞ্চলের চাঁদের হুকুম অন্য অঞ্চলের জন্য অপরিহার্য নয়। এ সম্পর্কে আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী (রাহ.) বলেন, “চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হবে ঐ দুই দেশের মাঝে, যে ক্ষেত্রে চাঁদের উদয়ের ব্যবধান একদিন থেকেও বেশি হয়”।

অতএব, পুরো বাংলাদেশের উদয়স্থল যেহেতু এক, তাই বাংলাদেশের এক জেলার চাঁদ দেখা অপর জেলার জন্য অপরিহার্যভাবে প্রযোজ্য হবে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের যে কোনো জেলায় শরীয়ত সম্মতভাবে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে, তার খবরাখবর ফোন মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচার প্রসার করা বৈধ হবে এবং এর উপর ভিত্তি করে রোযা, ঈদ ইত্যাদি পালন করা যাবে। (ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/৩৬৫, বাদায়েউস সানায়ে- ২/২২৪-২২৫, ফাতহুল মুলহিম- ৫/১৯৮, রদ্দুল মুহতার- ৩/৪১৮)।

 

ক্রয় সংক্রান্ত

(৭৮৩৯) মাস্টার মুহাম্মদ রফিক, রাউজান, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের চট্টগ্রামে ‘চোরা মার্কেট’ নামে প্রচলিত একটি মোবাইল মার্কেট আছে, সেখানে অনেক পুরাতন মোবাইল পাওয়া যায়। এখন জানার বিষয় হলো, সে মার্কেট থেকে মোবাইল ক্রয় করা যাবে কি-না?

উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো দোকানদার বলেন যে, এটা এক মহিলা বা এক লোক বিক্রয় করেছে। আবার কেউ বলেন, এটা চোর থেকে কিনেছি।

সমাধানঃ কুরআন-হাদীস ও ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, উল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী মার্কেটটি যদি চোরা মার্কেট নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং মানুষের প্রবল ধারণা এটাই যে, সেখানে চোরা মাল বিক্রি হয়, তাহলে সেখান থেকে কোনো পণ্য ক্রয় করা বৈধ নয়। কেননা, প্রথমতঃ চুরিকৃত বস্তু জেনেশুনে ক্রয় করা জায়েয নেই। কেননা, বিক্রেতা উক্ত পণ্যের প্রকৃত মালিক নয়। দ্বিতীয়তঃ এতে চুরির গুনাহে সাহায্য করা হচ্ছে। আর এ ব্যাপারে কুরআন পাকে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা একে অপরের সৎকর্মে ও খোদাভীতিতে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগী হয়ো না। (সূরা মায়েদা, আয়াত- ২)। সুতরাং বহুল পরিচিত এমন চোরাই মার্কেট থেকে কোনো পণ্য ক্রয় করা যাবে না।

তবে হ্যাঁ, ঐ মার্কেটের কোনো পণ্যের ব্যাপারে যদি কোনো ব্যক্তির ভালোভাবে জানা থাকে যে, এটা চুরিকৃত নয়, তবে সে পণ্যটি ক্রয় করা তার জন্য জায়েয হবে। (সূরা মায়েদা- ২-৫, রদ্দুল মুহতার- ৭/২২১, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/৪২০, ফাতাওয়ায়ে হাক্বানিয়া- ৬/২৮, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৪/৯৬)।

 

জারজ সন্তান সম্পর্কে

(৭৮৪০) মাওলানা মুহাম্মদ ওলী উল্লাহ, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম

জিজ্ঞাসাঃ আমার জানার বিষয় হল, আমাদের গ্রামবাসী একদিন এক ছেলেকে অবৈধভাবে মিলন করতে দেখতে পায়। এমতাবস্থায় ঐ গ্রামের মান্যগন্য ব্যক্তিরা জোরপূর্বক উক্ত দুই জনের মধ্যে বিয়ে পড়িয়ে দেয়। অতএব, তারা স্বামী-স্ত্রীর ন্যায় জীবন যাপন করে। এমতাবস্থায় বিয়ের মাত্র ছয় মাস পরেই একটি বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে। তারপর গ্রামের অধিবাসীগণ তাকে জারজ সন্তান বলে আখ্যায়িত করে। এ পর্যায়ে আমার জানার বিষয় হল, উক্ত সন্তানকে জারজ বলা যাবে কি-না, জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ ফিক্বাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয় যে, বিয়ের ছয় মাস পরে বাচ্চা হলে, ঐ বাচ্চাকে তার পিতার দিকে নিসবত করা হবে। অবৈধ বলা জায়েয হবে না। (ফাতহুল ক্বদীর- ৪/৩২৩, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ১/৫৪০, আদ্দুররে মুখতার- ৫/২৩৪, আহসানুল ফাতাওয়া- ৫/৪৫৬)।

 

সদকা প্রসঙ্গে

(৭৮৪১) মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, ফরিদপুর

জিজ্ঞাসাঃ আমাদের দেশের ধর্মপ্রিয় মুসলমানগণ ইসলামের প্রচার প্রসার ও ধর্মীয় শিক্ষাদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এসব প্রতিষ্ঠান সমূহের বেশির ভাগই মুসলমানদের দান-সদকা দ্বারা পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানে গোরাবা ফান্ড ও ইয়াতীমখানা পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মপ্রিয় মুসলমানগণ মুক্ত হস্তে দান করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসকল প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী কমিটি এসব ইয়াতীম ফান্ডের টাকা ব্যক্তিগত কাজে বা মাদ্রাসার উন্নয়ন প্রকল্পের কোন খাতে ব্যবহার করেন। এমতাবস্থায় এর দ্বারা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বেশ সমস্যাও সৃষ্টি হয়। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এ জাতীয় টাকা ব্যক্তিগত কাজে বা অন্য খাতে ব্যবহার বৈধ কি-না?

সমাধানঃ কুরআন-সুন্নাহ ও ফিক্বহের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, যাকাতের টাকা গরীব মিসকীনদের হক্ব। অতএব, তাদেরকে মালিক বানানো ব্যতীত সেই টাকা দিয়ে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ করা জায়েয নেই। তদুপরি যাকাত ফিত্রার টাকা দিয়ে ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া জায়েয নেই।

হ্যাঁ, শরয়ী তামলিকের মাধ্যমে হলে, তা জায়েয। (সূরা তাওবা- ৬০, আদ্দুররে মুখতার- ৩/২৮৩, তিরমীযী শরীফ- ১/১৪১, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/২০৮)।

 

ইদ্দত পালন প্রসঙ্গে

(৭৮৪২) মাওলানা মুহাম্মদ মনির হোসেন, লাকসাম, কুমিল্লা

জিজ্ঞাসাঃ আমার দাদা ইন্তিকাল করেছেন। দাদীজান ইদ্দত পালন করছেন। ইতিমধ্যে তার বড় ভাই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন আমার জানার বিষয় হচ্ছে যে, তিনি তার ভাইকে দেখতে যেতে পারবেন কি-না? জানিয়ে বাধিত করবেন।

সমাধানঃ কুরআন হাদীস ও ফিক্বহে ইসলামির কিতাবাদি গভীরভাবে অধ্যয়নে একথা প্রমাণিত হয় যে, আপনার দাদীজান যদি তার অসুস্থ ভাইকে দেখে দিনে দিনে পুনরায় স্বামীর বাড়ীতে ফিরে আসতে পারেন, তাহলে বৈধ হবে, অন্যথায় বৈধ হবে না। (বাহরুর রায়েক- ৪/২৫৯, ফাতাওয়ায়ে শামী- ৫/২২৮, ফাতাওয়ায়ে কাযীখান- ১/৩৫০)।


Editor: Chowdhury Arif Ahmed
Executive Editor: Saiful Alam
Contact: 14/A, Road No 4, Dhaka, Bangladesh
E-mail: dailydhakatimes@gmail.com
© All Rights Reserved Daily Dhaka Times 2016
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখার সম্পূর্ণ বা আংশিক আনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি